প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২৬ ২২:০১
বর্ষা এলেই ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের ইব্রাহিম চেয়ারম্যানের আলংয়ে হাতুড়ির শব্দ, করাতের ঘর্ষণ আর কাঠের গন্ধে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। একের পর এক কাঠের নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন কারিগররা। সেই ব্যস্ততার মাঝেই নীরবে নিজের জীবিকার গল্প লিখে চলেছেন দোয়ারাবাজার উপজেলার সোনাপুর গ্রামের কারিগর প্রদীপ দাস। দোয়ারাবাজার উপজেলার পান্ডারগাঁও ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা প্রদীপ দাস। বাবা মৃত প্রভাত দাস। পাঁচ সদস্যের পরিবার মা, স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনিই। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকায় ছোটবেলা থেকেই জীবিকার সন্ধানে কাজে নামতে হয় তাকে। পাশের গ্রামের মঙ্গলপুরের অভিজ্ঞ নৌকা কারিগর নরেশ সূত্রধরের কাছে থেকে শিখেছেন কাঠের নৌকা তৈরির কাজ। সেই শেখা দক্ষতাকেই এখন জীবিকার একমাত্র ভরসা বানিয়েছেন। গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইব্রাহিম চেয়ারম্যানের আলংয়ে কাঠের নৌকা তৈরির কাজ করেন তিনি। তবে এই কাজ থাকে মাত্র চার থেকে পাঁচ মাস। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টানা ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হয়। কাঠ কাটা, তক্তা মাপ নেওয়া, আগুনে সেঁকে কাঠ বাঁকানো, পেরেক লাগানো, আলকাতরা দেওয়া একটি নৌকা তৈরির প্রতিটি ধাপেই থাকে তার শ্রম আর ঘাম। প্রদীপ দাস বলেন, নৌকা বানানোর কাজটা খুব কষ্টের। সারাদিন ভারী কাঠ নিয়ে কাজ করতে হয়। আমার অনেক দিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ (হাই—প্রেশার) রয়েছে। তারপরও সংসারের কথা ভেবে কাজ বন্ধ করতে পারি না। কাজ না করলে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়া সম্ভব নয়।
তিনি জানান, নৌকা তৈরির মৌসুমে আয় কিছুটা ভালো হলেও বছরের বাকি সাত—আট মাস তাকে গ্রামের আশপাশে দিনমজুরের কাজ করতে হয়। কোনো দিন কাজ থাকে, কোনো দিন থাকে না। অনিশ্চিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে প্রায়ই হিমশিম খেতে হয়। প্রদীপের ভাষায়, নৌকার কাজ যে কয় মাস থাকে, তখন কোনো রকমে সংসার ভালো চলে। কিন্তু মৌসুম শেষ হয়ে গেলে আবার দিনমজুরি করতে হয়। সব সময় কাজও পাওয়া যায় না। ছেলে—মেয়ের পড়ালেখা, সংসারের খরচ, মায়ের ওষুধ সব মিলিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটে।
প্রদীপ দাসের সহকর্মী বিমল দাস, অমল দাস, বিপুল দাস জানান, প্রদীপের মতো অনেক দক্ষ কারিগরই বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় নৌকা তৈরির কাজ করেন। কিন্তু কাঠের নৌকার চাহিদা কমে যাওয়ায় আগের মতো সারা বছর কাজের সুযোগ নেই। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের অনেকেই পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় নৌকা নির্মাতা মাওলানা মো. জয়নাল আবেদীন ফারুক বলেন, একসময় বর্ষা মৌসুমে শতাধিক কারিগরের কর্মসংস্থান হলেও এখন সেই সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। ফাইবার ও ইঞ্জিনচালিত নৌকার ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি কাঠের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকা শিল্প ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রদীপ দাসের মতো হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবনে। কাঠের নৌকার গায়ে হাতুড়ির প্রতিটি আঘাতে যেমন তৈরি হয় একটি নতুন নৌকা, তেমনি প্রদীপ দাসের প্রতিটি ঘামের ফোঁটায় টিকে থাকে তার পাঁচ সদস্যের একটি পরিবার। কিন্তু বর্ষা শেষ হলেই থেমে যায় সেই বৈঠা, আর শুরু হয় অনিশ্চয়তার সঙ্গে নতুন লড়াই।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন