দেশের কার্ডিয়াক সার্জারিতে নতুন সম্ভাবনার নেপথ্যে সুনামগঞ্জের কৃতী চিকিৎসক

প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯:২০

অধ্যাপক ডা. মো. ফাইজুস সাজ্জাদ

“ও ডাক্তার, ও ডাক্তার... আপনি যখন করবেন আমার ওপেন হার্ট সার্জারি, দেখবেন হার্টের মাঝখানে একটা মেয়ে রূপসী ভারি”—গানটি শুনলেই মনে হতে পারে, ডাক্তার মাত্রই বুঝি ওপেন হার্ট সার্জারিতে পারদর্শী! বাস্তবে হার্টের সার্জারি বা অস্ত্রোপচার একটি অত্যন্ত জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাপদ্ধতি। কৃত্রিম যন্ত্রের সাহায্যে রোগীর রক্তসঞ্চালন ও ফুসফুসের কার্যক্রম স্বাভাবিক রেখে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে হৃদ্‌যন্ত্রের অবরুদ্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত ধমনি কিংবা ভাল্‌ভের প্রতিস্থাপন ও পুনর্গঠন করতে হয়। এ জন্য একজন ডাক্তারকে কার্ডিয়াক সার্জন হতে হলে দীর্ঘ ও নিবিড় প্রশিক্ষণ নিতে হয় এবং প্রয়োজন হয় বিশেষায়িত অপারেশন থিয়েটার। 

বাংলাদেশে প্রথম সফল ওপেন হার্ট সার্জারি ১৯৮১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও জাপানের একটি যৌথ চিকিৎসক দল তৎকালীন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের আওতাধীন ‘ইনস্টিটিউট অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজেস’-এ সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটিকে জাতীয় হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রূপান্তর করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা ও সার্জারির বিস্তার ঘটে। তবে আমাদের রোগীদের মধ্যে এখনও অনেক ক্ষেত্রে আস্থার সংকট দেখা যায়। ফলে তাঁদের অনেকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ, অথবা সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে ছুটেন।

আবার হার্টের সার্জারির কথা উঠলে অবধারিতভাবেই ভারতের প্রখ্যাত কার্ডিয়াক সার্জন ডা. দেবী শেঠির নাম আসে। ভারতফেরত রোগীদের মুখে তাঁর নানা অভিজ্ঞতার কথা শোনা যায়। ২০২৫ সালের ২ আগস্ট ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সফল বাইপাস সার্জারি সম্পন্ন হয়। বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সক্ষমতা থাকার পরেও দেশীয় চিকিৎসকদের ওপর আস্থা রাখার কারণে ডা. শফিকুর রহমান যেমন প্রশংসিত হন, তেমনি কার্ডিয়াক সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর কবিরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে বেশ আলোচিত হন। এসব আলোচনার বাইরে কার্ডিয়াক সার্জারির জগতে নীরবে-নিভৃতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন আরেকজন কার্ডিয়াক সার্জন—অধ্যাপক ডা. মো. ফাইজুস সাজ্জাদ। 

ডা. মো. ফাইজুস সাজ্জাদ আমাদের সুনামগঞ্জের সন্তান। স্থানীয় অনেকের কাছে ‘ডা. রাজীব’ নামেও পরিচিত। এই কৃতী চিকিৎসক ১৯৮০ সালে সুনামগঞ্জ জেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা অ্যাডভোকেট আলহাজ্ব আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসাইন সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির একজন প্রবীণ ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং ‘সুনামগঞ্জ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ (প্রথম প্রকাশ: ডিসেম্বর ১৯৯৫) গ্রন্থের প্রণেতা।

তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে ১৯৯৫ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ১৯৯৭ সালে ঢাকার নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ২০০৪ সালে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। এরপর কার্ডিয়াক সার্জারিতে ক্যারিয়ার গড়ার দিকে মনোনিবেশ করেন। ২০১৩ সালে মাস্টার অব সার্জারি (MS) ইন কার্ডিওথোরাসিক সার্জারি এবং ২০১৬ সালে কার্ডিওভাসকুলার সার্জারিতে এফসিপিএস (FCPS) ডিগ্রি অর্জন করেন। এখানেই থেমে যাননি। রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস অব ইংল্যান্ড, আমেরিকান কলেজ অব সার্জনস এবং আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি থেকেও ফেলোশিপ অর্জন করেন। সর্বশেষ, তাঁর অসামান্য গবেষণা অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৩ সালে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর তাঁকে মেডিসিন বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করে।

তাঁর গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো হৃদ্‌যন্ত্রের ভাল্‌ভ-সংক্রান্ত চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসা প্রযুক্তিতে তাঁর অবদান। তিনি “Devices and Uses Thereof for Heart Valve Repair” শীর্ষক একটি উদ্ভাবনের সহ-উদ্ভাবক। এর আগে তিনি “Heart Chamber for In-vitro Analysis of Mitral Valve” শীর্ষক উদ্ভাবনেরও সহ-উদ্ভাবক হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া “Surgical Retractor Device” শীর্ষক একটি সার্জিক্যাল ডিভাইসের উদ্ভাবনেও তিনি সহ-উদ্ভাবক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। এসব একাডেমিক ও পেশাগত সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সম্মাননাও অর্জন করেছেন। এর মধ্যে NUHS Education Collaboration Award (২০২২) এবং Outstanding Mentor Award, NUS (২০২১) উল্লেখযোগ্য।

ডা. মো. ফাইজুস সাজ্জাদের বাংলাদেশ, সিঙ্গাপুর এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রায় ২০ বছরের ক্লিনিক্যাল ও গবেষণার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০১৯ সালে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরে অ্যাকাডেমিক কার্ডিয়াক সার্জন হিসেবে যোগ দেন এবং কার্ডিওথোরাসিক ও ভাসকুলার সার্জারি বিষয়ে গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রমে যুক্ত হন। ইতোমধ্যে ৪,০০০-এরও বেশি সফল ওপেন হার্ট সার্জারি সম্পন্ন করেছেন। তাঁর এই অস্ত্রোপচার-অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে গত কয়েক বছরে তিনি ২০০টিরও বেশি পরীক্ষামূলক হার্ট সার্জারি ও উদ্ভাবনী কার্ডিয়াক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। তাঁর একাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রম কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞানচর্চা ও প্রথাগত অস্ত্রোপচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হৃদ্‌যন্ত্রের ভাল্‌ভ রোগের চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার পদ্ধতির উন্নয়ন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যবহারিক প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সঙ্গেও প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত। 

তিনি পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত জীবন ও পেশাগত সম্ভাবনার হাতছানিকে উপেক্ষা করে দেশের টানে, দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে ২০২৫ সালের শেষদিকে দেশে ফিরে ঢাকায় নবপ্রতিষ্ঠিত ইউনিকো হাসপাতালে কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও কো-অর্ডিনেটর হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন নিছক একজন চিকিৎসকের দেশে ফিরে আসা নয়; বরং এটি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় অর্জিত আন্তর্জাতিক জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর এক অনন্য প্রত্যয়।

ডা. মো. ফাইজুস সাজ্জাদ শুধু সুনামগঞ্জের গর্ব নন, তিনি আমাদের দেশেরও গর্ব। তাঁর মতো দেশপ্রেমিক ও দক্ষ কার্ডিয়াক সার্জনদের হাত ধরে দেশের হৃদ্রোগ চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার সূচনা হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। 

লেখকঃ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও জেনারেল প্র্যাকটিশনার, গ্রীন লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সুনামগঞ্জ।

উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার