প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬ ২৩:৪৭
প্রশ্ন : ফেসবুকের রিলস ভিডিও আপ, সমালোচনার ভয়ে সরিয়ে নেওয়া অতঃপর প্রতিবাদে ইতিবাচকভাবে সমাদৃত হচ্ছেন। কী প্রতিক্রিয়া আপনার?
বিউটি রানী পাল : রিলস কিভাবে বানায় আমার জানা ছিল না। তাই রিলস কিভাবে বানায় সেটা আমার এক সহকর্মীকে বলছিলাম। উনি বলছেন স্কুল ছুটির পর আপনাকে রিলস বানিয়ে দেখাবো। উনি বলছেন আপনি হেঁটে যান একটি ভিডিও করি দেখবেন কিভাবে হয়। তো আমি নরমালি হেঁটেছি। তখন বাতাস ছিল। তখন আমার সহকর্মী বললেন একটি গান লাগিয়ে ফেসবুকে আপ দিবেন। তখন আমি আমার ব্যক্তিগত ফেসবুক একাউন্টে আপলোড দেই। ফেসবুকে আমার খুবই সীমিত ফ্রেন্ড। আমি কয়েকদিন আগে জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হই। তখন কয়েকটি পত্রিকায় এই নিউজ হয়। তখন তাদেরকে ফলো দিতে গিয়ে এড ফ্রেন্ডে চলে আসছিল। এরপর থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিনের প্রতিনিধি আসিফ ইকবাল ইরন আমাকে ফলো করছেন ফেসবুকে। এই ভিডিও আপ হওয়ার পর তিনি আমাকে কল করেন, আমি তাকে বলি এই জিনিসটাতো এমন কিছু না। আপনি এটা নিয়ে এত বেশি মাথা না ঘামালে ভালো হতো। সমাজ ও দেশের জন্য মঙ্গল হতো। উনি বলে যে আমি অপরাধ করেছি। আমি নিজেই প্রথম ভিডিওটি দেখি। ভিডিওর উপস্থাপনা দেখে আমিই আপসেট হয়ে যাই। আমার পরিবারে আরও যে ৫ জন বোন আছেন তারাও শিক্ষক। তারা দেখে আমাকে বলে তুমি কেন থানায় জিডি করো না। তুমি রাইট পয়েন্টে আছো। তুমি কোনো ভুল করো নাই। আমরা তোমাকে জানি। তারপর আমি থানায় জিডি করি।
প্রশ্ন : পাশে দাঁড়ানো মানুষজনের প্রতি কিছু বলবেন?
বিউটি : সকল শ্রেণি পেশার মানুষের পাশে থাকায় কৃতজ্ঞ। তারা আমার প্রতি যে অসীম ভালোবাসা দেখিয়েছেন তার জন্য আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো। একদুইজন নেতিবাচক মানুষ সমাজে সব সময়ই থাকে। একজন সাংবাদিকনামধারী আমাকে নেতিবাচকভাবে ভাইরাল করালেও বাকি সব সাংবাদিক ভাইয়েরা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন এই জন্য আমি কৃতজ্ঞ। সুশিল সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, আমার সকল সহকর্মীবৃন্দ, সাংবাদিকসহ সমাজের বিবেকবান সকল পেশাজীবী মানুষ এগিয়ে এসেছেন। আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাকে সাপোর্ট দিয়েছেন। সর্বশেষ আমাদের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ স্যার আমার সম্পর্কে একটি বক্তব্য দিয়েছেন এটা আমার জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
শিক্ষকতা পেশা নিয়ে কিছু বলুন—
বিউটি : শিক্ষকতা পেশায় নারী আসে সম্মানের কথা ভেবেই। কিন্তু এই পেশায় আসার পর কোনো সম্মানই দেওয়া হয় না। যেহেতু শিক্ষকরা সম্মানের জন্যই আসেন তাই আমরা সমাজের কাছ থেকে সম্মানই প্রত্যাশা করি। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখনই আমি টিউশনি করতাম। তখন দেখলাম টিউশনিতে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীদের চাহিদা বেশি। আমার মনে হয়েছে ইংরেজি বিভাগের কেউ শিক্ষক হলে সমাজ ও দেশের অনেক কল্যাণ হবে। টিউশনি করানো থেকে শিক্ষকতা পেশায় আসার আগ্রহ চলে আসে। আমি প্রথমে মাহমুদুস সামাদ ফারজানা চৌধুরী গালস স্কুল এন্ড কলেজে দুই বছরের বেশি প্রভাষক হিসেবে কাজ করেছি। তারপর আমি ভেবেছি সরকারি চাকুরি করবো, প্রধান হবো। কারণ প্রধান হলে সব কিছু নিজের মতো করে সাজানো যায়। এজন্য আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিজেকে পছন্দ করি। আজ তের বছর হয় এই পেশায়। সমাজের ভালো ভালো মানুষ যদি উচ্চশিক্ষিত হয়ে অনেক বড় বড় কর্মকর্তা হয়ে যান তাহলে আমাদের জাতীকে কে উন্নত করবে। আমাদের জাতীকে উন্নত করার জন্যতো উন্নত মানুষ লাগবে। উন্নত কারিকুলাম লাগবে। উন্নত কারিকুলামের সাথে যদি উচ্চশিক্ষিত মানুষজন শিক্ষকতায় না আসেন তাহলে কিভাবে উন্নত কারিকুলাম বাস্তবায়ন করবেন। আমাদের কারিকুলাম বলতেছে আনন্দঘন পরিবেশের মাধ্যমে শিক্ষা দান করা। শিশুরা কিন্তু একঘেয়েমি পরিবেশ নিতে পারে না। ওদেরকে একটু পরপর আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষাদান করতে হয়। আমাদের শিক্ষাদান পদ্ধতিটাও এরকম। আমাদের কারিকুলামকে উন্নত বিশ্বের অনুসারেই করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের সবার কারিকুলাম সম্পর্কে বেশি ধারণা নেই। কারিকুলাম সম্পর্কে প্রশিক্ষণ না দিলে কেউই সেটা জানবেন না। আমরা কারিকুলাম সম্পর্কে এক থেকে দেড় বছরের বিপিএড ট্রেনিং করি। এই কারিকুলাম যাতে আমরা ভুলে না যাই সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে সময়ে সময়ে সে বিষয়ে আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আমাদের প্রাইমারি স্কুলগুলো এখন অনেক উন্নত হয়েছে। কেজি স্কুল ছাড়িয়ে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের সরকারি স্কুলে ভর্তি করাচ্ছেন।
প্রশ্ন : পেশার ভবিষ্যৎ কী?
বিউটি : এই পেশা আমার আদর্শ। আমি মন থেকে এই পেশা গ্রহণ করেছি। তাই ভবিষ্যতে আমি শিক্ষকতা পেশাতেই থাকতে চাই। তবে বিদ্যালয় নিয়ে আমার স্বপ্ন হচ্ছে আমি বিদ্যালয়ে একটি বড় লাইব্রেরি করবো। যেখানে অনেক বই থাকবে। এই লাইব্রেরিতে বই পড়ে যেন ছাত্র ছাত্রীরা জানতে পারে কোন লেখক কোন বই লিখেছেন, কোন কবিতা লিখেছেন। লাইব্রেরি হচ্ছে জ্ঞানের উৎস। আমাদের এসব করার কোনো উৎস নেই। আমাদের একটাই ফান্ড। কিন্তু লাইব্রেরি স্থাপন করার জন্য সরকার যদি কোনো উদ্যোগ নিজ থেকে গ্রহণ করতেন তাহলে আমার মনে হয় অনেক ভালো হতো। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে চাইবো বিদ্যালয়ে একটি লাইব্রেরি রুম স্থাপন করা ও লাইব্রেরিতে পর্যাপ্ত বই দেওয়া।
প্রশ্ন : শিক্ষক সুরক্ষা আইনের দাবি করছেন, এ সম্পর্কে কিছু বলুন—
বিউটি : মাননীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি আমি বিশেষভাবে অনুরোধ করছি শিক্ষক সুরক্ষা আইন ২০২৬ আপনারা প্রণয়ন করেন। শিক্ষকদের নিরাপদ রাখেন। শিক্ষক নিরাপদ থাকলে দেশ নিরাপদ থাকবে। শিক্ষকরা নৈতিকতার শিক্ষা দেবে শিক্ষার্থীদের। এখন অভিভাবকরা যদি শিক্ষকদের সব্বের্াচ স্থান না দেন সম্মান না দেন তাহলে তাদের সন্তানরা শিক্ষকদের সম্মান দিবেন না। শিক্ষককে সম্মান না দিয়ে শুধুমাত্র বই কলম হাতে দিয়ে কখনো নৈতিকতার শিক্ষা দিতে পারবেন না। শিক্ষককে কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে। আমি বলবো শিক্ষকরাও মানুষ তাই তারাও দোষ গুনের বাইরে না। শিক্ষকরা যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন তাহলে তাদের ঊর্ধ্বতনদের কাছে অভিযোগ দেন। এভাবে সাইবার বুলিং করে সমাজকে আপনি কী শিক্ষা দিচ্ছেন? শিক্ষকদের সম্মান দিন। শিক্ষকের পাশে দাঁড়ান, শিক্ষক বাঁচলে জ্ঞান বাঁচে, উজ্জ্বল হবে প্রাণ।
সিলেট থেকে আরো পড়ুন