প্রকাশিত: ০২ জুন, ২০২৬ ২৩:০৭
শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের পিঠাপশী, ঘোড়াডুম্বুর ও নাজিমপুর। ছাতক উপজেলার জালিয়া, ছাতারপাই, গণিপুর ও খাড়াই। গ্রামগুলোর মধ্যে শান্তিগঞ্জ উপজেলার তিন গ্রামের প্রায় সকল মানুষ ঘোড়াডুম্বুর ভায়া পিঠাপশী সড়ক হয়ে চলাচল করেন। ৭ গ্রামের প্রায় ২০ হাজার বাসিন্দার যাতায়াতের প্রধান সড়ক এই ৫ কিলোমিটারের পথ।
পুরো পথের প্রায় অর্ধকিলোমিটার ছাতক উপজেলায় হলেও বাকী সাড়ে ৪ কিলোমিটার রাস্তা পড়েছে শান্তিগঞ্জ উপজেলায়। অর্থাৎ খাড়াই পয়েন্ট বা বাজার ব্রিজ থেকে দক্ষিণের পুরো পথই শান্তিগঞ্জ উপজেলার এবং দুর্ভোগটিও ব্রিজের এই অংশ থেকে শুরু। রাস্তাটি এখন বলতে গেলে পুরোপুরি যান চলাচলের অনুপযোগী; মেঠোপথের মতো। বহুল ব্যবহৃত এই সড়কটির দুই জায়গায় বৈদ্যুতিক খুঁটি বোকা নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায়। যদি অন্তত একটি খুঁটিও পড়ে যায় তাহলে ঘটতে পারে হতাহতের ঘটনা, বিদ্যুতহীন হবে পুরো এলাকা, সৃষ্টি হবে নতুন দুর্ভোগের। তাই নদী ভাঙন রোধ, রাস্তা সংস্কার ও পাকা করা এলাকাবাসীর সাথে সাথে এখন সময়েরও দাবি।
.jpg)
সোমবার বিকালে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের যাত্রী ছাউনী থেকে ঘোড়াডুম্বুর সড়কে খাড়াই বাজার বা পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার আরসিসি ঢালাইয়ের সুন্দর সড়ক পথ। এই পথটুকু ছাতক উপজেলা অংশের। সড়কের এই অংশ দেখলে গ্রামের ভিতর দিয়ে এতো সুন্দর রাস্তা গিয়েছে ভেবে যে কারো মনে আনন্দ লাগতে পারে। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না। খাড়াই পয়েন্ট পাড় হলেই বোকা নদীর উপর সেতু, আর এই সেতু থেকেই দুর্ভোগ শুরু। পুরো পথে কোথাও নেই পাকা সড়ক। খুঁড়াখুড়ি করে রাখা হয়েছে ২০২৩ সাল থেকে। আছে ছোটবড় অগণিত গর্ত। গ্রামের ভিতরে যাওয়ার পথে সেতুতে উঠে ডান দিকে তাকালে জোড়া বৈদ্যুতিক খুঁটি চোখে পড়ে। খুঁটিগুলো বিপজ্জনক অবস্থায় আছে। যে কোনো মুহুর্তে নদী ভাঙনের কবলে পড়তে পারে। আরেকটু এগুলেই মিলের মোড়। এখানে একটি খুঁটি বেঁকে আছে ঘরের চালের উপর পড়বে বলে। বাঁশের আড় দিয়ে বোকা নদীর ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন স্থানীয়রা। ভাঙন এসে সড়কে ছুঁইয়েছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে যে কোনো সময় রাস্তাকেই টান দিবে নদীর ভিতরে। রাস্তায় গর্ত থাকায় সিএনজি, লেগুনা, টমটম ও পিকআপ চালকেরা বেশ বেগ পোহাতে হয়। সামান্য বৃষ্টি হলে গর্তগুলো ছোট ছোট পুকুরে রূপ নেয়। অনেক সময় ঠেলে তুলতে হয় গাড়িগুলোকে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এই পথ দিয়ে যানবাহন চলাফেরা করা একেবারেই দুঃসাধ্য। না পেরে চলাচল করতে হচ্ছে তাদের। ভাড়াও বেশি। টমটম, লেগুনা ও সিএনজিতে উঠলে ঝাঁকুনিতে জীবনের অর্ধেক আয়ু কমে যায়। রোগী নিয়ে একটি গাড়িও ঠিকঠাক মতো চলতে পারে না। কোনো রোগীকে নিয়ে এমন ভাঙাচোরা সড়কে চলতে গেলে সুস্থ মানুষই রোগী হয়ে উঠেন, রোগীর অবস্থা তো আরো খারাপ। রাস্তার যখন আরো খারাপ অবস্থা ছিলো তখন ঝাঁকুনিতে একটি ডেলিভারিও গাড়িতে হয়েছিলো বলে লোকমুখে শোনা যায়।
এলাকাবাসী জানান, এই এলাকায় গণিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, জালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, ঘোড়াডুম্বুর ও পিঠাপশী হাফিজিয়া মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক, প্রায় প্রতি গ্রামে একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আছে। হাজারো শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, রোগী, বয়োবৃদ্ধ মানুষ সহ নারীদের চলাফেরায় সড়কটি এখন গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সালের শেষের দিকে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে রাস্তার মেরামত ও প্রশস্তকরণের কাজ পায় সিলেটের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টাওয়ার এন্টারপ্রাইজ। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের পর আর কাজে আসেনি প্রতিষ্ঠানটি। এরপর থেকে ২ বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে রাস্তা মেরামত ও প্রশস্তকরণের কাজ। সেই থেকে এখনো পর্যন্ত দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না বৃহত্তর পিঠাপশী ও ঘোড়াডুম্বুর এলাকার মানুষের।
পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের প্রাক্তন সদস্য ও শান্তিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক আবদাল হোসেন, গ্রামের মুরব্বি আশিক মিয়া, সিরাজ মিয়া, গৌছ আলী ও মাও. মো. ওলিউজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের গ্রামের এই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে ফেলে গিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রায় ৩ বছর হতে চলল। এখন নতুন করে সমস্যা দাঁিড়য়েছে নদী ভাঙন। বোকা নদী ভেঙে রাস্তায় ভাঙন শুরু হয়েছে। বৈদ্যুতিক খুঁটিও বেঁকে বসেছে। তাই আমরা মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব মো. কয়ছর আহমদের কাছে আমাদের গ্রামের এই সড়ক পথটি দ্রুত সংস্কার করে দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি। এই পথ ঠিক না হলে এখানকার প্রায় ২০ হাজার সাধারণ মানুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, ছাত্রছাত্রীর সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে রোগীদের সমস্যা হচ্ছে বেশি। রাস্তা ভাঙা ও গর্ত থাকায় গাড়িতে করেও যাওয়া যাচ্ছে না। স্বপন মিয়া বলেন, বোকা নদী ভাঙতে ভাঙতে রাস্তায় এসে লেগেছে। আমরা রাস্তার সাথে নদী ভাঙন রোদেও কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।
কাজ ফেলে যাওয়ার বিষয়ে জানতে টাওয়ার এন্টারপ্রাইজের পরিচালক সুব্রত দে বলেন, আমরা কাজ ফেলে যাই নি। আমরা তো কাজ করতে চাই। এলাকায় একটা না একটা সমস্যা লেগেই থাকে। কখনো ধান তোলা, কখনো পানির সমস্যা। আমরা কাজ করতে আগ্রহী। এ নিয়ে সুনামগঞ্জ এলজিইডির এক্সিয়েন সাহেবের সাথে কথা হয়েছে। অচিরেই আমরা কাজ শুরু করবো। আমাদের অনেক মালামাল স্থানীয় এক লন্ডনীর বাড়িতে রাখা আছে।
কবে নাগাদ কাজ শেষ করা যাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারলে ১৫/২০ দিনের মধ্যে রাস্তা ঢালাইয়ের কাজ শেষ করে ফেলতে পারবো। খুব বেশি কাজ আর বাকী নেই। তিনি জানান, তাদের কাজের আদেশ অনুযায়ী দুই কিলোমিটারের কিছু বেশি রাস্তার কাজ করবেন তারা।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী সাজেদুল আলম বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে আমাদের কথা হয়েছে। তারা অচিরেই কাজে যোগদান করবেন এবং তারা তাদের ওয়ার্ক ওয়ার্ডার অনুযায়ী সব কাজ করে দেবেন। আশা করছি, এই সড়কের কাজ দ্রুত শেষ হবে।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ বলেন, আমি রাস্তাটি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিচ্ছি। কোন কন্ডিশনে আছে তা জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো। আমি কাজ করতে চাই। আমাকে সবাই সহযোগিতা করলে সুনামগঞ্জ-৩ আসনের শান্তিগঞ্জ ও জগন্নাথপুকে অনেক উন্নয়ন উপহার দিতে পারবো, ইনশাল্লাহ।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন