ভুয়া জন্ম নিবন্ধন, মেম্বারসহ সবার বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬ ২৩:৪৪

বিদ্যালয়ের কাগজপত্রে ভুক্তভোগীর বয়স ১১ বছর। অথচ নিকাহনামায় বয়স ১৯ বছর! অনুসন্ধানে মিলে ভুক্তভোগীর দুটি জন্মনিবন্ধন। যার একটি ভুয়া এন আইডি কার্ড দিয়ে তৈরি। বয়স বাড়িয়ে বানানো এই জন্ম নিবন্ধনে ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে ১৯ বছর দেখিয়ে বিয়ে পড়িয়েছিলেন কাজী।

 


সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কুরবাননগর ইউনিয়নের মাইজবাড়ি গ্রামের এই ঘটনা নিয়ে চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি সংবাদের প্রকাশের পর চলতি তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন। তদন্ত প্রতিবেদনে সংবাদের সত্যতা প্রতিয়মান হওয়ায় পাঠানো হয় জন্ম ও মৃত্যু রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে। ৬ মাস পর রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ইউপি মেম্বার ছকিনা বেগম সহ জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

 


চিঠিতে বলা হয়, সদর উপজেলার কুরবাননগর ইউনিয়ন পরিষদে নাবালিকা শিশুর নাম (নাম গোপন রাখা হলো) পরিবর্তন করে ‘আকলিমা বেগম’ নামে ভুয়া জন্ম নিবন্ধন সনদ সৃজন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণক পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে যে, নাবালিকার পিতা, মাতা, যাচাইকারী ছকিনা বেগম, স্থানীয় ইউপি সদস্য (ওয়ার্ড নং ১, ২ ও ৩) এবং স্থানীয় পঞ্চায়েত কমিটির সদস্যগণের প্ররোচনায় ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে বয়স বৃদ্ধি দেখিয়ে এই ভুয়া জন্ম নিবন্ধন সনদটি সৃজন করা হয়।

 


জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪—এর ধারা ৫(৩) অনুযায়ী নিবন্ধনের জন্য প্রদত্ত তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে এবং মিথ্যা তথ্য প্রদান আইনটির ধারা ২১ (২) অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। যেহেতু আবেদনকারী ও তথ্য যাচাইকারীগণ জ্ঞাতসারে মিথ্যা তথ্য প্রদান করেছেন, তাই তাঁদের বিরুদ্ধে সূত্রোক্ত পত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ ধারা ২২ অনুসারে এই আইনের অধীন দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা নিবন্ধক (বা রেজিস্ট্রার জেনারেল) ম্যাজিস্ট্রেট এর আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবেন মর্মে উল্লেখ রয়েছে।

 


এমতাবস্থায়, সূত্রোক্ত পত্রের নির্দেশনার আলোকে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী অভিযুক্ত মো. রেনু মিয়া, সাবিনা বেগম, যাচাইকারী ছকিনা বেগম, স্থানীয় ইউপি সদস্য (ওয়ার্ড নং ১, ২ ও ৩) এবং প্ররোচনাকারী স্থানীয় পঞ্চায়েত কমিটির সদস্যগণের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়েরের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

 


নির্দেশনা পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার ইউনিয়ন পরিষদের সভায় আগামী রবিবার তাদের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নেয় পরিষদ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিতালী তালুকদার। তিনি বলেন, যেহেতু উর্ধ্বতন কতৃর্পক্ষের নির্দেশ তাই মামলা করতে হবে। আমরা আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করেছি। আগামী রবিবারের দিকে মামলা দায়ের করা হবে। এই রিপোর্টের পর আমাদের লাভ হয়েছে। আগে অনলাইনে এন আইডি যাছাই বাছাইয়ের কোন সুযোগ ছিলো না আমাদের কাছে। এখন সার্ভারে সেই সুযোগ অন্তর্ভুক্ত হবে বলে আশ্বাস পেয়েছি।

 


স্থানীয় সরকার উপ পরিচালক অসীম চন্দ্র বণিক বলেন, রিপোর্ট প্রকাশের পর আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করি। তদন্ত কমিটি রিপোর্টের সত্যতা পায়। পরে সেই রিপোর্ট উর্ধ্বতন কতৃর্পক্ষের কাছে পাঠানো হলে গত মাসে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। সেই নির্দেশনা মোতাবেক কুরবাননগর ইউনিয়ন পরিষদের নিবন্ধক অর্থাৎ চেয়ারম্যানকে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

 


প্রসঙ্গত,  এর আগে গত ১ জানুয়ারি ‘বাল্যবিবাহ মুক্ত জেলায় বিয়ের পিঁড়িতে ১১ বছরের শিশু’ শিরোনামে সংবাদে উল্লেখ করা হয়,  যে বয়সে সহপাঠীদের সাথে দুরন্তপনায় বেড়ে উঠার কথা, সে সময় বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে বাল্যবিবাহ মুক্ত ঘোষিত সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মাইজবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক ছাত্রী। এক বছর আগেও বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে বই আর খাতায় সময় কেটেছে শিশুটির। কিন্তু বিদায়ী বছরের ৯ ডিসেম্বর হয়ে যায় একই এলাকার মরছব আলীর ছেলে ইমন রহমানের ঘরের বধূ। 

 


বিদ্যালয়ের কাগজপত্র অনুযায়ী বিবাহিত ছাত্রীর বর্তমান বয়স ১১ বছর হলেও নিকাহ নামা ও জন্মনিবন্ধন বলছে ওই শিশু শিক্ষার্থীর বয়স ১৯। যে জন্মনিবন্ধন ইস্যু করা হয় বিয়ের ৫ দিন আগে কুরবাননগর ইউনিয়ন পরিষদে। অথচ এর আগেই ২০২৩ সালে ভুক্তভোগীর ১ম জন্ম নিবন্ধন দিয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। যেখানে তার জন্ম ২০১৫ সালে। প্রথম নিবন্ধনে থাকা সব তথ্য ঠিক রেখে শুধু শিশুর নামের সাথে দুটি অক্ষর যুক্ত করেই নতুন আরেকটি জন্ম নিবন্ধন দিয়েছে একই ইউনিয়ন পরিষদে। সেই জন্ম নিবন্ধন দিয়ে বিয়ে পড়িয়েছেন কাজী। দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে সম্পন্ন হলেও বিপত্তি বাধে বিয়ের পর। বিয়ের দেনদরবারে মনোমালিন্য হওয়ায় কনের বাবা দ্বারস্থ হন থানার। অপহরণ ও বাল্যবিবাহের অভিযোগে দায়ের করেন মামলা। সেই মামলায় বর ইমন রহমানকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার