প্রকাশিত: ২৮ মার্চ, ২০২৬ ২২:১৮
সু.খবর ছবি
এক সময়ের খরস্রোতা নদী, যেখানে বছরজুড়ে চলত বড় বড় লঞ্চ আর নৌকা; আজ সেই নদীর বুকেই দুলছে সবুজ ধানের শীষ। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সুনামগঞ্জের নদীগুলোর বর্তমান চিত্র এখন এমনই। জেলার ছোট-বড় ১০৬ টি নদীর বেশিরভাগই এখন নাব্যতা হারিয়ে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানি না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে সেচ কাজ, আর বর্ষায় বাড়ছে বন্যার ঝুঁকি।
দিগন্ত জোড়া সবুজ ধানের মাঠ দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি এক সময়কার প্রমত্তা নদী। যেখানে বছরজুড়ে চলত বড় বড় লঞ্চ আর নৌকা, আজ সেখানে দুলছে ফসলের শীষ। কোথাও মানুষ হেঁটে পারাপার করছে, কোথাও গরু চড়ছে, আবার কোথাও চলছে ছোট ছোট যানবাহন। এমনই একটি সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পুরাতন সুরমা নদী। পৈন্দা হরিপুর থেকে শুরু হয়ে দিরাই উপজেলার করিমপুরে গিয়ে কালনী নদীর সাথে মিলিত হয়েছে নদীটি। ৩৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নদীর প্রস্থ ১৩০ মিটার। বর্ষায় উজানের ঢলের সাথে আসা পলিতে ভরাট হয়ে এক সময়ের খরস্রোতা নদীর ছন্দ আজ স্তব্ধ। যে নদী ছিল মাছের ভাণ্ডার আর ফসিল জমি সেচের প্রধান উৎস, নাব্যতা হারিয়ে সেটি এখন শুধুই স্মৃতি।
জামলাবাজ গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ সেলিম রেজা বলেন, একসময় আমরা গরু নিয়ে সাঁতার কেটে নদী পার হয়েছি এবং নদীতে মাছ ধরেছি। কিন্তু বর্তমানে নদীটি প্রায় শুকিয়ে গেছে; এখন সেখানে ফুটবল খেলা হয়। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় কৃষি জমিতে সঠিকভাবে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই নদীটি খননের মাধ্যমে আগের রূপ ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছি।
একই গ্রামের আব্দুল গফুর বলেন, আগে এই সুরমা নদী দিয়ে বড় বড় লঞ্চ ও নৌকা চলাচল করত। কিন্তু এখন নদী শুকিয়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় মানুষ ধান চাষ করছে। নদীটি পুনঃখনন করা হলে আবার আমরা নদীর পানি ব্যবহার করে কৃষি কাজে উপকৃত হতে পারবো।
ফরিদ আলী বলেন, নদীর অধিকাংশ অংশ ভরাট হয়ে গেছে। বর্তমানে মানুষ নদীর উপর দিয়ে যাতায়াত করছে, এমনকি কোথাও কোথাও খেলাধুলার মাঠও তৈরি হয়েছে। অথচ একসময় এই নদী দিয়ে লঞ্চ-স্টিমার চলাচল করত এবং পাশের জমিতে সেচের জন্য নদীর পানি ব্যবহার করা হতো।
মহিবুর রহমান বলেন, আগে এই নদীতে মাছ ধরা ও জমিতে সেচ দেওয়া হতো। তখন নদীতে ২০-৩০ হাত পানিও ছিল। কিন্তু এখন টিউবওয়েলেও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় না। নদীটি পুনঃখনন করা হলে গ্রামবাসী আবারও উপকৃত হবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শুধু পুরাতন সুরমা নয়; মহাসিং, কালনী, সুমেশরী কিংবা ডাউকীসহ—জেলার ১০৬টি নদীর বেশিরভাগই একই দশা। শুষ্ক মৌসুমের প্রায় ৫ মাস পানির দেখা মেলে না এসব নদীর অধিকাংশ অংশে।
হাওর, নদী ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, সুনামগঞ্জ একটি নদীমাতৃক অঞ্চল, যেখানে অধিকাংশ নদী হাওরের সঙ্গে সংযুক্ত। এসব নদী দিয়ে হাওরের পানি নিষ্কাশন ও প্রবাহ স্বাভাবিক থাকত। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ নদী নাব্যতা হারিয়েছে। তিনি বলেন, দ্রুত এসব নদী খনন না করা হলে বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়বে। বিশেষ করে পাহাড়ি ঢলের পানি ধারণ করতে না পেরে হাওর প্লাবিত হয়। তাই তিনি পরিকল্পিতভাবে মাস্টার প্ল্যানের আওতায় নদী খননের দাবি জানান এবং অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের বিরোধিতা করেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (পওর-১) মামুন হাওলাদার বলেন, ফিজিক্যাল স্টাডির মাধ্যমে সুনামগঞ্জের ১৯টি নদী খননের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ১৪টি নদী খনন করা হবে এবং পরবর্তীতে বাকি ৫টি নদীও পর্যায়ক্রমে খননের আওতায় আনা হবে। তিনি জানান, নদী খননের জন্য ১৪০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, যা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আগাম বন্যার ঝুঁকি কমবে এবং বাঁধ ভেঙে ফসলহানির ঘটনাও হ্রাস পাবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন