পার্থ : পতন থেকে ‘পচন’

প্রকাশিত: ৩১ মে, ২০২৫ ০০:০০

ঘটনাটি যেন সিনেমার কাহিনিকে হার মানায়! গ্রামের মেধাবী এক শিক্ষার্থী ভর্তি হন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্ররাজনীতিতে হঠাৎ সক্রিয় হন। দাপুটে ছাত্রনেতা হিসেবে বাগিয়ে নেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতির পদটি। দুষ্টচক্রে জড়িয়ে পড়ে অনেক ঘটনার অঘটনঘটনপটিয়সী হন। দলীয় কর্মী হত্যায় আসামি হন, যৌন হয়রানির ঘটনার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে সংবাদকর্মীদের মারধর করার অভিযোগে অভিযুক্ত হন। আরও অনেক অভিযোগ। এসব ঘটনার জের ধরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কারও হন। ছাত্রলীগের সভাপতি পদটি মাস তিনেকের জন্য স্থগিত হয়। এ অবস্থায়ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তার শক্ত অবস্থান ছিল। একই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর প্রেমে পড়ে নতুন জীবনের পথ খুঁজছিলেন। কিন্তু সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত আধিপত্যে ধস নামে। পতন থেকে পলায়ন, অতঃপর প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ‘পচন’! এ কাহিনি শাবিপ্রবি শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সঞ্জীবন চক্রবর্তী পার্থর!    

 

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সঞ্জীবন চক্রবর্তী পার্থ। এ পদে আসীন হওয়ার আগে তার পরিচিতি ছিল একজন দক্ষ সংগঠক ও মেধাবী শিক্ষার্থী। মেধার শিখরে থেকে ছাত্রজীবন তথা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাঠ শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হন, তাদের ক্ষেত্রে ‘সাস্টিয়ান’ পরিচিতিতে আরও বিকশিত হওয়ার সুযোগ থাকে জীবনভর। এই সাস্টিয়ান পার্থ যেন প্রতিষ্ঠার আগেই পতন হয়েছে। ছাত্ররাজনীতির দুষ্টচক্র এক সময় ছাত্রলীগের ক্ষত হয়ে দাঁড়ায়। সেই ক্ষত থেকে বের হতে পারেননি পার্থ। বিয়ের খবর শুনে প্রেমিকাকে ছুরিকাঘাত করে আত্মহনের চেষ্টা খবরে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে সাস্টিয়ান মহলে। তার প্রেমিকা তথা ভুক্তভোগী তরুণীও শাবিপ্রবির সাবেক শিক্ষার্থী। 


বৃহস্পতিবার (২৯ মে) বিকেলে সুনামগঞ্জ শহরের হাছননগর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর পার্থ নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করলে পুলিশ তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় আটক করে হাসপাতালে ভর্তি করে। বর্তমানে তিনি পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। 


জানা গেছে, সঞ্জীবন চক্রবর্তী পার্থ শাবিপ্রবির পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। তার বাড়ি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের নৌকাখালী গ্রামে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি সিলেটে আত্মগোপনে ছিলেন। প্রেমিকার বিয়ের খবর জানার পর তিনি সুনামগঞ্জে ফেরেন। ছুরিকাঘাতে আহত তরুণী শাবিপ্রবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি সুনামগঞ্জের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। আহত অবস্থায় তাকে সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।


পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেলে তরুণী তার ভাবির সঙ্গে শহরের হাছননগর এলাকার একটি দোকানে কেনাকাটা করতে গেলে সেখানে হাজির হন পার্থ। একপর্যায়ে মেয়েটিকে দোকান থেকে ডেকে নিয়ে ধারালো ছুরি দিয়ে একাধিকবার আঘাত করে পালিয়ে যান পার্থ।


মেয়েটির স্বজনরা জানান, তার শরীরে অন্তত ১০টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি গভীর। আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।


ছুরিকাঘাতের পর পার্থ পালিয়ে শহরের ধোপাখালী শ্মশানঘাট এলাকায় যান। সেখানে নিজের শরীরেও ছুরি চালান তিনি। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে সদর হাসপাতালে নেয়। পরে তাকেও ওসমানী মেডিকেলে পাঠানো হয়।


আহত তরুণীর স্বজনরা জানান, শাবিপ্রবিতে পড়ার সময় পার্থ ও তরুণীর মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সম্পর্কের ইতি ঘটার পর তরুণী নতুন জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে বিয়ের খবর জানতে পেরে পার্থ তাকে কয়েকবার হুমকি দেন। বিষয়টি পরিবারকে জানিয়েছিলেনও তিনি।


এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মনিবুর রহমান বলেন, ঘটনার পরপরই আমরা অভিযান চালিয়ে পার্থকে ধোপাখালী শ্মশানঘাট এলাকা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় গ্রেপ্তার করি। তিনি ছুরিকাঘাতের পর আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন পার্থ।


এ ব্যাপারে কোনো মামলা করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে ওসি বলেন, মেয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে পার্থর নামে মামলা করা হয়েছে। সে সুস্থ হলে তাকে আদালতে হাজির করা হবে।


পার্থ শাবিপ্রবি ছাত্রলীগের সভাপতি থাকা অবস্থায় ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে সুমন দাস নামে বহিরাগত এক ছাত্রলীগকর্মী নিহতের ঘটনায় চার্জশিটভুক্ত আসামী ছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল ক্যাম্পাসে এক স্কুলছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন ও এর প্রতিবাদ করায় দুই সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় তৎকালীন সভাপতি পার্থকে বহিষ্কার করে তিন মাস কমিটি স্থগিত রাখা হয়।


সহপাঠীরা বলেছেন, ছাত্র রাজনীতি একজন শিক্ষার্থীকে যেভাবে দেশের একজন সুযোগ্য নেতৃত্বে পরিণত করতে পারে ঠিক সেইভাবে একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবন ধ্বংসও করে দিতে পারে। এ রকমই এক উদাহরণ হিসেবে পরিণত হয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পরিসংখ্যান বিভাগের ২০০৬—০৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সঞ্জীবন চক্রবর্তী পার্থ। মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা—মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট পার্থ। বড় দুই বোন আছেন। করোনার পর বাবা মারা গেছেন। তার বাড়ি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের নৌকাখালী গ্রামে হলেও  বোনের পরিবারের সঙ্গে সুনামগঞ্জ শহরের নতুনপাড়া এলাকায় একটা ভাড়া বাসায় থাকতেন।


পার্থর বাল্য ও বিশ্ববিদ্যালয়বন্ধু সূত্রে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই সে খুবই মেধাবী এবং শান্ত স্বভাবের ছিলো। সুনামগঞ্জ শহরের সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেলে ২০০৪ সালে এসএসসি এবং সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে ২০০৬ সালে এসএসসি পাস করার পর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৬—০৭ শিক্ষাবর্ষে পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা সম্পর্কে বাল্যকালের বন্ধুরা বলেন, ‘আমরা সবাই হঠাৎ শুনতে পাই সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। আমরা সবাই খুবই অবাক হই তার এই পরিবর্তন দেখে।’


পার্থের মামা নারায়ণ চক্রবর্তী বললেন, আমরা চাই নি পার্থ রাজনীতিতে এভাবে জড়াক। রাজনীতিতে জড়িয়ে একসময় তার লাইফ স্টাইল বদলে যায়। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সপ্তাহে একদিনও ফোনে কথা বলা যেতো না। সব সময় ব্যস্ত থাকতো। কালেভদ্রে সুনামগঞ্জে এলে তার চলন—বলনে এমন পরিবর্তন ও রাজনীতিতে জড়ানো নিয়ে কথা বললে, সে বলতো ‘রাজনীতি করেই আমি আমার ক্যারিয়ার তৈরি করে নেব।’ ২০১৪ সালের শেষের দিকে মামলায় জড়ানোর পর এবং ২০১৭ সালে ছাত্রলীগ থেকে বহিস্কার হবার পর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ আরও কমে যায়। ছন্নছাড়া জীবন হয়ে পড়ে তার। কোথায় থাকতো, কী করতো, পরিবারের কেউ জানতো না। ফোনে যোগাযোগ হলেও কোথায় থাকতো বলতো না। 


পার্থ এর আগেও শাবিপ্রবি ছাত্রলীগের সভাপতি থাকা অবস্থায় ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে সুমন দাস নামে বহিরাগত এক ছাত্রলীগকর্মী নিহতের ঘটনায় চার্জশিটভুক্ত আসামি ছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল ক্যাম্পাসে এক স্কুলছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন ও এর প্রতিবাদ করায় দুই সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় তৎকালীন সভাপতি পার্থকে বহিষ্কার করে তিন মাস কমিটি স্থগিত রাখা হয়। মেধাবী ছাত্র ও ছাত্র নেতার মনোভাব এখান থেকে পাল্টায় বলে ধারণা করছেন সহপাঠীরা। 
 

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার