সাপের কামড়ে কিশোরের মৃত্যু, হাসপাতালে উত্তেজনা

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর, ২০২৫ ২২:৫৪

জেলায় পর্যাপ্ত এন্টিভেনম আছে-সিভিল সার্জন

টেটা দিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে সাপের কামড়ে প্রাণ গেছে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হালুয়ারগাঁও গ্রামের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী জাবেদ আহমেদের। বুধবার বিকেল সাড়ে ৪ দিকে জাবেদের বাড়ির পাশে ও নতুন জেলের পেছনে একটি পুকুরে মাছ দেখতে পেয়ে ঘর থেকে টেটা এনে পুকুরে ছুড়ে মারে। এরপর টেটাটি পুকুর থেকে তোলার জন্য পুকুর পাড়ে নামলে পায়ে কামড় বসায় একটি বিষাক্ত সাপ। কামড় খেয়ে দৌড়ে এসে পরিবারকে জানালে তারা পায়ে বাঁধন দিয়ে সদর হাসপাতালে নিয়ে যান পরিবারের লোকজন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় জাবেদ। এরপর জাবেদের পরিবারের লোকজন চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে উত্তেজিত হয়ে চিকিৎসকদের উপর চড়াও হন।  এসময় হাসপাতালে থাকা অন্যান্য লোকজন তাদের বুঝিয়ে শান্ত করেন।


শুক্রবার বিকালে সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় টেটাটি এখনো পুকুরে পড়ে আছে। ভয়ে কেউ পুকুরপাড়ে যাচ্ছেন না। পুকুর পাড়ে পাকা একটি ঘরের নিচের অনেকটা অংশ ফাঁকা। এই জায়গায় সাপ বসবাস করছে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। স্থানীয়রা আরও জানান, এই জায়গার পাশে ঘটনার দুইদিন আগে দুটি বিষাক্ত সাপের বাচ্চা মারা হয়েছিল। সেই ছবি দেখে সাপ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, নিউরোটক্সিন বিষের গোখরা প্রজাতির সাপ। বিষাক্ত সাপের মধ্যে খৈয়া গোখরা ও পদ্ম গোখরা এই দুই প্রজাতির সাপ সুনামগঞ্জে বেশি পাওয়া যায়।


নিহতের ফুফু বলেন, আমার ঘরের পাশের পুকুরে মাছ ধরার সময় তাকে সাপে কামড় দেয়। আমি সাথে সাথে পায়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে তার বাবা মাকে জানাই। পরে সবাই মিলে হাসপাতালে নিয়ে যাই।

নিহতের বাবা ইলিয়াস মিয়া অভিযোগ করে বলেন, সাপে কাটার সাথে সাথে আমার ছেলে ঘরে এসে জানালে আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাই। হাসপাতালের ডাক্তাররা পায়ের বাঁধন খুলে দেয়ার পরপর আমার ছেলে জ্ঞান হারায়। পরে তারা মৃত ঘোষণা করে। আমাদের দিয়ে বাইরে থেকে অনেক ওষুধ আনানোর পরও কোন ইঞ্জেকশন দেয় নি তারা।


সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম বলেন, বিকেল ৫ টা ৫২ মিনিটে রোগী আমাদের হাসপাতালে আসে। আসার সাথে সাথেই চিকিৎসক ও স্টাফরা তাকে এটেন্ড করেন। ৬টা ২ মিনিটে ক্লিনিক্যালি মৃত ঘোষণা করা হয়। আমরা মাত্র ১০ মিনিট চিকিৎসার সময় পেয়েছি। ১০ টি ভায়ালের একটি এন্টিভেনম প্রস্তুত করা হচ্ছিল ততক্ষণে রোগী মারা যায়। এন্টিভেনম প্রয়োগের পায় নি আমাদের ডাক্তার। যখন রোগীকে কোলে করে আনা হয় ততক্ষণে রোগীর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। যদি আরও আগে আনা হতো হয়তো চিকিৎসা শুরু করে বাঁচানো যেত।

 


সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে হট্টগোলের পর তারা মৃতকে নিয়ে যান সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে। সেখানেও ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর মৃতদেহ বাড়িতে নিয়ে আসলে কানাইঘাট থেকে ডাকা হয় বাউল নুর উদ্দিন নামের ওঝাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায় ওঝা দাবি করছেন বাঁধ খুলে দেয়ায় বিষ মাথায় ওঠে গেছে এবং রোগী অজ্ঞান হয়ে আছে। এরপর তিনি ঢোল, হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গেয়ে শুরু করেন কবিরাজি চিকিৎসা। রাতভর চিকিৎসার পর সকালে ডাক্তারদের উপর দোষ চাপিয়ে বিদায় নেন ওঝা।


নিহতের চাচা মনিরুদ্দিন বলেন, দুই হাসপাতালে নেয়ার পর তারা আমার ভাতিজাকে মৃত বলেন। কিন্তু আমাদের মন বুঝে না। তাই ভাতিজাকে সুস্থ করে তোলার জন্য যে যা বলছে তাই করছি। ওঝারা নাকি সাপে কাটা রোগী ভালো করতে পারে। সে জন্য একাধিক ওঝাকে ডাকা হয়েছিল। সারারাত কবিরাজির পর সকালে ওঝা বলেন, ডাক্তার বাঁধ না খুললে সে রোগীকে বাঁচাতে পারতো। ওঝার পেছনে আমাদের ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য মতে,  তাহিরপুরে ৩০ টি, বিশ্বম্ভরপুরে ২০টি, ধর্মপাশায় ২০টি, দিরাই ২০টি,  শান্তিগঞ্জে ২০টি, জামালগঞ্জে ১০টি, ছাতকে ১০টি, দোয়ারাবাজারে ৫০ টি, জগন্নাথপুর ২০টি, শাল্লা ২০ টি এন্টিভেনম আছে। সদর হাসপাতালে আছে শতাধিক এন্টিভেনম। 

 


সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন বলেন,  ওঝা-কবিরাজির বৈজ্ঞানিক কোন ভিত্তি নেই। এটি অপচিকিৎসা। কবিরাজির মাধ্যমে ক্ষতি ছাড়া কোন লাভ হবে না। আমাদের প্রত্যেকটি উপজেলা হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমানে এন্টিভেনম মওজুদ আছে। তাই সাপে কাটার পর সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে আসতে হবে। হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ্য করে তোলা সম্ভব।


সাপে কাটলে করণীয়


আক্রান্ত ব্যক্তিকে বারবার আশ্বস্ত করতে হবে এবং সাহস দিতে হবে, আতঙ্কগ্রস্ত হতে দেওয়া যাবে না। নির্বিষ সাপের কামড়েও আতঙ্কিত হয়ে মানসিক আঘাতে মারা যেতে পারে। বাংলাদেশের অধিকাংশ সাপই বিষহীন, অল্প কিছু সাপ বিষধর। আবার বিষধর সাপ পর্যাপ্ত বিষ ঢুকিয়ে দিতে ব্যর্থ হতে পারে। এসব জানানোর মাধ্যমে রোগীকে আশ্বস্ত করা যেতে পারে।

 


আক্রান্ত অঙ্গ অবশ্যই স্থির রাখতে হবে। হাতে কামড়ালে হাত নাড়ানো যাবে না। পায়ে  কামড়ালে হাঁটাচলা করা যাবে না, স্থির হয়ে বসতে হবে।
আক্রান্ত অঙ্গ ব্যান্ডেজের সাহায্যে একটু চাপ দিয়ে প্যাঁচাতে হবে। একে প্রেসার ইমোবিলাইজেশন বলে। ব্যান্ডেজ না পাওয়া গেলে গামছা, ওড়না বা এ জাতীয় কিছু ব্যবহার করা যেতে পারে।
আক্রান্ত স্থান সাবান দিয়ে আলতোভাবে ধুতে হবে অথবা ভেজা কাপড় দিয়ে আলতোভাবে মুছতে হবে।
ঘড়ি বা অলঙ্কার বা তাবিজ, তাগা ইত্যাদি পড়ে থাকলে খুলে ফেলুন।
রোগীকে আধশোয়া অবস্থায় রাখুন।

 


যদি রোগী শ্বাস না নেন তাহলে তাকে মুখে শ্বাস দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।


যদি সাপটিকে ইতোমধ্যে মেরেই ফেলেন, তাহলে সেটি হাসপাতালে নিয়ে আসুন। তবে এ ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কোনোভাবেই হাত দিয়ে ধরা যাবে না। কিছু সাপ মরার ভান করে থাকে। তবে সাপ মারতে গিয়ে অযথা সময় নষ্ট করবেন না।


যত দ্রুত সম্ভব আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। বিষ প্রতিষেধক বা অ্যান্টিভেনম কাছাকাছি সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে পাওয়া যায়।
যা করা যাবে না

 


না জেনে আমরা এমন কিছু কাজ করি, যা রোগীর জন্য ক্ষতিকর হয়ে যায়। তাই এ ব্যাপারে সঠিক ধারণা থাকা জরুরি।
কোনো ধরনের শক্ত বাঁধন/গিঁট দেওয়া যাবে না। সাধারণত দেখা যায়, হাত বা পায়ে কামড় দিলে, কামড়ানো জায়গা থেকে ওপরের দিকে দড়ি বা এ জাতীয় কিছু দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হয়, যাতে বিষ ছড়িয়ে না পড়ে। কিন্তু এর বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। বরং এতে হাত/পায়ে রক্ত প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হয়। ফলে রক্ত প্রবাহের অভাবে টিস্যুতে পচন (ঘবপৎড়ংরং) শুরু হতে পারে।
চিকিৎসার জন্য ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়া যাবে না।


কামড়ানোর স্থানে ব্লেড, ছুরি দিয়ে কাটাকুটি করা যাবে না।
অনেক মানুষের ধারণা, আক্রান্ত স্থানে মুখ লাগিয়ে চুষে বিষ বের করলে রোগী ভালো হয়ে যাবেন। বিষ রক্ত ও লসিকার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা এভাবে বের করা সম্ভব নয়। কোনো অবস্থাতেই আক্রান্ত স্থানে মুখ দেবেন না।
কোনো ভেষজ ওষুধ, লালা, পাথর, উদ্ভিদের বীজ, গোবর, কাদা ইত্যাদি লাগানো যাবে না।
কোনো রাসায়নিক পদার্থ লাগানো বা তা দিয়ে সেঁক দেওয়া যাবে না।


যদি আক্রান্ত ব্যক্তির গিলতে বা কথা বলতে সমস্যা হয়, বমি, অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, নাসিক কণ্ঠস্বর ইত্যাদি দেখা দেয় তাহলে কিছু খাওয়ানো যাবে না।
কিছু খাইয়ে বমি করানোর চেষ্টা করা যাবে না।
ব্যাথার জন্য অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ খাওয়ানো যাবে না।

উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার