প্রকাশিত: ১১ মে, ২০২৫ ২১:৩৫
সুনামগঞ্জের দেখার হাওড় পাড়ের লালপুর গ্রামে এক ব্যতিক্রমী চিত্র চোখে পড়ার মতো। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ আর ফসলের ক্ষেতের মাঝে দেখা মিলে একজন রাখালের, যাঁর হাতে থাকা সরু লাঠির দ্বারা চড়িয়ে বেড়ায় গ্রামের শত শত গরু। তবে এই রাখালের দায়িত্ব অন্য পাঁচজনের মতো নয়, বরং তা সীমাবদ্ধ মাত্র একদিনের জন্য। পরের দিন একই গরুবাড়ি অর্পিত হয় অন্য কোনো ব্যক্তির কাঁধে। এভাবেই পালাক্রমে গ্রামের দু'জন ব্যক্তি প্রতিদিন গ্রামের সকল গরুর দেখভালের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। স্থানীয়ভাবে এই ঐতিহ্যবাহী প্রথা ‘গরুবাড়ি’ নামে পরিচিত।
গ্রামের একদিনের রাখাল শামসুল আলম বলেন, "দুই পরিবারের দায়িত্ব একদিন গরু রাখা। মাসে একবার এভাবে গ্রামের সবাইকে গরু রাখতে হয়। কারো একটা—দুটো, কারো চারটি—পাঁচটি করেও গরু আছে। এখানে গরু দিলে কাউকে টাকা—পয়সা দিতে হয় না, শুধু প্রত্যেককে মাসে একবার করে গরু রাখতে হয়। আজ আমাদের পালা।"
লালপুর গ্রামের মোবারক আলী বলেন, প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে আড়াইশো গরুকে দুইজন রাখাল গ্রামের কান্দার এক প্রান্ত থেকে শুরু করে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত চড়ায়।
তিনি আরও বলেন, "রাখালের কাছে গরু দিয়ে গেলে গরু হারিয়ে যাওয়ার কোনো চিন্তা থাকে না।"
লালপুর গ্রামের আজাদ মিয়া বলেন, "অগ্রহায়ণ মাস থেকেই এই গরু বাড়ি দেওয়া শুরু হয়। গ্রামের এক মাথা থেকে শুরু করে দুইজন দুইজন করে গরুবাড়ি দিবে। এভাবে বৈশাখ মাস শেষ করে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত চলবে গরু বাড়ি দেওয়া। পরে যার যার গরু নিজেদের কাছে রেখে দেবে, বর্ষা এলে আর গরুবাড়ি দেওয়া যায় না।"
লালপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের সহ—সাধারণ সম্পাদক মো. আরজদ আলী বলেন, "গরু—বাছুর যেন হাওরে এলোমেলোভাবে ঘুরে না বেড়ায় এবং ধানক্ষেতের ক্ষতি না করতে পারে, সেজন্য আমরা গ্রামের পঞ্চায়েত মিলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যে— গ্রামের দুজন দুজন করে প্রতিদিন সময় দেবে। এটাকে বলা হয় গরুবাড়ি। আমরা বাপ—দাদার আমল থেকেই এভাবেই করে আসতেছি। এই গরুবাড়ি দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, যেন গরুর দ্বারা ধানের কোনো ক্ষতি না হয়। আমরা সবাই এনে রাখালের কাছে গরু দেব, রাখাল সারাদিন গরু চড়িয়ে সন্ধ্যার সময় গ্রামের কান্দায় এনে ছেড়ে দেবে। পরে গৃহস্থরা এসে তাদের গরু বাড়িতে নিয়ে যাবে।"
কোরবাননগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও লালপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. নুরুল হক বলেন, "গরুবাড়ির সিস্টেমটা অনেক পূর্ব থেকেই চলে আসছে। লালপুর গ্রামের সামনে বিস্তৃত হাওরের গোচারণভূমিতে গ্রামের প্রায় ৫০টি পরিবারের গরু পালা করে দুইজন ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে থাকে। এই নিয়মের ফলে গ্রামের অন্যান্য পরিবার তাদের গরু পরিচর্যার দায়িত্ব থেকে অনেকটা অবকাশ পায়। প্রায় ২৫ দিন পর পর একেকজনের পালা আসে, যেটি সময় ও শ্রমের অনেকটাই সাশ্রয় করে।"
এই "গরু বাড়ি" প্রথা শুধু লালপুর গ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়। চেয়ারম্যান নুরুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ইউনিয়নের আরও ৮—১০টি গ্রামে এই ঐতিহ্যটি প্রচলিত আছে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন