প্রকাশিত: ২৪ মে, ২০২৬ ২২:৫৮
শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের হাসনাবাজ গ্রামের বাসিন্দা মরহুম লাল মিয়া একসময় ছিলেন প্রবাসী। পরে থিতো হয়েছেন নিজ গ্রামে। করেছেন বিশাল সম্পদ। ঘটনা প্রবাহে একাধিক বিয়ে করতে হয়েছে তাকে। তার প্রথম স্ত্রী জামলাবাজ গ্রামের। প্রথম স্ত্রীর সাথে নানা কারণে স্ত্রীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় দ্বিতীয় বিয়ে করেন দোয়ারাবাজার উপজেলার পান্ডারগাঁও গ্রামের রুপনা বেগমকে। ২০১৩ সালের ৩০ আগস্ট রুপনা বেগমের গর্ভে লাল মিয়ার এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। নাম রাখেন মো. সাকির মিয়া। যার বর্তমান বয়স প্রায় ১৩। নোয়াখালী সপ্তগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। পারিবারিক কলহে মাত্র ৭ মাস বয়সী সাকির মিয়াকে রেখে চলে যান জন্মদাত্রী রুপনা বেগম। তখন সাকির মিয়ার লালন পালনের ভার এসে পড়ে তার চাচী ও লাল মিয়ার ভাই মালদার মিয়ার স্ত্রী ও ইকবাল হোসেনের মায়ের উপর। ২০১৫ সালে ২০ সেপ্টেম্বর শাল্লা থানাধীন সরমা গ্রামের মোছা. আনুফা বেগমকে তৃতীয় বিয়ে করেন লাল মিয়া। তখন থেকেই সাকিরকে দেখাশোনার দায়িত্ব পান আনুফা। নিজ মা থেকেও যে সাকির বার বার হাত বদল হচ্ছে সেই সাকির মিয়াকে নিয়েই চাচা, চাচাতো ভাই ও সৎমা আনুফা বেগমের মাঝে এখন রীতিমতো কাড়াকাড়ি। ঘটনাটি গড়িয়েছে থানা পুলিশ, ইউএনও ও আদালত পর্যন্ত। বিভিন্ন জায়গায় মো. আনুফা বেগমের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ দায়ের করেছেন মালদার আলীর ছেলে ইকবাল হোসেন। অভিযোগে স্বাক্ষী হিসেবে আছেন ইকবাল ও সাকিরের চাচা মো. রফিক মিয়া। উপরে উল্লেখিত ঘটনা এই অভিযোগ থেকেই নেওয়া। যদিও এসব অভিযোগকে নিছক হয়রানির জন্য করা বলে মনে করছেন অভিযুক্ত আনুফা।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আদালতে করা অভিযোগে ইকবাল হোসেন বলেছেন, আমার চাচা লাল মিয়ার মৃত্যুর পর চাচী আনুফা বেগম পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কথা না মেনে মন ইচ্ছা মতো যত্রতত্র চলাফেরা শুরু করেন। সাথে রাখেন চাচার ছেলে মো. সাকির মিয়াকে। যাকে তিনি গর্ভে ধারণ করেননি। অথচ সাকির মিয়া তার কাছে থাকার সুবাদে সাকিরের জন্মনিবন্ধন তৈরির সময় গর্ভধারীনী মা রুপনা বেগম না লিখে মায়ের জায়গায় আনুফা বেগম নাম লিখান। মূলত: সাকিরের মা পরিবর্তন করে আনুফা বেগম একটি গর্হিত উদ্দেশ্য আদায়ের জন্য জালিয়াতি করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন ইকবাল হোসেন।
আনুফা বেগম কেনো এমনটি করছেন জানতে চাইলে ইকবাল হোসেন বলেন, আমার মরহুম চাচা লাল মিয়ার বিশাল সম্পত্তি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জালজালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছেন আনুফা বেগম। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, চাচাতো ভাই সাকির এখনো অপ্রাপ্ত বয়স্ক। মাত্র ১৩ বছরের শিশু। সে বড় হোক, তার বাবার সকল সম্পত্তি বুঝে নিক, তারপর সে তার মতো বিক্রি করুক আর যাই করুক আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু এখনই তার সৎ মা তাকে দিয়ে সে সম্পত্তি বিক্রির পাঁয়তারা করছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, ওয়ারিশাস সনদ নেওয়ার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে বেশ কয়েকদিন ঘুরেছেন। যেহেতু ছেলেটি তার নয়, তাই আনুফা বেগম মা হয়ে কোনো উত্তরাধিকার সদন পরিষদ তাকে দেননি। এই সনদ পেলেই সম্পত্তি বিক্রি শুরু করবেন তিনি। ইকবালের দাবি, আনুফা বেগম আমার চাচী। মরহুম লাল মিয়ার বৈধ স্ত্রী। তিনি নি:সন্তান। সাকিরকে নিয়ে তিনি বাড়িতে না থেকে বাইরে বাইরে থাকেন কেনো? তিনি নিজ বাড়িতে থাকলে আমাদের আর কোনো অভিযোগ নেই। চাচার মৃত্যুর ব্যাপারেও প্রশ্ন তুলেন ইকবাল। তিনি বলেন, আমার চাচা মারা যাওয়ার মতো কোনো চিহ্ন ছিলো না। কীভাবে মারা গেলেন তা খতিয়ে দেখতে আমরা আবেদন করবো। প্রায় একই বক্তব্য মৃত লাল মিয়ার ভাই রফিক মিয়ারও।
আনুফা বেগম বলেন, আমার স্বামী একটি জমি বিক্রি করে গিয়েছিলেন। রেজিস্ট্রি দিয়ে যেতে পারেন নি। সেই জমি রেজিস্ট্রির জন্য উত্তরাধিকার সনদ লাগে। এজন্যই আমরা আনতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বার সাহেব দেননি। সমস্যা আছে বলেছেন।
বাড়িতে থাকতে অসুবিধা কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার স্বামী জীবিত থাকাবস্থায়ই রফিক মিয়া, ইকবাল হোসেনদের যন্ত্রণায় বাড়িতে থাকতে পারেননি। বাসা ভাড়া করে শান্তিগঞ্জে থেকেছি। প্রায় সাত বছর তিনি আমাদের প্রবাসেও রেখেছেন। নিরাপত্তা ছিলো না লোকটার। অনেকবার তারা হুমকি ধামকি দিয়েছে। তাদের কারণে চিন্তা করতে করতে আমার স্বামী স্ট্রোক করেছেন। এদের মাঝে আমি আমার সন্তানলে নিয়ে কীভাবে থাকবো। তারা তো আমাকে ও আমার সন্তানকে মেরেই ফেলবে। আমাকে তার ভালো চোখে দেখে না।
সন্তানের বিষয়ে তিনি বলেন, ছেলে আমার না, অন্য জনের। কিন্ত আমি দুধের শিশু থেকে লালন পালন করেছি। দুনিয়াতে এই ছেলে ছাড়া আমার আর কিছু নাই। ছেলেকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না। সেও আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। সে নিজেই বিশ^াস করে না যে, আমি তার মা না, তার আরেক মা আছে সেটা সে মানতে চায় না। এরা সম্পত্তির লোভে যে কোনো কিছু করে বসতে পারে।
জয়কলস ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা প্যানেল চেয়ারম্যান ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডে সদস্য মো. সবুজ মিয়া বলেন, আনুফা বেগম তাকে মা বানিয়ে জন্ম নিবন্ধন করেছেন ঠিক, কিন্তু যখন ওয়ারিশান সনদ নিতে আসেন তখন আমরা বিষয়টি তৎকালীন ইউএনও সুকান্ত সাহা স্যারকে অবগত করি। পরবর্তীতে আর ওয়ারিশান সনদ দেওয়া হয়নি। মহিলার বিয়ে হয়েছে ছেলে জন্মের ২/৩ বছর পর।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, শান্তিগঞ্জ থানার এসআই ইসমাইল বলেছেন, দু’দিন হলো তিনি দিরাই থানায় বদলি হয়ে চলে গিয়েছেন। মামলাটি হস্তান্তর করে গিয়েছেন। মামলা তদন্তাধীন। তদন্ত অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে কথা বলতে শান্তিগঞ্জের বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহানের সরকারি ফোন নাম্বারে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেন নি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন