সাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি

প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ২২:২২

ছবি. সুখবর

লিবিয়া থেকে সাগরপথে অবৈধভাবে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে খাবার ও পানির সংকটে অন্তত ১১ বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু ঘটেছে বলে জানা গেছে। জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, খাবার ও পানির সংকটে তাদের চোখের সামনেই কয়েকজনের ৯ জনের মৃত্যু ঘটে। মরদেহগুলোতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন তারা। জীবিত উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৮ জনকে মিশরের মার্সা মাতরুহ শহরের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা। এরমধ্যে সোমবার বিকেলে ১৪ জনকে মিশরীয় পুলিশ তাদের হেফাজতে নিয়েছে। দুইজন এখনো ওই হাসপাতালেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নিহতদের সকলের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায় নি।


জীবিত উদ্ধার হওয়া আব্দুল করিমের বাড়ি শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামে। সে ওই গ্রামের আব্দুল হেকিমের ছেলে। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় আব্দুল করিম তার পরিবারকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি ভিডিও বার্তা এবং একটি ভয়েস মেসেজ পাঠায়।


ওই ভয়েস ম্যাসেজ ও ভিডিও বার্তায় আব্দুল করিম বলেন, লিবিয়ার তবরুক শহর থেকে প্লাস্টিকের একটি বোটে ৪২ জন গ্রীসগামী তরুণকে দালালরা ‘গেইম’ দেয়। এই ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশী এবং চারজন ছিল সুদানি নাগরিক। গ্রীসের কাছাকাছি পেঁৗছার পর তাদের বোটের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। অনেক চেষ্টা করেও ইঞ্জিন চালু হচ্ছিল না। একপর্যায়ে পাঁচ মিনিটের দমকা হাওয়া শুরু হয়। এসময় ঝাঁকুনিতে বোটের সকল খাবার—দাবার এবং খাবার পানি সাগরে পড়ে যায়। নষ্ট বোট ভাসতে ভাসতে নয়দিন পর মিশরের সীমানায় এসে ভিড়ে। এরমধ্যে নয়জন বোটেই মারা যায়। লাশে পঁচন ধরায় গন্ধে টিকতে পারছিলেন না অন্যরা। পরে ওদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।


করিম বললেন, মিশরে যখন বোট ভিড়ে, তখন জীবিত সকলেই অসুস্থ ছিলেন। স্থানীয় লোকজন পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে ১৮ জনকে মিশরের মার্সা মাতরুহ শহরের সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিশোরগঞ্জের দুই তরুণ আইনুল হক ও মাহমুদুল হাসান মারা যান। 
আব্দুল করিমের মামা পাথারিয়ার বাসিন্দা গণমাধ্যম কর্মী মান্নার মিয়া বললেন, মিশরের হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ১৮ জনের মধ্যে শান্তিগঞ্জের ডুংরিয়া গ্রামের সুহেল মিয়া ও হরিপুর গ্রামের হোসাইন মিয়া ছিল। তিনি জানান, তার ভাগ্নে আব্দুল করিম কয়েক বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিল। ওখান থেকেই পরিবারের কাউকে না জানিয়ে দালালের মাধ্যমে লিবিয়া হয়ে গ্রীসে যেতে চেয়েছিল সে। করিমের ‘দালাল’ কে ছিল এটি মান্নার জানাতে পারেন নি। তিনি জানালেন, হবিগঞ্জের জসিম উদ্দিন নামের একজন দালাল ও জগন্নাথপুরের শাহীন মিয়া নামের একজন দালাল এসব কাজ (গ্রীস পাঠায়) করে বলে নিখেঁাজ কারও কারও পরিবারের কাছ থেকে শুনেছেন। এছাড়াও ঘটনার পর অনেকে বলেছেন, ডুংরিয়ারও একজন দালাল রয়েছে। তবে এর নাম কেউ—ই সোমবার এই প্রতিবেদককে জানান নি।


নিখোঁজ অন্য যুবকদের মধ্যে, শান্তিগঞ্জের পাগলা শত্রুমর্দন এলাকার হৃদয় পাল, চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খাঁন, রিপন মিয়া, মামুন খাঁন এবং রনসী গ্রামের মো. তালহা রয়েছেন বলে সরেজমিনে এলাকায় গিয়ে জানা গেছে। 
জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া দিরাই উপজেলার ধল গ্রামের যুবক লোহানী আহমদও মিশরের ওই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানা গেছে।


লোহানীর মামা মিফতা হাসান গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ‘লোহানী নৌকায় করে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার জন্য কয়েকদিন আগে রওয়ানা দিয়েছিল। গত কয়েকদিন তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। আজ সোমবার ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে সে মিশরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার সঙ্গে হাসপাতালে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি যুবক রয়েছেন। তবে যে নৌকায় ১১ জন মারা গেছেন, সে ওই নৌকায় ছিল কি না, আমরা জানতে পারি নি।’


সন্তানদের অপেক্ষায় মা—বাবা
হৃদয় পালের বয়স ১৭ বছর। চলতি বছর শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে শিক্ষাজীবন থামিয়ে প্রায় আড়াই মাস আগে বাড়ি ছাড়েন তিনি। এরপর ভারতের নয়াদিল্লি, শ্রীলঙ্কা ও দুবাই হয়ে পৌঁছান লিবিয়ায়। সেখান থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন হৃদয়। এখন ছেলের ফেরার পথ চেয়ে দিন গুনছেন বাবা—মা।


হৃদয়ের বাবা রন্টু চন্দ্র পাল ক্ষুদ্র ব্যবসা করেন। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রায় ১৫ দিন ছেলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তাঁর। ফোনে বাবা ছেলেকে বারবার সতর্ক করতেন যেন কারও সঙ্গে ঝগড়া বা মনোমালিন্যে না জড়ান। কিন্তু গ্রিসে যাওয়ার জন্য কথিত ‘গেম’ হওয়ার কথা ছিল গত পহেলা আগস্ট। সেই যাত্রা শেষ পর্যন্ত হয়েছিল কি না, সেটিও জানেন না বাবাসহ পরিবারের সদস্যরা। ওই সময়ের পর থেকেই হৃদয়ের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ।


হৃদয় শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের শত্রুমর্দন গ্রামের পালপাড়ার বাসিন্দা। তাঁর সঙ্গে একই পথে ছিলেন পাথারিয়া ইউনিয়নের শ্যামনগর গ্রামের তিনজন, জয়কলস ইউনিয়নের ডুংরিয়া গ্রামের একজন এবং পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের রনসী গ্রামের একজনসহ মোট ছয়জন। লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন যুক্ত হন। তাঁদের মধ্যে অনেকে গ্রিসে পৌঁছেছেন বলে পরিবারগুলো জানতে পেরেছে। কিন্তু হৃদয়ের কোনো সন্ধান মেলে নি।


শুধু হৃদয় নন, একইভাবে নিখোঁজ রয়েছেন শান্তিগঞ্জের ডুংরিয়া গ্রামের ২৮ বছর বয়সী সোহেল মিয়াও। তিনি ইছন মিয়ার ছেলে। পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় সোহেল। হতদরিদ্র পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করে ভাগ্য বদলের আশায় কথিত ‘বাইরোডে’ পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথেই তাঁরও কোনো খোঁজ নেই।


নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এরা প্রত্যেকেই ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, মানবপাচারকারী চক্রের মাধ্যমে তাঁদের সন্তানরা বিদেশে পাড়ি জমান। তবে ঠিক কার মাধ্যমে কে লিবিয়ায় গেছেন, সে বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের অনেকেই এখনো বিস্তারিত বলতে রাজি নন। তাঁদের ভাষ্য, আগে বিষয়টি ভালোভাবে বুঝে ও নিশ্চিত হয়ে পরে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন।


তবে স্থানীয় অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডুংরিয়া গ্রামের সোহেল মিয়া ও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের হৃদয় পালকে লিবিয়ায় পাঠানোর সঙ্গে ডুংরিয়া গ্রামের কুদ্দুস মিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। কুদ্দুস মিয়া তাঁদের লিবিয়ায় পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। তবে তিনি ক্যামেরার সামনে কিংবা রেকর্ডে বক্তব্য দিতে রাজি হন নি। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের একটি গোপন ভিডিও রেকর্ডও প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।


এদিকে সন্তানদের কোনো খোঁজ না পেয়ে নিখোঁজদের পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে চরম উৎকণ্ঠা। কারও ঘরে চলছে কান্না, কারও পরিবার দিন কাটাচ্ছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। সন্তান জীবিত আছেন কি না, নাকি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় কোনো বিপদের শিকার হয়েছেন কোনো প্রশ্নেরই উত্তর নেই তাঁদের কাছে। একেকটি দিন তাঁদের কাছে যেন দীর্ঘ অপেক্ষার আরেকটি অধ্যায়।


অনেক অনুনোয় বিনয় করার পরও কথা বলতে চান না কোন অভিভাবক। ক্যামেরার সামনে কথা বলার প্রস্তুতি নিয়েও কেঁদে ফেললেন হৃদয়ের বাবা রন্টু পাল। চিৎকার দিয়ে, চোখের পানি ঝড়াতে ঝড়াতে বললেন, ‘না আমি কিছুই বলতে পারবো না।’
নিখোঁজ এনামুল খানের বাবা ইসলাম উদ্দিন বলেন, আসার ছেলে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার কথা ছিলো। এখন তার কোনো খোঁজ আমরা পাচ্ছি না। এ বিষয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু বলতে চাইছি না। অপেক্ষা করছি, খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছি। মাধ্যমগুলোও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদি আমার ছেলের কোনো ক্ষতি হয়, আমরাই আপনাদের ডেকে সবকিছু বলবো। আমাদের একটু সময় দিন।


সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বললেন, ডিএসবি ও শান্তিগঞ্জ থানার পুলিশকে খেঁাজ খবর নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো  (সোমবার বিকাল পর্যন্ত) ক্ষতিগ্রস্তরা কোন তথ্য দেন নি। অভিযোগও জানান নি। তারা অভিয়োগ জানালেই মামলা হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার