প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ২১:৩২
আবারও খুন। আবারও একান্ত আপন সম্পর্কের মধ্যে হিং¯্রতার বিষবৃক্ষ। পৃথিবীর মধ্যে পিতা—পুত্রের সম্পর্ক সবচাইতে নিরাপদ, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ, নির্ভরতায় অটুট, বিশ^াসে দৃঢ়। আজকাল এ—সব সম্পর্কের মধ্যে হিং¯্রতা, স্বার্থান্ধতা ও চরম বৈরিতার নগ্ন প্রকাশ লক্ষ্য করি আমরা। গতকাল সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ আবারও পিতা—পুত্রের পবিত্র বন্ধনের মধ্যে একটি কলঙ্কচিহ্ন এঁকে দিলো। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার অন্তর্গত নরসিংহপুর ইউনিয়নের এক নিভৃত গ্রাম সোনাপুর। ওই গ্রামে বসবাস করেন ৭৫ বছর বয়সের মোহাম্মদ আলী। পুত্রবধূ ও নিকটজনসহ বসবাস করেন তিনি। তাঁর ছেলে ইসমাইল মিয়া সৌদিআরব প্রবাসী। প্রবাসী পরিবারগুলো কিছুটা স্বচ্ছল থাকে বলেই আমরা জানি। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে শান্ত ও সুখী এই পরিবারের ভিতর কী নিদারুণ স্বার্থের সংঘাত চলছিলো তা জানা গেলো বৃদ্ধ মোহাম্মদ আলী নিহত হওয়ার পর। সৌদিপ্রবাসী পুত্র ইসমাইল পিতার নামে থাকা কিছু জমি নিজের নামে লিখে দেয়ার জন্য বেশ কিছুদিন ধরে চাপ দিচ্ছিলেন। পিতা তাতে সায় দিচ্ছিলেন না। কেন দিবেন ? পিতার সম্পদের উত্তরাধিকার তো পুত্রদেরই। সংবাদে এই তথ্য আসেনি যে, মোহাম্মদ আলীর আরও সন্তান—সন্ততি আছে কি—না। থাকাটাই স্বাভাবিক। পিতার সম্পদের উপর সকল সন্তানের অধিকার বিদ্যমান। এই চিরন্তন উত্তরাধিকারিত্ব অস্বীকার করে তিনি কেন এক সন্তানকে জমি লিখে দিবেন ? তিনি দেননি। এই না দেয়ার মূল্য চুকাতে হয়েছে তাঁকে জীবনের বিনিময়ে। নিজের নামে জমির অধিকার না পাওয়ায় সৌদিপ্রবাসী পুত্র ইসমাইল বাড়িতে থাকা স্ত্রীর সহযোগিতায় এক নির্মম পরিকল্পনা আঁটেন। যে পরিকল্পনা মানব ইতিহাসের জঘন্য ও কলঙ্কময় এক অধ্যায় রচনা করেছে। ইসমাইল ও তার স্ত্রীর পরিকল্পনায় পিতাকে হত্যা করার জন্য ৫০ হাজার টাকা দিয়ে খুনী ভাড়া করা হয়। ১৪ আগস্টের রাতে চুক্তিবদ্ধ খুনীরা আসে মোহাম্মদ আলীর বাড়িতে। পুত্রবধূ হোসনা বেগম ঘরের দরোজা খোলে দেন। খুনীরা বৃদ্ধ মোহাম্মদ আলীর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ^াস রোধ করে হত্যা নিশ্চিত করে চলে যায়। পরদিন সকালে পুত্রবধূ হোসনা চিৎকার করতে থাকে তার শ^শুর ঘুমের মধ্যে মারা গেছেন। তাঁর মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি নেয়া হয়। কিন্তু নিহতের মুখে রক্ত ও গলায় কালো দাগ দেখে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হলে তাঁদের কেউ একজন দোয়ারাবাজার থানায় খবর দেন। গ্রেফতার হন খুনের পরিকল্পনাকারী পুত্রবধূ হোসনা, দুই খুনী রুহুল আমিন ও নজরুল ইসলাম। উপরের বর্ণনা পড়ে মানুষ মাত্রই শিউরে উঠবেন। এ কেমন সমাজ, সভ্যতা, সম্পর্ক এবং মনোস্তত্ত্ব আমাদের ? সামান্য কিছু সম্পত্তি নিজের না হওয়ার কারণে পুত্র—পুত্রবধূ মিলে বৃদ্ধ পিতার প্রাণ নিয়ে নেয় ? এ থেকে অবধারিতভাবে আরেকটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে, ব্যক্তিগত সম্পদই কি দুনিয়ার সকল অনর্থের মূল কারণ ? মানুষ তো সীমিত আয়ুর প্রাণী। সে জানে একদিন তার মৃত্যু হবে। জেনেও ব্যক্তি বৈধ—অবৈধ ও নির্মম পন্থায় সম্পদ আহরণের উদগ্র লালসা থেকে বের হয়ে আসতে পারে না। আরও চাই, আরও চাই...। কতো পরিমাণ সম্পদ হলে ব্যক্তির সন্তুষ্টি শতভাগ পূরণ হয়, সেই হিসাব দুনিয়ার কোনো সমাজবিজ্ঞানী এখনও দিতে পারেননি। তবে এই সম্পদ—লালসা যে পৃথিবীর শান্তি বিনষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। পরিকল্পনা করে খুন করলে এর সাথে জড়িতদের আইনি কাঠামোয় মৃত্যুদণ্ড বা যাবৎজীবন কারাদণ্ড এড়ানোর পথ নেই। তা জেনেও কেন মানুষ সম্পদের জন্য অন্যকে, নিজের বৃদ্ধ পিতাকে হত্যা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাগ্রস্ত হয় না, এই জটিল প্রশ্নের উত্তর না মিলানো পর্যন্ত অশান্ত পৃথিবীর লোভাতুর জনগোষ্ঠীর জীবনে শান্তি ফিরে আসার দূরতম সম্ভাবনাও নেই।
৭৫ বছরের বৃদ্ধ মোহাম্মদ আলীকে যখন হত্যা করে পাষণ্ড খুনীরা তখন তাঁর বিস্ফোরিত চোখ, আত্মরক্ষার অসহায় প্রচেষ্টা এবং যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুমুহূর্তগুলোর কথা ভাবুন। এর বিপরীতে খুনের পরিকল্পক ও খুনীদের নির্বিকার মনোভাব চিন্তা করুন। মোহাম্মদ আলীর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর পুত্রবধূ রাতের অবশিষ্ট সময় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে। পরদিন ঠাণ্ডা মাথায় শ^শুরের মৃত্যুর খবর রটিয়েছে। তার ভিতর কোনো অপরাধবোধ এবং উদ্বেগ ছিলো না। সৌদিতে অবস্থানরত পুত্র ইসমাইলও নিশ্চয়ই এ সময় পিতাকে হত্যার মিশন সফল হওয়ার খবর জেনে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে। কেমন পাষণ্ড হলে এমন ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ খুন করা যায়, ভাবুন সকলে। সমাজের সকলে এমন ভাবনায় তাড়িত না হলে এই সমাজ ক্রমশ খুনীপ্রবণ জনগোষ্ঠীর জঙ্গলে পরিণত হবে।
সোনাপুরের যে বৃদ্ধ মোহাম্মদ আলীর নিশ্চিন্তে পুত্রের সংসারে থাকার কথা, সেই সংসার তাঁর জীবন কেঁড়ে নিলো। এই চরম বর্বরতার সাথে জড়িত সকলের দৃষ্টান্তমূলক শান্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাই।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন