জুন পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:২৩

২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সিলেট—ছাতক বাজার মিটারগেজ রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ চলছে ধীরগতিতে। প্রকল্পের সার্বিক বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২২ শতাংশ। এ অবস্থায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের গত সেপ্টেম্বর মাসের সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

 


প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪১ কোটি ৫৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ সহায়তা ১৮৪ কোটি ৮৩ লাখ ১৬ হাজার টাকা এবং সরকারি তহবিলের বরাদ্দ ৫৬ কোটি ৭৬ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের ১ এপ্রিল শুরু হওয়া প্রকল্পটির নির্ধারিত মেয়াদ গত ২৩ আগস্ট শেষ হয়েছে। তবে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

 


প্রকল্পের মেয়াদের বড় একটি অংশ পেরিয়ে গেলেও বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২২ শতাংশ। ২০২৬—২৭ অর্থবছরে ৫০ শতাংশ বাস্তব অগ্রগতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বর মাসে অগ্রগতি হয়েছে ১ শতাংশ। প্রকল্প শুরুর পর থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৪৪ কোটি ১৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা, যা মোট অনুমোদিত ব্যয়ের ১৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।

 


করোনা মহামারির শুরুর দিকে দেশের অন্যান্য রেলপথের মতো ছাতক—সিলেট রুটেও ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হলেও এ রুটে ট্রেন চলাচল আর চালু হয়নি। এরপর ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় রেলপথটির ছাতক অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যায় রেলপথের বাঁধ, স্লিপার ও রেললাইনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে সিলেটের সঙ্গে ছাতকের সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় স্থানীয় সাধারণ যাত্রী, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে সড়কপথে যাতায়াত করতে হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ এভাবে ধীরগতিতে চলতে থাকলে নির্ধারিত ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে পুনর্বাসনকাজ শেষ করে ট্রেন চলাচল চালু করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

 

 


এর আগে গত ২৩ আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ছিল প্রায় ২০ শতাংশ। প্রায় ৩৪ কিলোমিটার রেলপথের পুরোনো লাইন অপসারণ করা হলেও নতুন ট্র্যাক স্থাপনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ এখনো বাকি। বিভিন্ন এলাকায় সংস্কারকাজ বন্ধ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে রেল যোগাযোগ চালুর অপেক্ষায় থাকা স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

 


জানা যায়, সিলেট থেকে ছাতক বাজার পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি ১৯৫৪ সালে নির্মাণ করা হয়। ঐতিহাসিক এ রেলপথ দিয়ে ছাতক থেকে চুনাপাথরসহ বিভিন্ন পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হতো। পাশাপাশি সুনামগঞ্জের মানুষ সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতের জন্য এ রেলপথের ওপর নির্ভর করতেন।

 


২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় রেলপথটির বিভিন্ন অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে ছাতক অংশের প্রায় ১৩ কিলোমিটার রেললাইন মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে। বন্যার প্রবল ে¯্রাতে বিভিন্ন স্থানের রেললাইন, স্লিপার, মাটি ও পাথর ভেসে যায়। দীর্ঘদিন রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় রেলপথের মূল্যবান স্লিপার ও লোহার পাত চুরির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।

 


রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সরকারি অর্থ (জিওবি) ও এডিবির অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে কাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেড (এমএএইচএল)। ওই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি হয়।

 


প্রকল্পের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ সংস্কার, মাটি ভরাট, কালভার্ট ও সেতু মেরামত, নতুন স্লিপার স্থাপন এবং নতুন রেললাইন বসানোর কাজ রয়েছে। ইতোমধ্যে ছাতক থেকে সিলেট পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার পুরোনো রেললাইন অপসারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতাধীন ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। তবে নতুন ট্র্যাক স্থাপনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ এখনো বাকি। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হলেও পুরো রেলপথে আবার কবে ট্রেন চলাচল শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

 


স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প শুরুর পর থেকেই কাজের গতি ছিল ধীর। ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথের উচ্চতা নির্ধারণ ও সমন্বয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও সড়কের মাটি ভরাটের পর রেলপথের উচ্চতা যথাযথভাবে নির্ধারণ করতে না পারায় কাজ পিছিয়েছে।
এর আগে গত আগস্টে প্রকল্প ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছিলেন, বৃষ্টি ও বর্ষার কারণে সময়মতো মাটির কাজ করা সম্ভব হয়নি। দেড় বছর মেয়াদি প্রকল্পের মধ্যে দুটি বর্ষাকাল থাকায় কাজ ব্যাহত হয়েছে। বর্তমানে সব কাজ চলমান রয়েছে বলে তিনি জানান।

 

 


তিনি আরও জানিয়েছিলেন, বিগত সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রয়োজনীয় অনেক মালামাল আমদানি করা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে ২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। বাকি কাজ সময়মতো শেষ করা এবং বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় মালামাল আমদানির চেষ্টা চলছে।
প্রসঙ্গত, প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন, বাঁধ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো পুনর্বাসনের মাধ্যমে সিলেট—ছাতক বাজার রেল যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করা। পাশাপাশি রেলপথের পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভ্রমণের সময় কমানো, ভবিষ্যতে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পর্যাপ্ত জলপ্রবাহের কাঠামো নির্মাণ এবং রেলপথের বাঁধ উঁচু করার পরিকল্পনা রয়েছে। যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল উন্নত করাও প্রকল্পের লক্ষ্য।

 


২০২২ সালের বন্যার পর অর্থ মন্ত্রণালয়, এডিবি ও রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কয়েক দফায় ছাতকে এসে ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ পরিদর্শন ও জরিপ করেন। এ সময় ছাতক—সিলেট রেলপথ আধুনিকায়ন এবং সিলেট—ছাতক—সুনামগঞ্জ রেললাইন স্থাপনসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাজনীতিবিদ, সুধীজন, সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয়। দ্রুত রেল যোগাযোগ চালুর ব্যাপারেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর পুনর্বাসন প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২২ শতাংশ হওয়ায় সেই আশাবাদ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার