প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর, ২০২৬ ২১:২২
সুনামগঞ্জে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ধারাবাহিক অবনতি ঘটছে। শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি, স্মার্টফোনে আসক্তি, অভিভাবকদের অসচেতনতা ও বাল্যবিবাহকে ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষার এই অবনতি, নিজ প্রতিষ্ঠানের ফলাফল, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া এবং উত্তরণের উপায় নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’য় কথা বলেছেন লবজান চৌধুরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল ছত্তার। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার ও ডিজিটাল ইনচার্জ সাইদুর রহমান আসাদ।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সুনামগঞ্জে ধারাবাহিকভাবে পাসের হার কমছে। আপনার প্রতিষ্ঠানে ২৯ জনের মধ্যে মাত্র ৩ জন পাস করেছে। এই ফল বিপর্যয়ের কারণ কী?
মোহাম্মদ আব্দুল ছাত্তার: ফল বিপর্যয়ের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি অনীহা ও স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার। অনেক শিক্ষার্থীর কলেজের বেতন দেওয়ার সামর্থ্য নেই, অথচ তাদের হাতে স্মার্টফোন রয়েছে। সেটি পড়াশোনার কাজে ব্যবহার না করে অনেকেই সময় নষ্ট করছে। দ্বিতীয়ত, অভিভাবকদের অসচেতনতা। সন্তান পড়াশোনা করছে কি না, কীভাবে সময় কাটাচ্ছেÑএসব বিষয়ে তাঁদের নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু ত্রুটিও রয়েছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আপনার প্রতিষ্ঠানের ফলাফলে কোন বিষয়গুলো বেশি প্রভাব ফেলেছে? শিক্ষক সংকটও কি এর কারণ?
মোহাম্মদ আব্দুল ছাত্তার: আমাদের প্রতিষ্ঠানের ২৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৬ জন ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছে। আইসিটিতেও ১৮ জন ফেল করেছে। এই দুটি বিষয়ের ফলাফল সামগ্রিক ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে। শিক্ষক সংকটকে আমি প্রধান কারণ মনে করি না। কলেজ শাখা এমপিওভুক্ত না হলেও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থায়নে খণ্ডকালীন প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ক্লাস নিয়মিত শুরু ও শেষ হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি বড় সমস্যা। মোবাইল ফোনে বারবার যোগাযোগ করেও অনেককে ক্লাসে ফেরানো সম্ভব হয়নি। যারা নিয়মিত কলেজে এসেছে, তাদের মধ্য থেকেই পাস করেছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আপনাদের পক্ষ থেকে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল?
মোহাম্মদ আব্দুল ছাত্তার: আমরা মোবাইল ফোনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। গভর্নিং বডির সদস্য ও শিক্ষকদের নিয়ে সভা করেছি, অভিভাবক সমাবেশ ও মা সমাবেশের আয়োজন করেছি। কিন্তু সেখানে অভিভাবকদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। ৪০—৫০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে সমাবেশে মাত্র দুই—একজন অভিভাবক আসেন। আবার আমাদের মাধ্যমিক শাখায় ভালো ফল করা অনেক ছাত্রী উচ্চমাধ্যমিকে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যায়। গত শিক্ষাবর্ষে আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র একজন ছাত্রী কলেজ শাখায় ভর্তি হয়েছিল। সেও পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। যোগাযোগ করে জানা গেছে, তার বিয়ে হয়ে গেছে এবং তারা অন্যত্র চলে গেছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আপনার প্রতিষ্ঠানে বাল্যবিবাহ ও শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার সমস্যা কতটা প্রকট?
মোহাম্মদ আব্দুল ছাত্তার: সমস্যাটি বেশ প্রকট। অনেক ছাত্রী ভর্তি হওয়ার পর খেঁাজ নিয়ে দেখা যায়, তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। পরে তারা আর পরীক্ষায় অংশ নেয় না। এভাবে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার ঘটনা ঘটছে। এটি আমাদের প্রতিষ্ঠানের ফলাফলেও প্রভাব ফেলছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সুনামগঞ্জে ২২টি প্রতিষ্ঠানের পাসের হার ৩০ শতাংশের নিচে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পাশাপাশি শিক্ষা প্রশাসনের কী করণীয়?
মোহাম্মদ আব্দুল ছাত্তার: শিক্ষা অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীর নিজের আগ্রহ ও ইচ্ছাশক্তি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শেখার আগ্রহ না থাকলে শিক্ষক, অভিভাবক কিংবা শিক্ষা প্রশাসনের একার পক্ষে ভালো ফল নিশ্চিত করা কঠিন। শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান হচ্ছে কি না, ক্লাস যথাসময়ে শুরু ও শেষ হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা। অন্যদিকে অভিভাবকদেরও সন্তানদের নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে পাঠানো এবং উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আগামী বছর ভালো ফলাফল করতে আপনার প্রতিষ্ঠানে কী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে? অভিভাবকদের প্রতি আপনার আহ্বান কী?
মোহাম্মদ আব্দুল ছাত্তার: এবারের ফলাফলে আমি খুবই হতাশ হয়েছি। ফল প্রকাশের আগে থেকেই দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আমাদের সাতজন শিক্ষার্থী শুধু ইংরেজি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। তারা পাস করলে ফলাফলের হার কিছুটা বাড়ত। আগামী বছরের ফল ভালো করতে ফলাফল পর্যালোচনা করে গভর্নিং বডি ও প্রভাষকদের সঙ্গে বসব। পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখব এবং অভিভাবকদেরও সচেতন করার উদ্যোগ নেব। তাঁদের প্রতি অনুরোধ, মেয়েদের নিয়মিত কলেজে পাঠাবেন এবং পড়াশোনার খেঁাজ রাখবেন। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস করলে ও পড়াশোনায় মনোযোগী হলে এ ধরনের ফল বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন