প্রকাশিত: ২২ মার্চ, ২০২৫ ২২:০০
জীবিকা/কাঁধে ধার দেওয়ার মেশিন নিয়ে চল্লিশ বছর ধরে ঘুরছেন আলী আহম্মদ
এক কাঁধে ‘দা’ শান দেওয়ার মেশিন, অন্য কাঁধে রশির সঙ্গে ঝোলানো হ্যান্ড মাইক। সেখানে বাজছে দা, বটি ধার করাবেন, কেঞ্চি সান দেওয়াবেন....। ওই ব্যক্তির মাথায় ক্যাপ, পড়নে টিলেঢালা শার্ট ও কালো প্যান্ট। হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালা না হলেও জীবিকার তাগিদে এভাবেই যন্ত্রপাতি নিয়ে চল্লিশ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হেঁটে বেড়াচ্ছেন আলী আহম্মদ। মাঝে মাঝে বঁটি, দা সান দেওয়ার জন্য তার ডাক পড়ছে।
বলছিলাম হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার দুই নম্বর বানিয়াচং ইউনিয়নের আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা আলী আহম্মদের কথা।
সম্প্রতি শহরের বিভিন্ন স্থানে তার সরব উপস্থিতি নজর কাড়ছে অনেকের। সামনে ঈদ উল ফিতর হওয়ায় এখন অন্য সময়ের তুলনায় তার কদরও বেড়েছে। কেঞ্চি, ছুরি, বটি, দা প্রভৃতি ধার দেওয়ার অনেকেই ডাকছিলেন তাকে। মাঝে মধ্যে মনুষজন প্রয়োজনীয় জিনিস ধার দেওয়াতে তাকে ঘিরে ছোটখাটো জমায়েতও দেখা যায়।
কথা প্রসঙ্গে আলী আহমদ বললেন, আমি ছোট বেলা বাড়ি থেকে অভিমান করে চট্টগ্রামে চলে যাই। সেখানে গিয়ে এক বিহারীর সাথে পরিচয় হয় আমার, তার সাথে থেকেই এই কাজ করতে শুরু করি। তিনি আমাকে থাকতে ও খেতে দিতেন। সেসময় ৩ টাকা করে রোজও দিতেন। উনার এই মেশিনটি আমি কাঁধে কাঁধে নিয়ে ঘুরছি অনেকদিন। কাজ শেখার পর দিনে ১০ টাকা পর্যন্ত পেয়েছি প্রতিদিন। আমার সেই ওস্তাদ চলে যাওয়ার সময় মেশিনটি আমাকে দিয়ে গিয়েছিলেন।
প্রায় ৪০ বছর ধরে আমি এই কাজ করছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই কাজের জন্য আমাকে প্রচুর হাঁটতে হয়। যত বেশি এলাকায় হাঁটা যায়, রুজিও তত বেশি হয়। হাঁটার জন্যই আমার শরীর এখনও সুস্থ আছে, ডায়াবেটিস নেই। তিনি বলেন, আমার পাঁচ ছেলে যার মধ্যে চারজনকে বিয়ে দিয়েছি। এদের মধ্যে তিনজনকে পরিবার নিয়ে আলাদা থাকে, দুইজন আমার সাথে থাকে। সম্পদ যা ছিল ছেলেরা নষ্ট করে ফেলছে, দুই তিনবার বিদেশ গিয়েও কোন কিছু করতে পারেনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রায় বিভিন্ন জেলা ও ভারতে গিয়েও ধার দেওয়ার কাজ করেছি। রংপুর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, বগুড়া, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলাতে কাজ করেছি। এছাড়া দেশের বাইরে ভারতের কমলপুর, নালিছড়া, লাতাছড়া, কাঞ্চন বাড়ি, গোহাটি, আগরতলা, কলকাতা, মালদা, শিলিগুড়িসহ বিভিন্ন এলাকাতে এই কাজ করেছি। আমি ভালো কাজ করি বলে মানুষজন আমার কাছে আসে।
রোজা মাসে এবং কোরবানি ঈদে কাজকর্ম বেশি থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমনিতে দিনে হাজার-পনেরশো টাকা রোজগার হয়। কিন্তু ঈদের সিজনে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়। এসময় বছরে একবার সুনামগঞ্জে আসেন বলে জানান আলী আহম্মদ।
উত্তর আরপিননগরের বাসিন্দা টুনু মিয়া বললেন, অনেকদিন ধরে দা ধার দেওয়ার জন্য লোক খুঁজছিলাম। আজকে হঠাৎ আলী আহম্মদ কে পাইছি, এজন্য তাকে দিয়ে দা ধার করাইছি। আলী আহম্মদ খুব ভালো ধারাইতে পারে। এর আগেও বেশ কয়েকবার তার কাছ থেকে দা ধার করাইছি। তিনি বলেন, আলী আহম্মদ ভালো কাজ করে, দা’র ধরন বুঝে টাকা কম বেশি নেয়। আমারটা ৮০ টাকা দিয়ে ধার করাচ্ছি।
তিনি বলেন, আলী আহম্মদের মতো মানুষ এখন খুব বেশি পাওয়া যায় না, হঠাৎই দেখা মিলে। দা, বটি ভোতা (ধারহীন) হয়ে গেলে সেটা দিয়ে আরামে কাজ করা যায় না, ভোগান্তিতে পড়তে হয়। আবার বারবার এসব কেনাও সম্ভব নয়। তবে একবার ধার দিলে এক বছরের জন্য নিশ্চিন্তে কাজ করা যায়।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন