প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬ ১৯:০০
সংগৃহীত ছবি
সাধারণ মানুষ তাদের আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই খাবারের পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর পেছনে শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘দ্য ফুড প্রাইস চেইন: মার্কেটস, মার্জিনস অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সিপিডির গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। সেমিনারে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার মন্ডলসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সিপিডি বলেছে, খাদ্যের দামের সামান্য বৃদ্ধি সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার মানে প্রভাব ফেলে। দেশের ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের উপার্জনের অন্তত অর্ধেক খাবার কেনার পেছনে ব্যয় করে। নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এ ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে প্রকৃত আয় কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদায় ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই।
গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে মূল্যবৃদ্ধি শুধু উৎপাদন ব্যয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর পেছনে শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু সিন্ডিকেটের ভূমিকা রয়েছে। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খলে কমিশন এজেন্ট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়া প্রভাব বিদ্যমান। স্থানীয় ব্যবসায়ী থেকে বড় আমদানিকারকদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার কারণে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং দাম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়।
সেমিনারে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। এর মধ্যে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, খাদ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন, বিপণন, বাজারজাতকরণ, দুর্যোগজনিত উৎপাদন ক্ষতি, বাজারের অদক্ষতা, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি ও প্রতিযোগিতার মতো নানা বিষয় কাজ করে। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলে ফড়িয়া, ব্যাপারীসহ বিভিন্ন স্তরের অংশগ্রহণকারীর কারণে প্রতিটি ধাপে মূল্য পরিবর্তিত হয়।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীর বলেন, দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির পেছনে শুধু উৎপাদন ব্যয় নয়, বাজার কাঠামো, মধ্যস্বত্বভোগী, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি এবং বাজারে আধিপত্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে।
তার ভাষ্য, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাধারণ মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় কিছুটা কমলেও বর্তমানে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী। খাদ্য মূল্যসূচক বা সিপিআইয়ের ৫৯ শতাংশই খাদ্যপণ্য। সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ব্যয়ের ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ খাদ্যে ব্যয় করে, যেখানে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ায় অনেক মানুষকে সঞ্চয় ভাঙতে বা ঋণ নিতে হচ্ছে, যা দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বেতন বাড়লেও ভোক্তারা তার সুফল পাচ্ছেন না। একই অর্থে আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে পারছেন এবং জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে।
বাজার ব্যবস্থার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ১০টি নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১০টির মধ্যে ৬টি পণ্যের খুচরা বিক্রেতা প্রধানত আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল, যা বাজারে একচেটিয়া প্রভাব ও মূল্য অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
চালের সরবরাহ শৃঙ্খলে উৎপাদকের পর রয়েছে ব্যাপারী, অটো রাইস মিলার, নগর আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতা। এ ক্ষেত্রে মূল্য অস্বাভাবিকতা বা শতাংশভিত্তিক ব্যবধান সবচেয়ে বেশি মিলারদের পর্যায়ে দেখা গেছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়, সরবরাহ শৃঙ্খল যত দীর্ঘ, খামার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির হারও তত বেশি। তবে মধ্যস্বত্বভোগীরাই মূল্যবৃদ্ধির একমাত্র কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রতিটি স্তর যদি দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, খামার পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির হার সবুজ মরিচে ১১৬ শতাংশ, আলুতে ৫০ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, চালে ১০০ শতাংশ, ডালে ৭৮ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ, ডিমে ২৫ শতাংশ, গরুর মাংসে ১৩ শতাংশ, রুই মাছে ১০ শতাংশ এবং মুরগিতে ২২ শতাংশ।
সূত্র: অর্থসূচক.কম
জাতীয় থেকে আরো পড়ুন