‘এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে প্রতারণা, দায় মূল ব্যাংকেরই’

প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৫৫

সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং শাখা থেকে গ্রাহকদের অর্থ উধাও ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠছে। বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্টের অপব্যবহার, লেনদেনের এসএমএস বন্ধ রাখা এবং অসাধু কর্মকর্তাদের আত্মসাতের ঘটনায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন প্রান্তিক আমানতকারীরা। এ বিষয় এবং সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের নিয়মিত সংবাদ সংযোগ ‘খবরনামা’য় আলোচনা করেছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ও লেখক সুখেন্দু সেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের শাখা থেকে গ্রাহকের অজান্তে টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনা কীভাবে সম্ভব?
সুখেন্দু সেন: প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতেই এই ব্যবস্থার সূচনা। এজেন্ট কেবল আমানত সংগ্রহ ও গ্রাহক যোগাযোগের কাজ করে, তবে গ্রাহকের আমানতের মূল দায় কিন্তু মূল ব্যাংকেরই। এখানে প্রযুক্তির বা ব্যবস্থার কোনো দোষ নেই, বরং এটি কর্মকর্তা—কর্মচারীদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যোগসাজশ ও জালিয়াতি।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর : ফিঙ্গারপ্রিন্ট জালিয়াতি বা এসএমএস বন্ধ করে টাকা আত্মসাতের বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
সুখেন্দু সেন: একাধিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া বা অসাধু উপায়ে টাকা তুলে নেওয়ার প্রমাণ ব্যাংকের সিস্টেমে অবশ্যই পাওয়ার কথা। তবে গ্রামের সহজ—সরল মানুষ অনেক সময় টাকার সঠিক রসিদ নেন না বা মেসেজ পড়তে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকে টাকা জমা না করেই আত্মসাৎ করা হয়েছে। এখানে মূল ব্যাংকের অডিট ও নজরদারির স্পষ্ট অভাব ছিল। যদি উপযুক্ত জমা রসিদ বা প্রমাণ থাকে, তবে ব্যাংক দায় এড়াতে পারে না। ইসলামী ব্যাংকের অবস্থা তো বর্তমানে এমনিতেই নাজুক। হয়তো তাদের তারল্য সংকট আছে। তারল্য সংকটের জন্য টাকা না দিতে পারা এক কথা, আর মানুষের টাকা লোপাট করে দেওয়া সেটা অন্য কথা। ন্যাশনাল ব্যাংকেও লোকজন টাকা পাচ্ছে না। ১ লাখ টাকার চাহিদা থাকলে তারা ১০,০০০ টাকা পাচ্ছে। প্রায়ই দেখছি ঝামেলা হয়, ইসলামী ব্যাংকেও ইদানিং বেশ ঝামেলা হচ্ছে। এবং ইসলামী ব্যাংক থেকে টাকা তোলার একটা হিড়িক পড়ে গেছে, তারা তারল্য সংকটে ভুগছে।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর : এসএমএস সেবা বন্ধ রাখার অভিযোগ কি অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার প্রমাণ?
সুখেন্দু সেন: হ্যাঁ, অবশ্যই। মূল শাখাগুলো এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ওপর যথেষ্ট নজরদারি ও নিয়মিত অডিট করেনি। অডিট করলে এই অনিয়মগুলো আগেই ধরা পড়ত। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—গ্রাহকরা তাদের টাকা কীভাবে ফেরত পাবেন। উপযুক্ত প্রমাণ থাকলে মূল শাখাকেই দায় নিতে হবে, প্রমাণ না থাকলে আইনি পথে যেতে হবে।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর : টাকা আত্মসাতের দায় কে নেবে—মূল ব্যাংক, নাকি এজেন্ট?
সুখেন্দু সেন: এজেন্ট ব্যাংকের সকল লেনদেন মূল ব্যাংকের হিসাবেই থাকে, তাই আমানতকারীদের দায়ও মূল ব্যাংকের। মূল ব্যাংকের দুর্বলতার সুযোগে যদি আত্মসাৎ হয়, সেই দায় গ্রাহকের নয়, ব্যাংকের। গ্রামের সহজ—সরল মানুষগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঠকানো হয়েছে—এটা গুরুতর অপরাধ।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর : ইসলামী ব্যাংকের এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?
সুখেন্দু সেন: ইসলামী ব্যাংক একসময় দেশের অন্যতম সেরা ব্যাংক ছিল। রাজনৈতিক প্রভাব ও এক লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণখেলাপি এই ব্যাংককে দুর্বল করেছে। বর্তমানে পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যিনি হয়তো তারল্য সংকট কিছুটা সামাল দিতে পারবেন। কিন্তু ব্যাংক পুনর্গঠনের জন্য পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ অপরিহার্য। ব্যাংকের মূল শক্তি হলো গ্রাহকের আস্থা। সেই আস্থা একবার নষ্ট হলে পুনরুদ্ধার করা কঠিন। কোনো ব্যাংকে প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে তা টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য বড় বাধা।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর : আপনি কি এখান থেকে টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো আশা দেখছেন?

 


সুখেন্দু সেন: যাদের কাছে ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও জমার প্রমাণ আছে, তারা আইনি পথে দাবি করতে পারবেন। কিন্তু যাদের কাছে যথাযথ কাগজপত্র নেই, তাদের জন্য এটা কঠিন হবে। এজন্যই প্রতিটি লেনদেনে রসিদ ও এসএমএস নিশ্চিত করা জরুরি।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর : আমরা প্রত্যাশা করব—ইসলামী ব্যাংক সকল অভিযোগ খতিয়ে দেখবে এবং যাবতীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিয়ে গ্রাহকদের কষ্টার্জিত অর্থ তাদের হাতে ফিরিয়ে দেবে। যেসব গ্রাহক এজেন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা জমা দিয়েছেন, তাদের উচিত সমস্ত উপযুক্ত তথ্য—প্রমাণ ও কাগজপত্র নিয়ে যথাযথ নিয়ম মেনে অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করা। গ্রাহকদের কষ্টার্জিত আমানত সুরক্ষা ও ফেরত দিতে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সব প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি পথ খতিয়ে দেখবে—এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার