প্রকাশিত: ০৭ এপ্রিল, ২০২৬ ২২:৩২
থেমে থেমে বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে জেলার অনেক কৃষকের সোনার ফসল। জেলার দেখার হাওর, ঝাওয়ার হাওর, শনির হাওর ও ছায়ার হাওরসহ বিভিন্ন এলাকার নিচু জমি পানির নিচে চলে যাওয়ায় পচে যাচ্ছে কাঁচা ধান। কৃষকরা বলছেন, যেসব ধান এখনো টিকে আছে, সেগুলো ঘরে তোলা নিয়ে তারা চরম শঙ্কায় রয়েছেন। জমিতে পানি ও কাদা জমে থাকায় এবার কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন নামানো প্রায় অসম্ভব হবে। একদিকে ফসলহানি, অন্যদিকে শ্রমিক সংকট ও যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
ঝাওয়ার হাওরের কৃষক সমির উদ্দিন বলেন, ডুবরায় (জলাবদ্ধতা) এ বছর হাওর নিয়ে গেছে। যা কিছু আছে, সেটি নিয়েই এখন বড় বিপদে আছি। মেশিন নামবে না, শ্রমিকও নেই। সরকার যদি কোনো ব্যবস্থা করে তাহলে হয়তো কিছু ধান তুলতে পারবো, না হলে সেই আশাও নেই।
কৃষক হরমুজ আলী বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিতে ধান পানিতে ডুবে গেছে। এখন যেগুলো আছে, সেগুলো কাদা পানিতে কাটা খুবই কষ্টসাধ্য। আগে বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিক আসতো, এখন সেটাও পাওয়া যাচ্ছে না।
একই সুরে কৃষক আল আমিন জানান, তার ২২ কেয়ার জমির বেশিরভাগই পানির নিচে। অবশিষ্ট জমির ধান কাটা নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।
কৃষক মো. নূর আহমদ বলেন, যেগুলো ডুবরার লাগছে এগুলোর তো আর আসে নাই। এখন যেগুলো আছে কিছু টানের জমিতে সেগুলো নিয়ে মারাত্মক চিন্তায় আছি, এই ধানই আমরা কি করে নিবো, কাটার মানুষ পাওয়া যায় না। হাওরে কাদার কারণে হারভেস্টার মেশিনও পাওয়া যাবে না। সরকার যদি কোন একটি চিন্তা করে আমাদের জন্য তাহলে হয়তো ব্যবস্থা হবে, না হলে তো আমরা খুবই চিন্তিত আছি। কারণ এটাই আমাদের একমাত্র সম্পদ সারা বছর চলার, এই একটি পেশাই আমাদের আর কোন কিছু করি না, গিরস্থি (গৃহস্থি) করেই চলি।
কৃষক মোহাম্মদ সাইদ আলী বলেন, এবছর আমরা অনেক কষ্ট করে ঋণ করে আমরা গিরস্থি করেছি। এই গিরস্থির উপরে আমাদের ভরসা। এইটা যদি মাইর যায় (নষ্ট হয়) তাহলে আমাদের আর কোন অবলম্বন নাই। এর উপর এবার পাথরে ক্ষতি করছে দুইবার, এখন করতেছে ডুবরার পানি। কাটার মানুষও পাওয়া দুষ্কর বিষয় এখন। মেশিনও এবছর হাওরে নামার কোন অবস্থা নেই। সরকার যদি কোন একটা উপায় না করে, তাহলে আমাদের আর কোন উপায় নেই এখন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ১৮৯ হেক্টর জমি প্রাথমিকভাবে জলাবদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে আগামী দিনে বৃষ্টিপাত না হলে জলাবদ্ধতা কিছুটা কমে আসবে বলে আশা করা যায়। কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা মূলত বৃষ্টিপাতের উপরই নির্ভর করে।
তিনি আরও বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে কৃষকদের ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা যায়।
এছাড়াও জেলায় বর্তমানে সচল কম্বাইন্ড হারভেস্টার রয়েছে ৫৭৭টি এবং মেরামতযোগ্য রয়েছে আরও ১০৮টি। এসব মেশিন দ্রুত সচল করতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করা হয়েছে। পাশাপাশি, এসিআই কর্তৃপক্ষ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ভাড়ার ভিত্তিতে ৫০টি হারভেস্টার সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছে। পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও হারভেস্টার সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যেসব জমিতে পানি বেশি থাকে সেখানে হারভেস্টার চালানো কিছুটা কঠিন। তবে সাধারণত ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি পানি থাকলেও মেশিন ব্যবহার করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ফসল কাটার সময় অপচয় (ক্ষতি) কিছুটা কমিয়ে আনা যাবে।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, পানি ৮ ইঞ্চির বেশি হলে হারভেস্টার ও রিপার মেশিন কার্যকর হবে না- এ বিষয়টি সরকারকে অবহিত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ফসল কাটার সময় যাতে জ্বালানি সংকট না হয়, সে জন্য প্রতি হারভেস্টারে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১২০ লিটার ডিজেল সরবরাহের জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। এছাড়া স্পেয়ার পার্টস ও সার্ভিস পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকে সেই বিষয়ে যেন ব্যবস্থা নেন।
শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় আশপাশের জেলাগুলোতে চিঠি দেওয়া হবে জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, বালুমহালগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে, যাতে শ্রমিকরা ধান কাটায় অংশ নিতে পারেন এবং আমরা এই অঞ্চলে যারা রাজনীতির সাথে জড়িত যুব যে দলগুলো আছে তাদের কাছে অনুরোধ করব, তারা যেন তাদের স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখেন। যদি রিপার মেশিন বা হারভেস্টার মেশিন কাজ না করে, সেই ক্ষেত্রে যেন আমরা ম্যানুয়ালি মানুষের সাহায্যে যেন এই কাজগুলো করতে পারি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন