সুড়ঙ্গে কয়লা শ্রম, ১৮ মাসে ১০ মৃত্যু

প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৫৩

জীবিকার তাগিদে কিংবা চোরাই কারবারিদের প্রলোভনে পড়ে সুনামগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে অবৈধ অনুপ্রবেশ এখন এক প্রাণঘাতী ফাঁদে পরিণত হয়েছে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বিপজ্জনক পাহাড়ি সুড়ঙ্গ বা কোয়ারিতে কয়লা কুড়াতে গিয়ে সুরঙ্গ ধসে ও উপর থেকে পাথরচাপা পড়ে, আবার কখনো বিএসএফের গুলি, খাসিয়াদের আক্রমণে প্রাণ হারাচ্ছেন বাংলাদেশি সীমান্ত শ্রমিকরা। দারিদে্র্যর কষাঘাতে পিষ্ট এসব সীমান্তবর্তী মানুষ জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ উপায়ে ওপারের কয়লা আনতে গিয়ে অকালেই ঝরে পড়ছেন, যা পরিবারগুলোর সামনে রেখে যাচ্ছে অনন্ত শোক আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।


সুনামগঞ্জ জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে ছয়টি উপজেলার সঙ্গে ভারতের ১২০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যনগর উপজেলার ৭ কিলোমিটার নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নে এবং ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার ২৩ কিলোমিটার সিলেট ব্যাটালিয়নের অন্তর্ভুক্ত। এর বাইরে ৯০ কিলোমিটার সীমান্ত সুনামগঞ্জ বিজিবির ২৮ ব্যাটালিয়নের অধীন। সুনামগঞ্জ ব্যাটালিয়নের আওতাধীন ৯০ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ৮৯ কিলোমিটার স্থলসীমা ও ১ কিলোমিটার জলসীমা। সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো অত্যন্ত দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকা। কিছু কিছু স্থান কাঁটাতারের বেড়াবিহীন রয়েছে।

 


গত ১৮ মাস জেলার এই সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ—গারো—খাসিয়াদের গুলিতে ৩ জন এবং চোরাই কয়লা আনতে গিয়ে গর্তে পড়ে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বৈদ্যুতিক ফাঁদে পড়ে এক ভারতীয় যুবকের মৃত্যু, সীমান্ত বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বে ব্যবসায়ি খুন ও মেঘালয়ে আদিবাসী উপজাতির উপর হামলায় অভিযুক্ত হিসেবে এক বাংলাদেশীকে পিটিয়ে হত্যা করে গ্রামবাসী। এছাড়াও মাদক, অস্ত্র উদ্ধার, বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বে খুন, লাখ—কোটি টাকার চোরাই পণ্য জব্দ এখন নিত্যনৈমিত্যিক ঘটনা। আছে পুশইন (ঠেলে পাঠানো) ঘটনাও। 

 


গত ১৬ এপ্রিল তাহিরপুর সীমান্ত সংলগ্ন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের একটি কয়লা কোয়ারিতে ধসের ঘটনায় মজিবুর রহমান (৩৫) নামে এক বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। তিনি উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী লাকমা গ্রামের আলতু মিয়ার ছেলে।

 


গত ৯ সেপ্টেম্বর তাহিরপুর সীমান্তে অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে কয়লা সংগ্রহ করতে গিয়ে মাটি ও পাথরচাপায় ইউনুস আলী (২২) নামে এক বাংলাদেশি শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। সীমান্তের শূন্য লাইন থেকে আনুমানিক ১০ কি.মি. ভারতের অভ্যন্তরে কলারছড়া নামক স্থানে একটি কয়লার গর্তে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ইউনুস আলী উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের লালঘাট গ্রামের (পশ্চিমপাড়া) ছমির উদ্দিনের ছেলে।
২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তাহিরপুর সীমান্ত দিয়ে অবৈধপথে ভারত থেকে চোরাই কয়লা আনতে গিয়ে পাথরের গর্তে পড়ে মাথায় আঘাত পেয়ে বাংলাদেশী এক কয়লা শ্রমিকের মৃত্যু হয়। নিহত শ্রমিক মো. রজব আলী (৫০) উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী লাকমা পশ্চিমপাড়ার শমশের আলীর ছেলে। 

 


২০২৫ সালের ৫ মে তাহিরপুর সীমান্ত দিয়ে চোরাইপথে কয়লা আনতে গিয়ে পাথরের চাপায় পড়ে মো. নুরু মিয়া (৪০) নামের এক কয়লা শ্রমিকের মৃত্যু হয়। তিনি উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী লাকমা পশ্চিমপাড়ার শাহজালালের ছেলে। 

 


অপরদিকে ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি বিশ্বম্ভরপুরের চিনাকান্দি সীমান্ত এলাকায় ভারতীদের গুলিতে এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হন। তবে বিএসএফ নাকি ভারতীয় গারোরা গুলি করেছেন তা নিশ্চিত করতে পারেনি বিজিবি। নিহত ব্যক্তি উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের গামাতলা খাসপাড়া পূর্ব এলাকার বাসিন্দা জয়নাল আবেদীনের ছেলে মো. সাইদুল ইসলাম। বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে ভারতে সুপারি পাঠানোর সময় এই ঘটনা ঘটে। নিহতের বুকে ও পেটে দুইটি গুলি লাগে। 


৩১ মার্চ দোয়ারাবাজার উপজেলার টেবলাই গ্রামের বাসিন্দা বশির আহমেদ ফসলি জমিতে ইঁদুর মারার জন্য সাধারণ (গুনা) তার দিয়ে বৈদ্যুতিক ফাঁদ তৈরি করেন। সেই ইঁদুরের ফাঁদে পড়ে মারা যান ভারতীয় যুবক সারভেস মারাক (২৮)। 

 


১২ এপ্রিল দোয়ারাবাজার সীমান্ত রেখা থেকে ভারতের ৭ মিলোমিটার অভ্যন্তরে সুপারী চুরি করতে গিয়ে খাসিয়াদের গুলিতে নিহত হন মনিরুল্লার ছেলে কুটি মিয়া (৫০)। 
১১ জুলাই দোয়ারায় বিএসএফের গুলিতে শফিকুল ইসলাম (৪৫) নামে এক বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হন। নিহত শফিকুল উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নের ভাঙাপাড়া গ্রামের কিতাব আলীর ছেলে। স্থানীয়রা জানান, গরু পারাপারের সময় বিএসএফ চোরাকারবারিদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়, এতে শফিকুল ইসলাম গুরুতর আহত হয়। চোরাকারবারিরা তাকে এপারে এনে দোয়ারাবাজার হাসপাতালে ভর্তি করলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শফিকুলের মৃত্যু হয়। 

 


১১ আগস্ট সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে অনুপ্রবেশকারী আকরাম নামের এক বাংলাদেশীকে সেখানকার গ্রামবাসী পিটিয়ে হত্যা করে। নিহত ওই বাংলাদেশী শেরপুর জেলার জনাঘাটি গ্রামের বাসিন্দা বলে জানায় ভারতের মেঘালয় পুলিশ। ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, মেঘালয়ের দক্ষিণ পশ্চিম খাসি হিলস জেলার অনুপ্রবেশ এবং এক আদিবাসী উপজাতির ওপর হামলায় অভিযুক্ত হিসেবে আটক হয়েছিলো আকরাম। এর আগে আটককৃত ও জনতার মারধরে আহত বাংলাদেশ পুলিশ কনস্টেবল পরিচয়দানকারী জামালপুরের মারুফুর রহমান (৩২) কে শিলং সিভিল হাসপাতালে, তাহিরপুর উপজেলার কালাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা লাল মিয়ার ছেলে মোবারক হোসেন কে মওকিরওয়াট সিভিল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এছাড়াও আটককৃত জামালপুর সদর উপজেলার জাহাঙ্গীর আলম (২৫), নারায়নগঞ্জের সায়েম হোসেন (৩০), কুমিল্লার মেহফুজ রহমান (৩৫) কে পুলিশের হেফাজতে তিনদিনের রিমান্ডে নেয়। 

 


২৮ আগস্ট বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (৪৮ বিজিবি) পিস্তল (রিভলবার—মেড ইন ইউএসএ) ও গুলি জব্দ করার বিষয় জানায়। দোয়ারাবাজার সীমান্তবর্তী মৌলারপাড় এলাকায় তল্লাশি অভিযানে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি আমেরিকার তৈরি রিভলবার (মেড ইন ইউএসএ) ও কার্তুজ (৬টি গুলি) জব্দ করা হয়।

 


১৫ নভেম্বর সুনামগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের অভিযানে ৯৫০ রাউন্ড ১২ বোর শর্টগানের কার্তুজসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। 
১৪ ডিসেম্বর সীমান্ত বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার এবং কোটি টাকার লেনদেনের জেরে দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় আহাদ মিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে।

 


এদিকে ২০২৫ সালে চারদফায় ছাতক সীমান্ত দিয়ে ৭৪ জনকে পুশইন করে বিএসএফ। ২৮ মে ছাতকের ছনবাড়ি—নোয়াকোট সীমান্ত দিয়ে ১৬ জন ও ১২ জুন ১৭ জন এবং ২৪ জুন ২০ জনকে পুশইন করে বিএসএফ। সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক সীমান্তে আটককৃত ২১ জনের মধ্যে একজন ছিলেন ছাতক উপজেলার মোছা. ফাতেমা (২২) নামে এক জন। জেলার বাসিন্দাদের মধ্যে তিনিই প্রথম পুশইনকৃত ব্যক্তি। তিনি উপজেলার মুক্তিরগাঁও গ্রামের মৃত. শামসুদ্দিনের মেয়ে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, পুশইনকৃত সকলেই বাংলাদেশী নাগরিক। যারা ইতোপূর্বে অবৈধভাবে বিভিন্ন সময়ে ভারতে যান। ছাতকে আটককৃত ৭৪ জনের মধ্যে ৭৩ জনই সিলেট, যশোর, নড়াইল, সাতক্ষীরা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, পাবনা জেলার বাসিন্দা।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার