প্রকাশিত: ২৫ মে, ২০২৬ ২৩:২২
মাও. মুশতাক হত্যাকাণ্ড
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (ক্বাসেমি অংশ) কেন্দ্রিয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সহ-সভাপতি মাও. মুশতাক আহমদ গাজীনগরী ছিলেন নির্লিপ্ত, প্রচার বিমুখ ও সংগঠনের জন্য নিবেদিত প্রাণ। প্রথমে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ ও পরে ভাসমান অবস্থায় তাঁর লাশ পাওয়ার ঘটনাকে কেউই স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেন নি। নেওয়ার কথাও নয়। তাই জোরালো দাবি উঠে প্রকৃত দোষীদের খোঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার। এসময় রাস্তা বন্ধ করে গড়ে তোলা হয় আন্দোলন। তুমুল আন্দোলন থামে প্রাথমিকভাবে সন্দেহ হওয়া জমিয়তের মুফতি ওয়াক্কাস অংশের নেতা শান্তিগঞ্জ উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল হাফিজকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে। গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর সোমবার সিলেট নগরী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই দিন বিকালে আদালতে সোপর্দ করার সময় জমিয়তের ক্বাসেমী গ্রুপের জামালগঞ্জ, শান্তিগঞ্জ ও সদর উপজেলার ক্ষিপ্ত নেতাকর্মীরা ওয়াক্কাস অংশের অন্যান্য নেতাকর্মীকে উদ্দেশ্য করে শ্লোগান দেন, দাবি করেন আবদুল হাফিজ এই ঘটনার সাথে জড়িত। অনেকে কিছুটা কৌশলী হয়ে মুশতাক গাজীনগরীর খুনিদের খোঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন। তখন উত্তপ্ত হয় আদালত প্রাঙ্গণ, ডিম ছোড়া হয় গ্রেফতার হওয়া আবদুল হাফিজকে লক্ষ করে। সামাজিল যোগাযোগ মাধ্যমে ডিম ছোড়ার বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এসময় আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক ও শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাও. তৈয়্যিবুর রহমান চৌধুরীসহ জমিয়তের আরও জ্যেষ্ঠ নেতারা। তারা তখন মাও. মুশতাক গাজীনগরীর প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
আবদুল হাফিজ গ্রেপ্তারের পর থেকে বিষয়টি নিয়ে নানা ধরণের গুঞ্জন উঠতে থাকে জেলা জমিয়তের উভয় মহলে। আবদুল হাফিজের পক্ষ থেকে তাকে নির্দোষ ও ষড়যন্ত্রের শিকার দাবি করে একাধিকবার বক্তব্য ও ফেসবুকে পোস্ট করেছেন কেন্দ্রিয় জমিয়তের তৎকালীন প্রচার সম্পাদক সৈয়দ তালহা আলমসহ তার গ্রুপের দলীয় সহকর্মীগণ। অপরদিকে, জেলা জমিয়তের ক্বাসেমী অংশের কর্মী ও সমর্থকেরাও আবদুল হাফিজকে সন্দেহজনক আসামী বলে দাবি করেন। বিচার বা ফাঁসি চেয়ে অনেকে ফেসবুকে পোস্টও করেছেন। যার কিছু স্ক্রিনশট এই প্রতিবেদকের হাতে আছে।
এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তারকৃত একমাত্র আসামী আবদুল হাফিজ কারাবন্দি থাকায় বিষয়টি কিছুটা আলোচনার বাইরে চলে গিয়েছিলো। শনিবার জামিনে মুক্তিপান তিনি। মুক্তি পেয়েই কারা ফটকে নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে গণমাধ্যমে তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তিনি। প্রতিক্রিয়ায় মাও. তৈয়্যিবুর রহমানের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন আবদুল হাফিজ। প্রতিক্রিয়া জানাতে সোমবার এ নিয়ে সুনামগঞ্জে সংবাদ সম্মেলনে বসেন ক্বাসেমী গ্রুপের জ্যেষ্ঠ নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে জমিয়তের জ্যেষ্ঠ নেতারা দাবি করেন, আবদুল হাফিজ জেল থেকে বের হয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত। মূলত: মামলাকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতেই এমন বক্তব্য দিয়েছেন আবদুল হাফিজ। তিনি বাইরে থাকলে মামলাকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতে পারেন বলেও দাবি করেন এরা। অপরদিকে, তৈয়্যিবুর রহমান চৌধুরীকে জড়িয়ে আবদুল হাফিজ যে বক্তব্য দিয়েছেন তার প্রতিবাদ করেন তারা।
শনিবার কারামুক্তির পর আবদুল হাফিজ তার প্রতিক্রিয়ায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং তৈয়্যিবুর রহমানকে জড়িয়ে বক্তব্য প্রদান করেন।
সুনামগঞ্জ জেলা জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক ও শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাও. তৈয়্যিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, আবদুল হাফিজের সাথে আমার কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নেই। তিনি আমাকে জড়িয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত। মামলাকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতে চেষ্টা করছেন। আমি তাকে কোথাও খুনি বলিনি। মুশতাক গাজীনগরী আমাদের প্রাণের মানুষ ছিলেন। তিনি দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ নেতা ছিলেন। তার মৃত্যুতে আমরা ব্যথিত। আগেও বলেছি, এখনো বলছি মুশতাক গাজীনগরীর খুনি যেই হোক তার সর্বোচ্চ বিচার চাই।
এদিকে, উভয়পক্ষের এমন বক্তব্যে বিভ্রান্ত হচ্ছেন মুশতাক গাজীনগরী হত্যাকাণ্ডে প্রকৃত খুঁনিদের বিচার চাওয়া ব্যক্তিরা। কে খুন করলেন একজন আলেমকে? কেনই বা খুন করতে হলো তাঁকে? এই মামলার আসল রহস্য কী? আবদুল হাফিজ নির্দোষ হলে তাহলে দোষী কে অথবা আবদুল হাফিজকেই কেনো আসামী করে মামলা করা হলো? মামলাটিই বা এখন কোন পর্যায়ে আছে? এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর জানেন না সাধারণ মানুষ। কে দেবে এসব প্রশ্নের জবাব?
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার (মিডিয়া) বললেন, মামলা প্রভাবিত করার কোনো সুযোগ নেই। একজন জামিন পেতেই পারেন, তবে মামলা তার গতিতেই চলবে। তদন্ত কাজ চলমান। এখনই সুনির্দিষ্ট করে বলা যাবে না কবে তদন্ত শেষ হতে পারে। সকল ডকুমেন্টস প্রস্তুত হলেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন