চামড়া নষ্ট হওয়ার শঙ্কা

প্রকাশিত: ১৩ মে, ২০২৬ ২৩:২৫

আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করবে না জেলার কওমি মাদ্রাসাগুলো। কয়েক বছর ধরে চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। এতে জেলায় চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত আলোচনা করে সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

 


দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত চামড়া শিল্প। এর অধিকাংশ আসে কোরবানির পশু থেকে। আর এসব চামড়া সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলো। সুনামগঞ্জ জেলায় রয়েছে প্রায় চারশতাধিক কওমি মাদ্রাসা। প্রতিবছর এসব মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করে। পরে সেই চামড়া বিক্রির অর্থ জমা হয় মাদ্রাসার দরিদ্র তহবিলে। এ বছর জেলায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে ৫৩ হাজার ৪০১টি গরু। তবে বছরের পর বছর চামড়ার কাক্সিক্ষত মূল্য না পাওয়ায় এবার কোনো মাদ্রাসাই চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।


মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বলছে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া সংগ্রহ করতে পরিবহন ও শ্রমিক বাবদ বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়। এসব ব্যয় মাদ্রাসার দরিদ্র তহবিল থেকেই বহন করতে হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

 


সুনামগঞ্জ শহরের মাদানিয়া মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মুফতি মাওলানা মোস্তফা কামাল বলেন, দীর্ঘ ১১ বছর যাবৎ আমি এই মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছি। দেশবাসী জানেন যে, আমরা প্রতিবছর এই কোরবানির সময় আসলে মাদ্রাসার ছাত্র এবং শিক্ষক সকলে মিলে কোরবানির চামড়া মাদ্রাসার গরিব ফান্ডের জন্য সংগ্রহ করে থাকি। বিগত পাঁচ-সাত বছর যাবৎ আমরা দেখতেছি, এলাকার মানুষ মাদ্রাসার সুবিধার্থে মাদ্রাসার গরিব ফান্ডের জন্য তাদের কোরবানির পশুর চামড়াটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মাদ্রাসায় দিয়ে থাকেন। আমরাও ছাত্রদেরকে নিয়ে সেই চামড়াগুলো মাদ্রাসার সংগ্রহ করে থাকি। কিন্তু দেখা যায় চামড়াগুলো মাদ্রাসা পর্যন্ত পৌঁছাতে যে রিস্কা ভাড়া, ভ্যান ভাড়া, তারপরে মাদ্রাসায় এনে রাখা, ছাত্রদের পেছনে খরচ, সারাদিন কষ্ট করে ঈদের দিন ঈদের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে শুধুমাত্র গরিব ফান্ডের কথা চিন্তা করে মাদ্রাসার কাজে থাকি- এর উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ায় বিফলে যায়। দেখা দিনশেষে যখন আমরা এই চামড়াগুলো বিক্রি করতে চাই, তখন ক্রেতা পাওয়া যায় না এবং এতে কমমূল্যে বিক্রি করতে হয়। সারাদিন এর পিছনে খাটুনি দেওয়া হয়েছে, বিভিন্ন খাতে খরচ করা হয়েছে এই খরচই উঠে না।

 


একই মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা মনসুর আহমদ বলেন, আমরা সুনামগঞ্জের উলামায়ে কেরাম এবং মাদ্রাসার পরিচালকবৃন্দ, এবছর কোরবানির চামড়া কালেকশন করব না সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অন্যান্য বছর কালেকশন করে দেখেছি, যথাযথ মূল্য পাওয়া যায় না। মাদ্রাসার গরিব ছাত্রদের স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রেখে যে চামড়া আমরা কালেকশন করতাম, সেখানে আমাদের লাভ হয় না। দেখা যায় অনেক সময় ভর্তুকি দিতে হয়, ঘাটতি হয়। তাই এই গরিব ফান্ডের লস করে কোনো লাভ নেই। যথাযথ মূল্য না পাওয়ার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। অনেক সময় দেখা যায় সরকার একটা মূল্য নির্ধারণ করে দেয়, কিন্তু পাইকারা আমাদেরকে সেই মূল্য দেয় না। আমরা আসলেই মূল্য পাচ্ছি কি না সরকার সেটি তদারকিও করে না।
আরেক শিক্ষক মাওলানা রিয়াজউদ্দিন বলেন, সরকার নির্ধারণ করে যে মূল্য দেয় আমরা বিক্রি করার সময় সে মূল্য পাই না। দেখা যায় ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে সেটি একদম পানির মূল্যে নিয়ে যেতে চায়। গরিব ফান্ডের আয়ের এটি একটি উৎস। জনগণ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আমাদেরকে এই কোরবানির পশুর চামড়া দিয়ে থাকে। কিন্তু সেটি কাজে আসছে না, জনগণের প্রতি আহবান জানাই তারা যেন তাদের দান ছদকা অব্যাহত রাখেন। 

 


মাদানিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুল বছির বলেন, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল যারা কোরবানি পশুর চামড়া কালেকশন করেন, আমরা সবাই মিলে বৈঠক করেছি। উনারাও এই মতের সাথে ঐক্য পোষণ করেন যে, এ বছর আমরা কোরবানির পশুর চামড়া কালেকশন করব না। সরকার যে ফুট হিসাবে রেট নির্ধারণ করে দেয়, এই রেট ব্যবসায়ীরা দিবে তো দূরে কথা- এর অর্ধেকও দেয় না, এসব নির্দেশনা শুধু কাগজে পত্রে থাকে, বিক্রয়ের সময় রেট ছাড়াই বিক্রি করতে পারি না। আমাদের দাবি হচ্ছে, সরকারিভাবে যদি চামরা ক্রয় করা হয় তাহলে আমরা সংগ্রহ করবো। সরকারের প্রতিনিধির কাছে আমরা বিক্রি করবো। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদেরকে বিশ্বাস করতে পারছি না।


মাদ্রাসাগুলোর এমন সিদ্ধান্তে এবার জেলায় কোরবানির চামড়া সংগ্রহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা আসে নি। তবে দ্রুত আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

 


জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকার থেকে এখন পর্যন্ত এবছর কোন নির্দেশনা আসে নি। গত বছর যে নির্দেশনা ছিল গবাদিপশুর চামড়াগুলো ১০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করার। এজন্য সরকার প্রতিটি চামড়ার জন্য আট কেজি লবণ সরবরাহ করেছিল। এবছরও আশা রাখি এ ধরনের একটি নির্দেশনা আসবে। আমরা গতবছরও বিভিন্ন মাদ্রাসা, এতিমখানার মাধ্যমে চামড়াগুলো সংরক্ষণ করেছি। এর পরবর্তীতে এ চামড়াগুলো বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা ক্রয় করে এখান থেকে নিয়েছিল। 

 


এবার মাদ্রাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ করবে না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা আগামী সপ্তাহে তাদেরকে নিয়ে মিটিংয়ে বসব, কি করা যায় সেটি নীতি নির্ধারণের বিষয়। আমরা আলাপ-আলোচনা সাপেক্ষে কেন তারা সংগ্রহ করবে না সে কারণ উল্লেখ করে ব্যবস্থা নেব। চামড়ার কোনো নির্দিষ্ট মূল্য এখন পর্যন্ত আসেনি, তবে গত বছর যে মূল্য নির্ধারণ ছিল আশা করছি এ বছর গত বছরের থেকে একটু বেশি দেবে।
তিনি বলেন, চামড়া প্রসেস করতে শ্রম যায়, সংগ্রহ করার সময় খরচের বিষয়ও আছে- এজন্য হয়তো তারা কথাগুলো বলছেন। এ ব্যাপারে প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট সুনজর থাকবে। এই বিষয়ে ইতোপূর্বে মিটিংয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। এটি আমাদের জাতীয় সম্পদ এই সম্পদকে কিভাবে রক্ষা করতে হবে সেই ব্যবস্থা সরকার অবশ্যই নিবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার