প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ২৩:৪৩
সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর
পুরনো দিনের ব্যবহার্য সামগ্রী, বিলুপ্তপ্রায় মাছ কিংবা প্রাচীন যোগাযোগ মাধ্যম- সবকিছু একসাথে পাওয়া যাবে সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘরে। জাদুঘরের পুরাতন ভবন নতুন আঙ্গিকে সাজানো হয়েছে। প্রবেশ করলেই মনে হবে যেন, সময়ের ে¯্রাত পেরিয়ে ফিরে গিয়েছি অতীতে। গাইতে ইচ্ছে করবে,‘চিনি গো চিনি তোমারে’।
জাদুঘরে স্থান পেয়েছে নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী আসবাবপত্র, পুরনো দিনের ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি ও বাদ্যযন্ত্র, প্রিন্টার, রেডিও, টেলিফোন, পুরোনো টেলিভিশন সেট, তুলা যন্ত্র, পুরনো দিনের রাজকীয় টাইফ রাইটার যন্ত্র, সাইক্লোস্টাই মেশিন, ইলেকট্রিক ওভেন, গ্যাস উৎপাদনের যন্ত্র, হারিকেন, রাজকীয় ড্রেসিং টেবিল, পুরাতন ডাকবাক্স, সাপের বিন, হুক্কা, একতারা, দোতারা, বেহালা, তবলা, খোলক, ছোট ঢোল, বড় ঢোল, খঞ্জোনি, বড় মন্দিরা, ডুগডুগিসহ নানা সামগ্রী।
এছাড়াও রয়েছে হস্তশিল্পের নানা আসবাবপত্র, কৃষকদের মাথার টুপি, বেতের তৈরি উরা, হাত পাখা, গরুর মুখা, মাছ ধরার ফলো, ছাই ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, হাওর এলাকার বিশেষ প্রজাতির মাছও সংরক্ষণ করা হয়েছে, যেগুলো এখন প্রায় বিলুপ্ত। রয়েছে সুনামগঞ্জের গর্ব বিখ্যাত মরমি বাউল শাহ্ আব্দুল করিম, রাধারমন দত্ত ও হাসন রাজাসহ মরমি সাধকদের ছবি। রয়েছে জুলাই গনঅভ্যুত্থানের আন্দোলনের স্থিরচিত্র।
২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ পৌর শহরে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ‘আসাম প্যাটার্নের’ প্রায় দেড়শ বছরের পুরাতন আদালত ভবনে যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘ঐতিহ্য জাদুঘর’ এর। ২০১৭ সালের ২৬ এপ্রিল জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের ১৭৬ তম সভায় সুনামগঞ্জের ঐহিত্য জাদুঘরকে জাতীয় জাদুঘরের শাখা হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়। সুনামগঞ্জকে জানতে ও দেশবাসীর কাছে জেলার পরিচয় তুলে ধরতে ঐতিহ্য জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়েছিল। জেলার পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধসহ সব স্মৃতি তুলে ধরা হয় জাদুঘরে। দেশে জেলা পর্যায়ে এমন জাদুঘর এটাই প্রথম জানিয়ে সেই সময় উদ্যোক্তারা বলেছিলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও হাওরাঞ্চলের ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই এমন উদ্যোগ। দিন দিন এই ঐতিহ্য জাদুঘর আরও সমৃদ্ধ করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন উদ্যোক্তারা।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের সুরমা নদীর পাশে ডিএস রোডে অবস্থিত আদালত ভবনটি ব্রিটিশ আমলে নির্মিত। দেড়শ বছরের পুরনো পরিত্যক্ত আদালত ভবন ছিল ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এ অবস্থায় এই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ভবন রক্ষা ও হাওরাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, পরিবেশ ও প্রকৃতি এবং জীবন—জীবিকা নতুন প্রজন্মে কাছে তুলে ধরার উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন। পুরনো ভবন সংরক্ষণের পাশাপাশি এখানে জাদুঘর গড়ে তোলায় সুনামগঞ্জের সমৃদ্ধ ইতিহাস জানতে পারছেন দেশ বিদেশের মানুষজনসহ জেলাবাসী। কাঠের পাটাতনের ওপর নির্মিত আদালত ভবনকে কোটি টাকায় সংস্কার করে তৈরি করা হয়েছে ঐহিত্য জাদুঘর।
দর্শনার্থীরা বলছেন, জাদুঘরটি নতুন প্রজন্মকে অতীত সম্পর্কে জানাবে। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র জনতার লড়াই সম্পর্কে জানার সুযোগ হবে।
ময়মনসিংহের নান্দাইল থানার জাকির হাসান ইমন এসেছিলেন জাদুঘর দেখতে বললেন, সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘরে এসে আমি দেখতে পেলাম হাওর এলাকার বিভিন্ন মাছ, যেগুলো এখন বিলুপ্তপ্রায়। বর্তমানে এগুলো আর সহজে দেখা যায় না। বইয়ের বাইরে এখানে এসে অনেক কিছু দেখা, শেখা এবং জানার সুযোগ হয়েছে। এমন অনেক মাছ আমি এখানে দেখেছি, যা আগে কখনো দেখি নি। এগুলো সংরক্ষিত অবস্থায় দেখতে পেয়ে সত্যিই ভালো লেগেছে।
ময়মনসিংহ গৌরীপুর উপজেলার হিম্মতনগর গ্রামের মোহাম্মদ মোস্তাকিম বলেন, আমরা বন্ধুরা মিলে ঘুরতে বের হয়েছিলাম, কিন্তু বৃষ্টির কারণে এখানে আটকে যাই। হঠাৎ করেই সামনে পড়লো সুনামগঞ্জের ঐতিহ্য জাদুঘর, কৌতূহল নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। ভেতরে এসে দেখতে পেলাম পুরোনো দিনের নানা ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র, যেগুলোর অনেকগুলো কালের পরিক্রমায় হারিয়ে গেছে। এখানে এসে আমরা আগের দিনের ইলেকট্রিক ওভেন, রাজকীয় টাইপরাইটার মেশিন, পুরোনো রেডিও, টেলিভিশনসহ হাওরভাটি এলাকার অনেক ঐতিহ্যের নিদর্শন দেখতে পেরেছি। সত্যিই এটি আমাদের জন্য এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, সুনামগঞ্জের জাদুঘর একটি চমৎকার স্থাপনা, ভেতরের ইন্টেরিয়রও অত্যন্ত সুন্দর। তবে দুঃখজনকভাবে এর সংগ্রহশালা এখনো অনেক দুর্বল। এই অঞ্চলের বহু আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন ও মূল্যবান সামগ্রী এখানে নেই। তিনি বলেন, সম্মানীত নাগরিকদের বাড়িতে এধরনের নিদর্শন, ব্যবহার সামগ্রী বা সৌন্দর্য্য বর্ধক সংগ্রহ রয়েছে, সেগুলো যদি সংরক্ষণ করতে চান এবং সুনামগঞ্জের পরিচয়কে সারা দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে চান, অনুগ্রহ করে এগুলো জাদুঘরে দান করলেই এটি সমৃদ্ধ হবে।
তিনি বললেন, এই জাদুঘরটি শুধু ভেতরের সংগ্রহে নয়, ভবনটির স্থাপত্যশৈলিও দর্শকদের আকর্ষণ করছে। সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর এখন শুধু স্মৃতিচারণের স্থান নয়, বরং ইতিহাস শেখার এক জীবন্ত পাঠশালা। অতীতের সাথে বর্তমানের সেতুবন্ধন তৈরি করতে এই জাদুঘর নিঃসন্দেহে এই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন