প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:২০
জামালগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুল রহমান শান্ত’র সরকারি আইডি (ফেসবুক) থেকে একটি সংবেদনশীল পোস্ট করার ঘটনা ঘটেছে। ওই বার্তায় ‘মৃত্যুর জন্য ইউএনওকে দায়ী’ বলে উল্লেখ করা হলে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মাঝে আলোচনার জন্ম দেয়। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভাইরাল হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আইডি থেকে জানানো হয়েছে, এসিল্যান্ডের ব্যবহৃত মুঠোফোনটি হ্যাক করে এই বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। এই বিষয়ে কাউকে কান না দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।
স্থানীয় ও প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাতে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্পী রানী মোদকের মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে দাওয়াত পান এসিল্যান্ড আরিফুল রহমান শান্ত ও তার স্ত্রী সাদিয়া মৌ সূচনা। অনুষ্ঠান শেষে এসিল্যান্ড তার স্ত্রীকে ইউএনওর কক্ষে রেখে বাইরে বের হন এবং তার দাপ্তরিক আইডি থেকে এই মন্তব্য আপলোড করেন। ওখানে লিখা হয়, ‘আমার মৃত্যুর জন্য শিল্পী রানী মোদক দায়ী থাকবেন।’ ইউএনও শিল্পী রানী মোদক বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে অবহিত করেন।
ঘটনার বিস্তারিত জানতে পরবর্তীতে সরজমিনে গিয়ে জানা যায়, বাসায় ফিরে এসিল্যান্ড কাঁচের গ্লাস ভেঙে ফেলেন এবং দায়িত্বে থাকা দুইজন আনসার সদস্যের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন। এসময় এক আনসার সদস্যকে কিল—ঘুষি মারেন এবং তার ব্যক্তিগত মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে ঢিল দিয়ে ভেঙে ফেলেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ইউএনও শিল্পী রানী মোদক, জামালগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ বন্দে আলী, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আব্দুল বাতেন এবং ভূমি অফিসের নাজির সাব্বির আহমেদকে নিয়ে এসিল্যান্ডের সরকারি বাসভবনে যান। তবে এসিল্যান্ডের স্ত্রী অন্যদের ভেতরে প্রবেশে নিষেধ করেন এবং কেবল চিকিৎসককে ভেতরে যাওয়ার অনুরোধ জানান।
চিকিৎসক ভেতরে প্রবেশ করলে এসিল্যান্ডের স্ত্রী ডাক্তার আব্দুল বাতেনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘হেলোসিন’ (Helosin) ও ‘পারকিনিল’ (Perkinil) নামের দুটি ইনজেকশন জামালগঞ্জে পাওয়া যাবে কি না, পরে স্থানীয় কোনো ফার্মেসিতে সেগুলো না পাওয়ায় চিকিৎসক ডা. আব্দুল বাতেন সঙ্গে থাকা বিকল্প ইনজেকশন পুশ করেন। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ না হওয়ায় এবং এসিল্যান্ডের আচরণ অসংলগ্ন থাকায় রাতেই তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট পাঠানো হয়। সিলেট যাওয়ার পথেও তিনি অশালীন আচরণ করেছেন বলে জানা গেছে।
জামালগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আব্দুল বাতেন জানান, ইউএনও মহোদয়ের ফোন পেয়ে আমি দ্রুত এসিল্যান্ড স্যারের বাসায় যাই। উনার স্ত্রী নির্দিষ্ট দুটি ইনজেকশনের কথা বললেও স্থানীয়ভাবে সেগুলো না পাওয়ায় ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে কোনো প্রভাব না পড়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে পাঠানোর পরামর্শ দেই। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি চরম মানসিক চাপে ভুগছিলেন।
জামালগঞ্জ থানার ওসি বন্দে আলী মিয়া বলেন, ‘ইউএনও মহোদয় ফোন দিলে, আমি তাৎক্ষণিক ওখানে যাই। পরে ইউএনও ম্যাডাম, ডাক্তার ও গণমাধ্যম কর্মীসহ এসিল্যান্ডের বাসায় যাই। এসি ল্যান্ডের স্ত্রী’র সঙ্গে কথা বলে বুঝা যায়, এর আগেও দুয়েকবার অন্য স্টেশনে থাকা অবস্থায় এমন উল্টোপাল্টা আচরণ এসিল্যান্ড করেছেন। তাকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়ানো হয়েছে।’
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্পী রানী মোদক বললেন, এসিল্যান্ড দুই মাস হয় যোগদান করেছেন। তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ এটি আমি এরমধ্যে জেনেছি। কিন্তু তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ এটা শুক্রবারই জানা হয়েছে আমার। শুক্রবার রাত সাড়ে দশটার দিকে সে একজন আনসার সদস্যকে মেরেছেন। ছোট বাচ্চাদের মারতে দৌড়ে গেছেন। এসিল্যান্ডের স্ত্রী বলেছেন, বৃহস্পতিবার বেহেলীতে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুর মরদেহ দেখে এমন আচরণ করতে থাকে সে।
এসিল্যান্ডের শ^শুর মহসিন মিয়া বললেন, শান্ত (আরিফুর রহমান শান্ত) ঢাকার পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার মেয়ে (এসিল্যান্ডের স্ত্রী) সঙ্গে আছেন। পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুর লাশ দেখেই শান্ত মানসিকভাবে অসুস্থ হয়েছেন। এখন তার শারীরিক অবস্থা ভালো রয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান বললেন, ‘শুক্রবার অনেক রাতে জামালগঞ্জের ইউএনও বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করেছেন। ইউএনও’র সঙ্গে তার (এসিল্যান্ড) কোন বিরোধ ছিল না। সে মানসিকভাবে আগে থেকেই কিছুটা অসুস্থ ছিল। পানিতে পড়া এক শিশুর লাশ দেখে অসুস্থতা আরও বেড়ে যায়। এখন তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার স্ত্রী জানিয়েছেন, এসিল্যান্ড সুস্থ আছেন।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন