প্রকাশিত: ০৬ মার্চ, ২০২৬ ২২:৫৮
দেশের বোরো ফসলের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত জেলার হাওরাঞ্চলে প্রথমবারের মতো স্থাপন করা হয়েছে ‘রাইস মিউজিয়াম’ বা ধান জাদুঘর। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-এর উদ্যোগে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে ৫১ টি জাতের ধান নিয়ে সাজানো হয়েছে এই ব্যতিক্রমী জাদুঘর। আধুনিক ও উচ্চফলনশীল জাতের ধানের সাথে কৃষকদের পরিচয় করিয়ে দিতেই এই আয়োজন।
সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরের দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠে বছরে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন বোরো ধান উৎপাদন হয়। যার বাজার মূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সাথে জড়িত প্রায় ১০ লাখ কৃষক। কিন্তু আধুনিক ও উচ্চফলনশীল অনেক জাত সম্পর্কে এখনো অন্ধকারে তারা। চিরাচরিত ৪-৫টি জাতের বাইরে কৃষকদের ধারণা দিতেই শান্তিগঞ্জের সাংহাই হাওরপাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে এক জীবন্ত ‘রাইস মিউজিয়াম’।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের এই উদ্যোগে একটি জমিতেই রোপণ করা হয়েছে ৫১টি জাতের ধান। এতে রয়েছে বোরো মওসুমের জাত সমূহ হলো ব্রি ধান ১১৪, ব্রি ধান ১১৩, ব্রি ধান ১০৮, ব্রি ধান ১০৭, ব্রি ধান ১০৫, ব্রি ধান ১০৪, ব্রি ধান ১০২, ব্রি ধান ১০১, ব্রি ধান ১০০, ব্রি ধান ৯৯, ব্রি ধান ৯৭, ব্রি ধান ৯৬, ব্রি ধান ৯২, ব্রি ধান ৮৯, ব্রি ধান ৮৮, ব্রি ধান ৮৪, ব্রি ধান ৮১, ব্রি ধান ৭৪, ব্রি ধান ৬৯, ব্রি ধান ৬৮, ব্রি ধান ৬৭, ব্রি ধান ৬৪, ব্রি ধান ৬৩, ব্রি ধান ৬০, ব্রি ধান ৫৯, ব্রি ধান ৫৮, ব্রি ধান ৫৫, ব্রি ধান ৫০, ব্রি ধান ৪৭, ব্রি ধান ৪৫, ব্রি ধান ৩৬, ব্রি ধান ৩৫, ব্রি ধান ২৯, ব্রি ধান ২৮, বি আর ২৬, বি আর ১৯, বি আর ১৮, বি আর ১৭, বি আর ১৬, বি আর ১৫, বি আর ১৪, বি আর ১২, বি আর ২৬, বি আর ৮, বি আর ৭, বি আর ৬, বি আর ৩, বি আর ১, ব্রি হাইব্রিড ধান ২, ব্রি হাইব্রিড ধান ৩, ব্রি হাইব্রিড ধান ৫ ও ব্রি হাইব্রিড ধান ৮ সহ উচ্চফলনশীল জাত।
উজানীগাঁও গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট আমাদের এখানে পরীক্ষামূলকভাবে ৫১ জাতের ধানের চাষ করেছে। সত্যি বলতে, এত জাতের ধান যে হতে পারে, তা আমাদের আগে জানাই ছিল না। আমরা গভীরভাবে এই চাষাবাদ পর্যবেক্ষণ করছি। আমাদের এলাকার আবহাওয়া ও মাটির উপযোগী যে জাতটি সবচেয়ে বেশি ফলন দেবে, কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী আগামীতে আমরা সেটিই চাষ করার চেষ্টা করবো।
একই গ্রামের কৃষক মংলামিয়া বলেন, একসাথে ৫১ জাতের ধানের আবাদ এই এলাকায় আমরা আগে কখনো দেখি নি। এটি আমাদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা। এখন আমরা দেখার অপেক্ষায় আছি কোন জাতটি ভালো ফলন দেয়। কৃষি কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, এখান থেকে লাভজনক জাতটি বেছে নিয়ে চাষ করলে আমরা অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি লাভবান হতে পারব।
আরেক কৃষক শিপন মিয়া বলেন, আগে আমরা চিকন চালের ধান চাষ করতাম, কিন্তু বীজ সংকটের কারণে বর্তমানে মোটা ধানের আবাদ করতে হচ্ছে। এখন আমাদের বাড়ির পাশেই ৫১ জাতের ধানের প্রদর্শনী করা হয়েছে। আমরা ফলনের তুলনা করছি। যদি এখান থেকে কোনো উন্নত জাতের ভালো ফলন পাওয়া যায়, তবে আগামী মৌসুমে আমরা নিশ্চিতভাবেই সেই নতুন জাতের চাষ শুরু করব।
উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও সুনামগঞ্জ ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান ড. মো. রেজওয়ান ভূঁইয় বলেন, হাওরের প্রতিকূল পরিবেশে কোন জাতটি সবচেয়ে বেশি ফলন দেয়, তা কৃষকরা এখন নিজ চোখেই যাচাই করতে পারবেন। এবং উপযোগী জাত নির্বাচন করে কৃষকরা এখন ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয় থেকেই দ্রুত বীজ সহায়তা পাবেন। এতে দেশীয় উন্নত জাত চাষ করলে বীজ আমদানির নির্ভরতা কমবে এবং দেশের টাকা দেশেই থাকবে।
মাঠ পর্যায়ে এমন প্রদর্শনী ধান চাষে বিপ্লব আনবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে- এমনটাই প্রত্যাশা কৃষি বিজ্ঞানীদের।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন