প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৪১
শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই ধরাধামে আবির্ভূত হন দুটি মহান উদ্দেশ্য সাধনের জন্য—সাধুদের পরিত্রাণ এবং দুষ্কৃতকারীদের সংহার। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যশোদা—নন্দন রূপে আবির্ভূত হয়ে একজন আজ্ঞাপালনকারী পুত্রের মতো আচরণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁকে কখনোই একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। তিনি পরমেশ্বর, সর্বশক্তিমান ও সর্বকারণের কারণ।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অসাধারণ শক্তির প্রকাশ ঘটেছে তাঁর সমগ্র লীলাজীবনে। পৃথিবীর ভারস্বরূপ অসংখ্য অত্যাচারী ও দুষ্কৃতকারী তাঁর দ্বারা বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছে। কংস, জরাসন্ধ, শিশুপালসহ বহু অসুর ও অত্যাচারীর বিনাশের মাধ্যমে তিনি ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি যেমন দুষ্টের দমন করেছেন, তেমনি ভক্তের রক্ষাকর্তা হিসেবেও নিজেকে প্রকাশ করেছেন। ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করার জন্য তিনি নৃসিংহ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
ভগবান কখনো সাকার, আবার কখনো নিরাকার রূপে উপলব্ধ হন। তাঁর নিরাকার রূপকে ব্রহ্ম বলা হয়। তিনি সর্বশক্তিমান বলেই তাঁর শক্তির কোনো সীমা নেই। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় তিনি ঘোষণা করেছেন—“অহং সর্বস্য প্রভবঃ”—অর্থাৎ, আমিই সমস্ত কিছুর উৎস। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই, তাঁর চেয়ে মহানও কেউ নেই।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কখনো পুত্ররূপে, কখনো সখারূপে, কখনো প্রিয়তমরূপে তাঁর ভক্তদের সঙ্গে অপ্রাকৃত লীলাবিলাস করেন। তাঁর লীলা জাগতিক কোনো কর্মের সঙ্গে তুলনীয় নয়। তিনি নিত্য, অবিনশ্বর ও চিরন্তন। তাঁর কখনো মৃত্যু হতে পারে না, আবার তিনি চিরতরে অস্তিত্বহীনও হতে পারেন না। তাঁর অস্তিত্ব নিত্য।
জীবাত্মাকে তাঁর নিত্য আনন্দময় ধাম গোলক বৃন্দাবনে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ভগবান যুগে যুগে বিভিন্ন রূপে এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। তাই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় তিনি বলেছেন—“সম্ভবামি যুগে যুগে।” যখনই ধর্মের অবক্ষয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান ঘটে, তখনই তিনি ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আবির্ভূত হন।
ভগবানের জন্ম সাধারণ মানুষের জন্মের সঙ্গে তুলনীয় নয়। তাঁর জন্ম, কর্ম ও লীলা—সবই অপ্রাকৃত ও দিব্য। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান বলেছেন—“জন্ম কর্ম চ মে দিব্যম্”। সাধারণ জীব কর্মফল ভোগ করার জন্য এক দেহ ত্যাগ করে অন্য দেহ ধারণ করে। কিন্তু ভগবানের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি কর্মফলের অধীন নন। নিজের চিন্ময় শক্তির দ্বারা চিন্ময় দেহ ধারণ করে নিজ ইচ্ছায় পৃথিবীতে আবির্ভূত হন এবং দিব্য লীলা প্রকাশ করেন।
ভগবান যেহেতু সর্বত্র বিরাজমান, তাই তিনি যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে এবং যেকোনো রূপে তাঁর ভক্তের কাছে আবির্ভূত হতে পারেন। ভক্তের আন্তরিক ডাক তাঁর কাছে পৌঁছায়। তাই জীবনের সুখে—দুঃখে, আনন্দে—বিষাদে আমাদের উচিত পরমেশ্বর ভগবানের শরণাগত হওয়া এবং তাঁর কৃপা ও আশীর্বাদ প্রার্থনা করা।
জন্মাষ্টমী কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি ভক্তি, ন্যায়, সত্য, প্রেম ও ধর্মের চিরন্তন বিজয়ের স্মারক। এই পবিত্র তিথিতে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের মাহাত্ম্য স্মরণ করার পাশাপাশি তাঁর শিক্ষাকে জীবনে ধারণ করাই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সত্য ও ন্যায়ের পথে চলাই শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষার মূল কথা। তাই জন্মাষ্টমীর এই পবিত্র দিনে হিংসা, অহংকার ও বিদ্বেষ পরিহার করে প্রেম, ভক্তি ও মানবতার পথে চলার সংকল্প করি।
জয় শ্রীকৃষ্ণ।
লেখক : কলাম লেখক, সিলেট
উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন