নেপথ্যে কী? শুধুই বিয়ের দাওয়াত নাকি বসতভিটার লোভ?

প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:১৯

জগন্নাথপুরে নাজিমের খুনীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন। জড়িতদের ফাঁসি চান এলাকাবাসী

জগন্নাথপুর পৌরসভার লুদুরপুরে চাচাতো ভাইয়ের বর্বরোচিত হামলায় নিহত নাজিম উদ্দিন (৪৫) হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ফুঁসে উঠছে এলাকাবাসী। গত সোমবার বিকালে হত্যারকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে স্থানীয় ভবেরবাজারে এলাকাবাসীর উদ্যোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।


মানববন্ধন শেষে শাহ মাহফুজুল করীমের সভাপতিত্বে ও আলফু মিয়া এবং বশির মিয়ার পরিচালায় প্রতিবাদসভায় বক্তব্য দেন শেখ ফজর আলী, এমদাদুল হোসেন, প্রভাষক জাহিদ হোসেন, সুজন মিয়া, রাসেল আহমদ, সুজন মিয়া, রুম্মান, মিজান প্রমুখ। 

 


মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে একজন শান্তিপ্রিয় মানুষকে সন্ত্রাসী কায়দায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে প্রশাসনের প্রতি আহ্ববান জানাচ্ছি, দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় আমরা বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলব।

 


এদিকে গত রবিবার বাদ আসর লুদুরপুর টার্মিনাল জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে নাজিম উদ্দিনের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়। ররিবার বিকালে লুদুরপুর গ্রামে নিহত নাজিম উদ্দিনের বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। পুরো বাড়ি ও আশপাশে এক পিনপতন নীরবতা। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল নারীদের কান্নার রোল। নিহতের স্ত্রী, বোন ও স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়েছেন প্রতিবেশীরা।

 


কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহতের ছোট বোন সাজিয়া বেগম এ প্রতিবেদককে বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের বড় ভাই নাজিমই বাবার মতো ভালোবাসা দিয়ে আমাদের আগলে রেখেছিল। সেই ভাইটাকে নরপিশাচরা আমাদের চোখের সামনে কুপিয়ে মারল। আমরা এই খুনিদের ফাঁসি চাই, বিচার চাই।

 


ঘটনার অনুসন্ধানে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, লুদুরপুর গ্রামের মৃত গিয়াস উদ্দিনের ছেলে নিহত নাজিম উদ্দিনের সাথে তাঁর চাচাতো ভাই মাসুম মিয়ার (মৃত মাসুক মিয়ার ছেলে) পরিবারের বসতভিটা বিক্রি নিয়ে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ চলছিল। ঘাতক মাসুম গংদের পরিবার বড় হওয়ায় তারা অনেকদিন ধরেই নাজিমের মূল্যবান বসতবাড়িটি তাদের কাছে বিক্রি করার জন্য চাপ দিয়ে আসছিল। কিন্তু নাজিম উদ্দিন তাতে রাজি না হওয়ায় তাদের মনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

 


গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) নাজিম উদ্দিনের ছোট বোনের বিয়ে সম্পন্ন হয়। সেই বিয়ের দাওয়াত দেওয়াকে কেন্দ্র করে চাচাতো ভাই মাসুম মিয়ার সাথে নাজিমের মনোমালিন্য হয়। শনিবার সকালে ওলিমার (বৌভাত) দাওয়াত নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে মাসুমের নেতৃত্বে ৭—৮ জন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নাজিমের বসতবাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়।

 


জানা যায়, গত শনিবার সকাল আনুমানিক সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে নাজিম উদ্দিন যখন তাঁর ঘরের বারান্দায় অবস্থান করছিলেন, তখন ঘাতক মাসুমের দল সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী হামলা করে। তারা প্রথমেই নাজিম উদ্দিনের বুকে মারাত্মক দেশীয় অস্ত্র ‘ছুলফি’ দিয়ে সজোরে আঘাত করে। ছুলফির আঘাতে নাজিম মাটিতে লুটিয়ে পড়লে খুনিরা ক্ষান্ত হয়নি।

 


নাজিমের মামাতো ভাই মনসুর মিয়া প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দিয়ে বলেন, সন্ত্রাসীরা ছুলফি দিয়ে আঘাত করার পর মাটিতে পড়া নাজিম ভাইয়ের বুকের ওপর পা দিয়ে সজোরে মড়াতে থাকে। তারা পৈশাচিক উল্লাসে বলছিল, এখনও মরছে না! মর, মর, তুই মর' এভাবে উপর্যুপরি নির্যাতন চালিয়ে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘাতকেরা পালিয়ে যায়। পরে পরিবারের লোকজনের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে নাজিমকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

 


নিহতের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ওরা জায়গার লোভে নাজিমকে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক যন্ত্রণা দিয়েছে। আর বিয়ের দাওয়াতকে উসিলা করে দিনদুপুরে খুন করল। নাজিম অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি বিএ পাস করার পর এলাকায় পোস্টমাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে মুদি ব্যবসা ও টিউশনি করতেন। এলাকায় সবাই তাঁকে ‘নাজিম মাস্টার’ নামে সম্মান করত। দুই ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে তিনি সবার বড় ছিলেন।

 


নিহতের ছোট ভাই বোরহান উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার ভাইয়ের খুনিদের কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। খুনিরা অত্যন্ত সন্ত্রাসী প্রকৃতির হওয়ায় আমরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

 


হত্যাকাণ্ডের পর প্রধান অভিযুক্ত মাসুম মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়িটি তালাবদ্ধ। ঘটনার পর পরই ঘাতক চক্রের নারী—পুরুষ সবাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। 
এ বিষয়ে জগন্নাথপুর থানার উপ—পরিদর্শক (এসআই) নূর হোসেন বলেন, খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছি। হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা পালিয়ে গেছে। ময়নাতদন্তের পর লাশ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। খুনের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান চলমান। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার