প্রকাশিত: ০৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ২১:৫৩
এক বছরে ৭শ’ ব্যাগ রক্তের সংগ্রাহক বাঁধন
‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ এই অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দিতে মানবতার সেবায় নিবেদিত সংগঠন বাঁধন প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বাঁধন শুধু রক্ত দেওয়ার সংগঠন নয়, এটি মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের তরুণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে সংগঠিত এই প্রতিষ্ঠান আজ দেশের প্রতিটি জেলায় জীবন বাঁচানোর এক নির্ভরযোগ্য ঠিকানা হয়ে উঠেছে।
দুর্ঘটনা, অস্ত্রোপচার, ডেঙ্গু, থ্যালাসেমিয়া সহ যে কোনো সংকটে বাঁধনের সদস্যরা ছুটে যায় মানুষের পাশে। তাদের রাতের ঘুম ভেঙে যায় ফোন কলের শব্দে, কিন্তু মনোবল ভাঙে না। কারণ তারা জানে, তাদের রক্তে বাঁচবে জীবন। আজ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমরা বাঁধনের সেই সব নিরলস স্বেচ্ছাসেবীকে সম্মান জানাই, যারা নিজের স্বার্থের আগে মানুষের জীবনকে গুরুত্ব দিয়েছে। আমরা সেই সব রক্তদাতা ভাই-বোনকেও শ্রদ্ধা জানাই, যারা নিজের শরীর থেকে রক্ত দিয়ে অন্যকে নতুন জীবন উপহার দিয়েছেন। মানবসেবা কেবল কথায় নয়, কাজে প্রকাশ পায়।
বৃহস্পতিবার সকালে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত বাঁধন, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ ইউনিটের ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, দায়িত্ব হস্তান্তর ও বার্ষিক সাধারণ সভা উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলছিলেন সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক তানবীর আহম্মেদ আখঞ্জী।
.jpg)
প্রত্যন্ত হাওরের জেলা সুনামগঞ্জ। শিক্ষা ও স্বাক্ষরতার হার অন্যান্য জেলার তুলনায় কম হওয়ায় রক্তদানে আগ্রহ কম ছিল মানুষের। জরুরি মূহুর্তে মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ বাঁচাতে দিশেহারা হতো মানুষকে। তবে এখন দিন দিন বাড়ছে রক্তের যোগান। সচেতন হচ্ছেন মানুষ, এগিয়ে আসছেন রক্তদানে। এই কাজটি করে যাচ্ছে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংগঠন বাঁধন, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ ইউনিট। গত এক বছরে সুনামগঞ্জে বিনামূল্যে ৬৮২ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে মুমূর্ষু রোগীর কাছে পৌঁছে দিয়েছে সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক এই সংগঠনটি। পাশাপাশি ১২৬ জন নতুন রক্তদাতা তৈরি করে ৪ হাজার মানুষকে জানিয়ে দিয়েছে নিজের রক্তের গ্রুপ। বার্ষিক সাধারণ সভার সাংগঠনিক প্রতিবেদন থেকে আশা জাগানো এসব তথ্য জানা যায়।
পায়রা উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বাঁধন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসিম উদ্দিন হল ইউনিটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া এবং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো মাহবুবুর রহমান। পরে সরকারি কলেজ ইউনিটের ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বের হয় আনন্দ র্যালি। বাঁধন, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ ইউনিটের সভাপতি আবু তাহের হিরণের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক ওয়েছুর রহমানের সঞ্চালনায় র্যালি শেষে আলোচনা সভায় রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আহসান শহীদ আনসারী বলেন- মানবসেবামূলক কাজে নিজেকে যুক্ত রাখার ক্ষেত্রে ‘বাঁধন’ একটি অসাধারণ প্ল্যাটফর্ম। এই সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ রয়েছে। মানুষের প্রতি মানবতাবোধকে হৃদয়ে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায় বাঁধন।
বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, মানুষ আসলে একসাথে তিনটি ভূমিকা পালন করে এবং তিনটি সমান্তরাল জগতে বাস করে। প্রথমটি হলো পারিবারিক ভূমিকা, যা রক্তের সম্পর্ক ও দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে আসে। দ্বিতীয়টি ‘রোল অফ ম্যানকাইন্ড’ সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা। বাঁধনের কর্মীরা ঠিক এই স্থানটিতেই নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে; তারা মানবসেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের চেয়ে ভিন্ন একটি অবস্থানে পৌঁছে যায়। পৃথিবীর সব ভালো মানুষই বাঁধনের সঙ্গে যুক্ত- এটা হয়তো পুরোপুরি সত্য নয়, তবে এটুকু সত্য যে যারা বাঁধনের কাজ করে তারা সবাই ভালো মানুষ, কিংবা বাঁধনের কাজ করতে করতেই তারা ভালো মানুষ হয়ে ওঠে।
ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইভা রায় বলেন, মানুষ হলে কেমন হতে হয়, মানুষ হওয়ার আসল মানেটা কী- এ প্রশ্নগুলো আমাদের নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। আমার বিশ্বাস বাঁধনে যারা কাজ করছে তারা মানুষ হওয়ার এই প্রকৃত অর্থ অন্তত কিছুটা হলেও বুঝতে পারছে এবং সেটা তাদের কর্মকাণ্ডেই প্রতিফলিত হচ্ছে।
বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর রোখসানা চৌধুরী বলেন, মানুষ হিসেবে সর্বোচ্চ পরিচয়ের প্রমাণ হলো- স্বার্থহীনভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। রক্তদান সেই মহান মানবিকতারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ, যেখানে একজন মানুষ নিজের শরীরের অমূল্য অংশ অন্য মানুষের প্রাণ বাঁচাতে দেয়, কোনো প্রকার স্বার্থ ছাড়াই। এটাই মানবতার সর্বোচ্চ প্রকাশ।
বিশেষ অতিথি শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুর রকিব বলেন, বাঁধন সরকারি কলেজ ইউনিট গত সাত বছর ধরে যে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তাদের রক্তদান কর্মসূচি হোক বা রক্তের গ্রুপ নির্ণয় কর্মসূচি- আমি মনে করি, এগুলো সামাজিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। রক্তদান কোনো সাধারণ কাজ নয়; এখানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র- কোনো ভেদাভেদ থাকে না। একজন মানুষের রক্ত আরেকজন মানুষের জীবন বাঁচায়, আর বাঁধন সেই মহান কাজটি নিষ্ঠার সঙ্গে করে যাচ্ছে।
প্রধান অতিথি অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, আমাদের এই সংগঠন ‘বাঁধন’ যেন ঝরনার গতিতে এগিয়ে চলে। নদীতে গেলে প্রবাহের গতি কিছুটা কমে যায়, কিন্তু ঝরনার গতি থাকে আরও তীব্র ও শক্তিশালী। আমার প্রত্যাশা- বাঁধনের কার্যক্রমও ঠিক সেই ঝরনার মতো দ্রুত, প্রাণবন্ত ও ধারাবাহিক গতিতে সামনে এগিয়ে যাক। অনুষ্ঠান শেষে নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা ও দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়।
জেলা প্রশাসক ড মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, আমরা বাংলা ছায়াছবিতে দেখতাম রক্তের অভাবে মানুষ মারা যাচ্ছে। নায়িকার জরুরি সময়ে রক্তের প্রয়োজনে নায়ক এসে রক্ত দিচ্ছে। সিনেমায় এই দৃশ্যটা দেখা গেলেও বাস্তবে এটা আর এখন দেখা যায় না। এই দৃশ্য পালটে দিয়েছে বাঁধন। সাধারণ মানুষের জন্য এই কাজটা করছে তারা। বাঁধন যেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেখানে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গত কয়েকবছর মারামারি কাটাকাটি যা নানাভাবে বদনাম হয়েছে। এর মধ্যে বাঁধন উজ্জ্বল একটা দৃষ্টান্ত যার কোন বদনাম নাই। সুনামগঞ্জেও বাঁধন সেই সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সুনামের অন্যতম একটা নাম হবে বাঁধন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাঁধন উপদেষ্টা, সহযোগী অধ্যাপক মো ইনান উদ্দিন, রেড ক্রিসেন্ট জেলা কমিটির সদস্য আশরাফ হোসেন, উপদেষ্টা হাফিজুর রহমান লিটন, সোহানুর রহমান সোহান, দক্ষিণ সুরমা কলেজ ইউনিটের সাংগঠনিক সম্পাদক নিলয় দাস। এসময় উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা আয়েশা আক্তার, সুনামগঞ্জ পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম কয়েস।
নতুন কমিটিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত যারা
জোনাল প্রতিনিধি আবু তাহের হিরণ, সভাপতি মো. অয়েছুর রহমান, সহ-সভাপতি তাজকিরা হক তাজিন, তামান্না আক্তার, সাধারণ সম্পাদক তাকবির হোসেন, সহ-সাধারণ সম্পাদক বায়েজিদ আল সামায়ুন, সাংগঠনিক সম্পাদক মৌরিন আক্তার, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ইমামুল হক কোষাধ্যক্ষ তৌহিদুর রহমান শুভ, দপ্তর সম্পাদক সাজিদুর রহমান, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক খাদিজা তাবাচ্ছুম জুই, তথ্য ও শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আকাশ আহমেদ , নির্বাহী সদস্য জহিরুল হক, মোছা. সামিয়া আক্তা, প্রান্ত সরকার , প্রতিক হাসান সায়মন, তুহিন হাসান।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন