নির্যাতন ও ঋণে জর্জরিত ৬৬ জন

প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ২১:৪৮

দালালের হাতে বিক্রি, মাফিয়ার নির্যাতন 

ছবি. সুখবর

সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের ৯৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী গত দুই মাসে লিবিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে সুনামগঞ্জেরই রয়েছেন ৬৬ জন। ফেরত আসা এসব তরুণ উন্নত জীবনের আশায় বিভিন্ন দেশ পাড়ি দিয়ে লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তারা নানা ধরনের অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হন। একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে বাধ্য হয়ে তাদের দেশে ফিরতে হয়েছে।


তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল লতিফের ছেলে আল আমিন। ২০২২ সালে লিবিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন তিনি। পর্যটন ভিসায় প্রথমে দুবাই যান। সেখানে এক সপ্তাহ অবস্থানের পর লিবিয়ায় পাড়ি জমান। লিবিয়ায় প্রায় সাড়ে তিন বছর কাজ করেন তিনি। এ সময় কোনো কোনো মাসে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেছেন।


পরে ভৈরবের এক লিবিয়া প্রবাসী দালালের মাধ্যমে সাড়ে ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার চুক্তি করেন আল আমিন। তিনি বলেন, চুক্তির পুরো টাকা দালালকে দেওয়ার পর একটি বোটে করে তাদের ভূমধ্যসাগরে পাঠানো হয়। প্রায় ৬২ ঘণ্টা সমুদ্রে ভাসার পর লিবিয়ার পুলিশ তাদের আটক করে।
আল আমিন জানান, পরে ওই দালাল পুলিশের কাছ থেকে তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে আবারও গ্রিসে পাঠানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু দ্বিতীয়বারও লিবিয়ার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। এরপর এক মাস পাঁচ দিন কারাভোগ করেন। পরে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে দেশে ফিরে আসেন।
শুধু আল আমিন নন, গত দুই মাসে সুনামগঞ্জের ৬৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে দেশে ফিরে এসেছেন। তাদের অনেকেই লিবিয়ায় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব অভিবাসনপ্রত্যাশী নিজেরাই দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জীবন ঝুঁকিতে ফেলে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ইউরোপে উন্নত জীবনের সেই স্বপ্ন এখন তাদের কাছে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। জায়গা—জমি বিক্রি ও ধারদেনা করে বিদেশে পাড়ি জমানো এসব অভিবাসন প্রত্যাশীর মাথায় এখন মোটা অঙ্কের ঋণের বোঝা।


দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের খেজাউরা গ্রামের বাসিন্দা সাইফুল ফজর আলী বলেন, ৪ বছর আগে সৌদি, তুর্কি হয়ে লিবিয়ায় গিয়েছি। যাওয়ারপর দালাল ওই দেশের মাফিয়ার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। টাকার জন্য মাফিয়া অত্যাচার নির্যাতন করতো। মাফিয়া থেকে বাঁচতে দেশ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা নিয়ে দিতে হয়েছে। এরপরও মাফিয়া আরেকটি চক্রের কাছে আমাদের হন্তান্তর করে। ওই চক্রটি গেইম দিবে বলে আরও ৫ লক্ষ টাকা দাবি করে। তাদের দাবিমতো ৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার পর সমুদ্রের পাড়েই পুলিশ আমাদেরকে গ্রেফতার করে। পুলিশের কাছ থেকে ছাড়া পেতেও আরও ৫ লক্ষ টাকা দিতে হয়েছে। পরে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে দেশে এসেছি।


জামালগঞ্জের মো. আহাদুল্লাহ বলেন, লিবিয়ায় যাওয়ার পর চার মাস পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেছি। স্বপ্ন ছিল ইউরোপে যাওয়ার। এ জন্য এক দালালের সঙ্গে আট লাখ টাকায় চুক্তি করি। প্রথমে তিন লাখ টাকা দিয়ে লিবিয়ায় যাই। পরে বাকি পাঁচ লাখ টাকার জন্য দালালরা আমাকে আটক করে মারধর করে। একপর্যায়ে কোনোমতে সেখান থেকে পালিয়ে আসি। তখন আমার কাছে কোনো মোবাইল ফোন ছিল না। তবে দালালরা দেশে আমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে নির্যাতনের ছবি পাঠিয়ে আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। পরিবারের সদস্যরা আমাকে দালালদের কাছে আটক মনে করে নির্যাতনের ছবি দেখে বাধ্য হয়ে ওই টাকা পরিশোধ করেন। তারা জানতেন না যে, আমি এরই মধ্যে পালিয়ে এসেছি।


একই উপজেলার ফেনারবাক ইউনিয়নের নাজিমনগর গ্রামের আতাউর রহমান বলেন, পাশের ভীমখালী ইউনিয়নের কলকতা গ্রামের দালাল নজরুল ইসলামের সঙ্গে চুক্তি করে ১৫ লাখ টাকা দিয়ে সৌদি আরব, মিসর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছাই। কিন্তু লিবিয়ায় যাওয়ার পর নজরুল ইসলাম সেখানকার গেইমারকে টাকা না দেওয়ায় আমাকে মাফিয়ার কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এরপর মাফিয়ার লোকজন টাকার জন্য আমাকে মারধর ও নির্যাতন করে। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে হাসপাতালের চিকিৎসকের সহযোগিতায় দেশটির সেনাবাহিনীর কাছে পৌঁছাই। সেনাবাহিনীর সদস্যরাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে আমাকে দেশে পাঠান।

 


আতাউর রহমান বলেন, লিবিয়ায় যাওয়ার জন্য ১৫ লাখ টাকা সুদে ঋণ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঋণের পরিমাণ এখন বেড়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা হয়েছে। কিন্তু দালাল নজরুল ইসলাম কোনো টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। এর আগে যারা দালালের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন, তারাও কোনো সমাধান পাননি। তাই আমিও মামলা করার সাহস পাচ্ছি না।

 


অভিযুক্ত নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত নম্বরে কল করা হলে প্রথমে তিনি নিজের পরিচয় নজরুল ইসলাম হিসেবে নিশ্চিত করেন। তবে আতাউর রহমান নামে কাউকে চেনেন না বলে দাবি করেন। একপর্যায়ে তিনি ‘রং নম্বর’ বলে কলটি কেটে দেন।
সুনামগঞ্জ জেলায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের জেলা কো—অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, গত দুই মাসে সুনামগঞ্জের ৬৬ জন অভিবাসন প্রত্যাশী লিবিয়া থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। দেশে ফেরার পর তারা অনেকেই ঋণগ্রস্ত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন। এসব অভিবাসনপ্রত্যাশীকে পুনরেকত্রীকরণের মাধ্যমে আবারও সমাজের মূলে¯্রাতে ফিরিয়ে আনতে আমরা কাজ করছি।

 


অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার বলেন, গত কয়েক মাসে এ বিষয়ে ৭ থেকে ৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার তদন্ত সিআইডির কাছে পাঠানো হয়েছে। সিআইডি কয়েকটি মামলায় চার্জশিট দিয়েছে এবং কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ দালাল দেশের বাইরে অবস্থান করায় তাদের আইনের আওতায় আনতে কিছুটা জটিলতা রয়েছে।

 


তিনি বলেন, প্রতারণার শিকার হয়ে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করে মামলা করার আহ্বান জানাচ্ছি। অভিযোগ পাওয়ার পর আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার