প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২৬ ২১:৫৬
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের খবর জানাতে সংবাদ সম্মেলনে এসে তাঁকে নিয়ে নিজের একটি মূল্যায়ন তুলে ধরলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়া হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, তিনি (মো. সাহাবুদ্দিন) মাফিয়া সরকারের আমলে নির্বাচিত হলেও বর্তমানে জনগণের ভোটে যে সরকার নির্বাচিত হয়েছে, তার প্রতি তিনি সমর্থন এবং শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন সব সময়। আমি তাঁর মঙ্গল কামনা করি।’
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার দুপুরে দেশে ফেরার পর বিকেল সাড়ে পাঁচটায় সংসদ ভবনে সংবাদ সম্মেলনে আসেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিকেলে তাঁর কাছে পদত্যাগপত্রটি এসেছে। সংবিধান অনুযায়ী এখন তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের মনোনীত প্রার্থী হয়ে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালে ছাত্র—জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসন অবসানের পর রাষ্ট্রপতি অপসারণের দাবি উঠলেও তিনি টিকেছিলেন। এরপর নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর তিনি পদত্যাগ করলেন; যদিও তাঁর মেয়াদের প্রায় পৌনে দুই বছর বাকি ছিল।
পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি অসুস্থতাকে কারণ দেখিয়েছেন জানিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র বিকেল ৫টা ১ মিনিটে স্পিকারের কাছে দাখিল করেন। রাষ্ট্রপতি লিখিতভাবে তাঁর পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর পক্ষে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হচ্ছে না।
পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি অসুস্থতার যে কারণগুলো দেখিয়েছেন, তা তুলে ধরে স্পিকার বলেন, রাষ্ট্রপতি হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি—সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছেন। এর আগে তাঁর হৃদ্যন্ত্রে বাইপাস সার্জারি করা হয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তাঁর শরীরে ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’ রোগ শনাক্ত হয়েছে। এ রোগের কারণে তিনি মাঝেমধ্যে অচেতন হয়ে পড়েন।
স্পিকার বলেন, বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব এবং শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে তা জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের নথিতে সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান স্পিকার।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণের কথা জানিয়ে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।’
এ প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে শপথ গ্রহণের সময়ই তিনি প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের শপথও নিয়েছিলেন। একইভাবে স্পিকারের পদ শূন্য হলে ডেপুটি স্পিকার দায়িত্ব পালন করবেন বলেও সাংবিধানিক বিধান রয়েছে।
খুব সংক্ষেপেই এই সংবাদ সম্মেলন সারেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সাংবাদিকদের অনেক প্রশ্ন থাকলেও তিনি মাত্র দুটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে কর্মসূচির ইতি টানেন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে নানা ধরনের গুজবের বিষয়ের এক প্রশ্নে স্পিকার বলেন, ‘আজ বাংলাদেশের নানা ধরনের কথাবার্তা আমি দুপুরে এসেই শুনছি। দেখা গেল যে, এটি প্রকৃত তিনি শারীরিক অসমর্থের কারণে পরিত্যাগ করেছেন। আমি তাঁর মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি।’
এই প্রশ্নের উত্তরেই মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে নিজের সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন তুলে ধরেন হাফিজ উদ্দিন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকেই স্পিকার হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন তিনি।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ একটি গুরুতর ঘটনা। এর সঙ্গে দেশের ভালো—মন্দও জড়িত। রাষ্ট্রপতি একজন মানুষ, তিনি অসুস্থ হতেই পারেন এবং তিনি রোগেরও নাম প্রকাশ করেছেন। লিখিতভাবে জানিয়েছেন, তিনি কী কী রোগে ভুগছেন এবং মাঝেমধ্যে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। এ জন্য ডাক্তারের সার্টিফিকেটের কোনো প্রয়োজন নেই। যিনি যেখানে নিজেই এটি দাবি করেছেন।’
রাষ্ট্রপতির এই পদত্যাগ নিয়ে কোনো ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা আশা করি, এই পদত্যাগের ফলে সব ধোঁয়াশা পরিষ্কার হলো। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা কোনো ধরনের বিরূপ মনোভাব কিংবা কনফিউশন যাতে এসব ব্যাপারে না ঘটে ...আগেও রাষ্ট্রপতিরা পদত্যাগ করেছেন বিভিন্ন কারণে। রাষ্ট্রপতি দেশের একজন সম্মানিত মাননীয় রাষ্ট্রপতি, তিনি পদত্যাগ করতেই পারেন এবং এই চেয়ার কখনো শূন্য থাকে না এবং আমি জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে এই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছি। এটি হলো বাস্তবতা। আশা করি, সব ধরনের কনফিউশন এখন থেকে দূর হয়ে যাবে।’ (সূত্র : প্রথমআলো)
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর ভোলার লালমোহনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মরহুম ডা. আজহার উদ্দিন আহমদ পাকিস্তান জাতীয় সংসদের সাবেক সদস্য এবং মা মরহুমা করিমুন নেছা বেগম গৃহিণী ছিলেন। গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার পদে নির্বাচিত হন হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম । সংসদের প্রথম অধিবেশনে কন্ঠভোটের মাধ্যমে তাকে স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
স্পিকার নির্বাচিত (জীবনবৃত্তান্ত ও কর্মজীবন)
তথ্য অনুযায়ী, হাফিজ উদ্দিন আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ১ ডিসেম্বর ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন এবং ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য তিনি বীরত্বসূচক রাষ্ট্রীয় খেতাব বীর বিক্রম লাভ করেন। ৩১ জুলাই ১৯৭১, তিনি ১মে ইস্ট বেঙ্গলের কামালপুর বিওপি আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে আহত হন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ যশোর ক্যান্টনমেন্টে ১মে ইস্ট বেঙ্গলের তরুণ অফিসার হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং আট ঘণ্টাব্যাপী সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, একপর্যায়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দুই শ সৈনিকসহ ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসেন। তিনি যশোর—খুলনা অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করেন এবং এপ্রিল ও মে মাসে বেনাপোল অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। একমাত্র অফিসার হওয়ার সুবাদে তিনি এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত ১মে ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন। মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে ১মে ইস্ট বেঙ্গল সিলেট শহর দখল করে। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ১০ ঘণ্টা যুদ্ধের পর এমসি কলেজের রণাঙ্গনে ক্যাপ্টেন হাফিজের নেতৃত্বাধীন ‘বি’ কোম্পানি পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে।
রাজনৈতিক জীবন: হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ভোলা—৩ (লালমোহন ও তজুমুদ্দিন) আসন থেকে সাতবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন (৩য়, ৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম, ৮ম ও ১২তম সংসদ)। ১৯৯১ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হন এবং ১৯৯২ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বিএনপির মন্ত্রিসভায় ১৯৯৬ সালে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী এবং ২০০১ সালে পানিসম্পদ, বাণিজ্য ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
খেলাধুলা জীবন: হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম নামকরা ফুটবলার ছিলেন। ১৯৬৭—১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় দলের সদস্য হয়ে ইরান, তুরস্ক ও বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) সফর করেন। ১৯৭০ সালে তেহরানে অনুষ্ঠিত আরসিডি প্রতিযোগিতায় তিনি জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন। ২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা তাঁকে বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের সেরা ফুটবলার হিসেবে সেন্টেনারি অর্ডার অব মেরিট সম্মাননা দেয়। তিনি জনপ্রিয় দল ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের সদস্য হিসেবে ১২ বছর বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৬ সালে দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৬৪—৬৬ সালে প্রাদেশিক প্রতিযোগিতায় ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ে পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানবের পদক লাভ করেন।
পারিবারিক জীবন: হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের স্ত্রী সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার মাটিয়াপুর গ্রামের মরহুম আবুল হোসেনের কন্যা প্রয়াত দিলারা হাফিজ শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন এবং ইডেন মহিলা কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা দফতরের মহাপরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁদের পরিবারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে আছেন। তাঁরা হলেন শাহরুখ হাফিজ, শামাখা শাহরীন হাফিজ ও তাহারাত হাফিজ। প্রসঙ্গত, গত ২৮ মার্চ দিলারা হাফিজ মারা যান।
জাতীয় থেকে আরো পড়ুন