প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:০১
যাদুকাটা নদীর দুটি বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি পেয়েছেন বিএনপি নেতা তাহিরপুরের দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের হলহলিয়া গ্রামের তাহিয়া স্টোন ক্রাশারের স্বত্ত্বাধিকারী নাছির মিয়া। ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ আদেশে তাঁকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ বিবেচনায় চলতি ১৪৩৩ বাংলা সনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে তাহিরপুরের দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের সার ও বীজের ডিলারশীপও পেয়েছেন তিনি। বালুমহালের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে ডিলারশীপ পেয়েছেন কি না, এ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে নাছির মিয়ার দাবি, পুরোনো ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি সার ও বীজের ডিলারশীপ পেয়েছেন।
সোমবার জেলা প্রশাসন যাদুকাটা—১ ও যাদুকাটা—২ বালুমহালের দখল নাছির মিয়াকে বুঝিয়ে দেয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ৩ কার্তিক থেকে ৩০ চৈত্র ১৪৩৩ বাংলা সন পর্যন্ত বালু উত্তোলনের এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নাছির মিয়া তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তিনি সুনামগঞ্জ—১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত।
দরপত্র ছাড়াই বালু উত্তোলনের অনুমতি
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৪৩২ বাংলা সনের জন্য যাদুকাটা—১ ও যাদুকাটা—২ বালুমহাল দুটি মোট ১০৮ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল। জিনান এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী শাহ রুবেল আহমদ ও তাহিয়া স্টোন ক্রাশারের মালিক নাছির মিয়া এসব মহালের ইজারা নেন। মামলাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে তাঁরা ইজারা নেওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পর মহালগুলোর দখল পান।
পরে ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে আরও পাঁচ মাস বালু উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন দুই ইজারাদার। আদালত তাদের পক্ষে আদেশ দেন। তবে জেলা প্রশাসনের আপিলের পর গত ১৩ সেপ্টেম্বর শুনানি শেষে রিটকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত নয় বলে আদেশ হয়। এরপর মহাল দুটিতে বালু উত্তোলন বন্ধের বিজ্ঞপ্তি দেয় জেলা প্রশাসন। চলতি ১৪৩৩ বাংলা সনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য মহাল দুটি থেকে খাস আদায়ের উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। এ লক্ষ্যে ১৭ সেপ্টেম্বর জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা আহ্বান করা হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়।
এর মধ্যে দুই ইজারাদারই ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে বিবেচনা করে বালু উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। গত ২২ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় এক আদেশে নাছির মিয়াকে মহাল দুটি থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয়।
আদেশ অনুযায়ী, গত তিন বছরের গড় বাজারমূল্যের ওপর অতিরিক্ত ১২ শতাংশ হারে দর নির্ধারণ করে অবশিষ্ট সময়ের জন্য মহাল দুটির রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২ কোটি ৬৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪২২ টাকা। এর মধ্যে যাদুকাটা—১ বালুমহালের জন্য ১৫ কোটি ৮৩ লাখ ১৪ হাজার ৬৯ টাকা এবং যাদুকাটা—২ বালুমহালের জন্য ২৬ কোটি ৮৩ লাখ ২১ হাজার ৩৫৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আদালতের আদেশের পর দখল হস্তান্তর
নাছির মিয়াকে অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর সাবেক ইজারাদার শাহ রুবেল আহমদ ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিট করেন। আদালত ভূমি মন্ত্রণালয়ের আদেশ তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরে দুই পক্ষের মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা হলে রিট আবেদন প্রত্যাহার করা হয়। এরপর গত ১৫ অক্টোবর মহালের আরেক সাবেক ইজারাদার রতন মিয়া একই বিষয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। রতন মিয়ার করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে নাছির মিয়া আপিল করেন। আদালত ১৫ দিনের জন্য রতন মিয়ার স্থগিতাদেশ স্থগিত করেন। এরপর সোমবার জেলা প্রশাসন নাছির মিয়াকে মহাল দুটির দখল বুঝিয়ে দেয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তাপস শীল বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নাছির মিয়াকে মহাল দুটির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে আইনের ব্যত্যয় হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয় তাঁদের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাতেই তাঁরা কাজ করেছেন।
রাজস্ব আদায়ের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন
এদিকে, সোমবার মহাল দুটির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হলেও উত্তোলিত বালু থেকে সরকারি রয়্যালটি আদায়ের মূল্যতালিকা মহালের দৃশ্যমান স্থানে স্থাপন করা হয়নি বলে জানা গেছে। বিশেষ আদেশে এভাবে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মহালটির সাবেক এক ইজারাদার। তাঁর মতে, নিয়ম অনুযায়ী জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রকাশ্য দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ইজারা দেওয়ার অথবা খাস আদায়ের ব্যবস্থা করার কথা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, নাছির মিয়ার দাবি, তিনি ক্ষতিগ্রস্ত বিবেচনায় যথাযথ প্রক্রিয়ায় বালু মহালের ইজারা পেয়েছেন। সার ও বীজের পুরোনো ব্যবসায়ী তিনি। সে কারণেই দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের ডিলারশীপ দেওয়া হয়েছে। বালুমহালের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে তাঁকে সার ও বীজের ডিলারশীপ দেওয়া হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১০ থেকে ১২ বছর আগে ডাম্পের বাজারে সারের ব্যবসা ছিলো। সে বিবেচনায় তিনি সারের ডিলারশীপ পেয়েছেন।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন