সংস্কারে শুরু আছে, শেষ নেই

প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট, ২০২৬ ০০:০৬

সিলেট—ছাতক রেলপথ পুনর্বাসনের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে, কিন্তু কাজ এগিয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকা ব্যয়ে নেওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ ছিল গত ২৩ আগস্ট পর্যন্ত। অথচ প্রায় ৩৪ কিলোমিটার রেলপথের পুরোনো লাইন তুলে ফেলা হলেও নতুন ট্র্যাক স্থাপনসহ গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ কাজ এখনো বাকি। কোথাও কোথাও সংস্কারকাজ বন্ধ থাকায় দীর্ঘ চার বছর পর রেল যোগাযোগ চালুর অপেক্ষায় থাকা স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা। 

 


রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দাবি, প্রকল্পের ২৫ শতাংশ কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, কাজ হয়েছে ২০ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।

 

 

 

 

 


সিলেট থেকে ছাতক বাজার পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার রেলপথটি ১৯৫৪ সালে নির্মাণ করা হয়। ঐতিহাসিক এই রেলপথ দিয়ে ছাতক থেকে চুনাপাথরসহ বিভিন্ন পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হতো। পাশাপাশি সুনামগঞ্জের মানুষ সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রেও এই রেলপথের ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় রেলপথটির বিভিন্ন অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে এই পথে সব ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় রেলপথের মূল্যবান স্লিপার ও লোহার পাতও চুরি হয়েছে।


দীর্ঘ চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৫ সালে সিলেট—ছাতক রেলপথ পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। ২০২২ সালের বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সিলেট থেকে ছাতক বাজার অংশের (মিটারগেজ ট্র্যাক) পুনর্বাসন প্রকল্প নামে নেওয়া প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকা।

 

 

 

 

 


রেলওয়ে সূত্র জানা যায়, সরকারি অর্থ (জিওবি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে কাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেড (এমএএইচএল)। ওই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি হয়। প্রকল্পের মোট ব্যয় ২১৭ কোটি টাকা হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয় ১৯৯ কোটি টাকায়।

 


প্রকল্পের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ সংস্কার, মাটি ভরাট, কালভার্ট ও সেতু মেরামত, নতুন স্লিপার স্থাপন এবং নতুন রেললাইন বসানোর কাজ রয়েছে। ইতোমধ্যে ছাতক থেকে সিলেট পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার পুরোনো রেললাইন অপসারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতাধীন ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। তবে নতুন ট্র্যাক স্থাপনসহ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ এখনো বাকি। ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ, হাসনাবাদ, কালারুকা, মাধবপুর, ছৈলা—আফজলাবাদ, সৎপুর এবং সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্চীসহ বিভিন্ন এলাকায় সংস্কারকাজ বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও পুরো রেলপথে আবার কবে ট্রেন চলাচল শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।


স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প শুরুর পর থেকেই কাজ চলেছে ধীরগতিতে। ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথের উচ্চতা নির্ধারণ ও সমন্বয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। কোথাও সড়কের মাটি ভরাটের পর রেলপথের উচ্চতা যথাযথভাবে নির্ধারণ না হওয়ায় কাজ পিছিয়েছে।

 


ছাতকের লেভারপাড়া এলাকার বাসিন্দা শামীম হোসেন আকাশ বলেন, ২০২২ সালের বন্যায় রেলপথের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন পর সংস্কারকাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে রেল যোগাযোগ ফের চালু হওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন বিভিন্ন এলাকায় কাজ চলার পর হঠাৎ তা বন্ধ হয়ে যায়। কাজ বন্ধের কারণ সম্পর্কে স্থানীয়দেরও স্পষ্ট কোনো তথ্য জানানো হয়নি। ফলে রেলপথটি আদৌ কবে চালু হবে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও হতাশা বাড়ছে।

 


ছাতক লাইম স্টোন ইম্পোর্টার্স এর সদস্য মো. ইছহাক আলী বলেন, ছাতকের সিমেন্ট, চুনাপাথর, বালি, পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে রেলপথটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। পাশাপাশি কম খরচে সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় নিরাপদে যাতায়াত করা যেত। তিনি বলেন, ২০২২ সালের বন্যার পর রেলপথটি বন্ধ রয়েছে। সংস্কারকাজ শুরু হলেও কবে শেষ হবে, তা কেউ জানে না।  মাটি ভরাট ছাড়া আর কোনো কাজ আমাদের নজরে পড়ছে না। রেলপথ বন্ধ থাকায় সড়কপথে পণ্য পরিবহনে ব্যবসায়ীদের সময় ও অর্থ দুটিই বেশি ব্যয় হচ্ছে।

 


সিলেট থেকে ছাতক বাজার অংশের রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা সিলেট রেলওয়ের উর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মাসুদ পারভেজ বলেন, ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। মাটি ভরাট ও কালভার্টের কাজও দ্রুত চলছে।  প্রকল্পের ২৫ শতাংশ কাজ হয়েছে এবং ৭৫ শতাংশ কাজ বাকি। তিনি বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ ২৩ আগস্ট শেষ হয়েছে। ২১৭ কোটি টাকার প্রকল্প হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১৯৯ কোটি টাকার চুক্তি হয়েছিল। এর মধ্যে ৩০ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। এখন প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি ও বাস্তবায়নের বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।

 


তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের প্রকল্প এলাকার প্রকৌশলী সজিবুর রহমান বলেন, প্রকল্পের সব কাজ চলমান রয়েছে। ৫১ হাজার স্লিপার তৈরির কাজ চলছে। মাটির কাজও অব্যাহত আছে। আগামী মাসে ১০টি কালভার্ট নির্মাণের কাজ শেষ হবে। ছাতকের তিনটি রেলস্টেশন নির্মাণসহ প্রকল্পের সব কাজই চলমান। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সুনামগঞ্জ অঞ্চলের আবহাওয়া, বিশেষ করে ঝড়—বৃষ্টির কারণে বছরের প্রায় অর্ধেক সময় কাজ করা সম্ভব হয় না।  তার ধারণা, এই অঞ্চলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা কঠিন।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, বৃষ্টি ও বর্ষার কারণে সময়মতো মাটির কাজ করা সম্ভব হয়নি। দেড় বছর মেয়াদি প্রকল্পের মধ্যে দুটি বর্ষাকাল থাকায় কাজ ব্যাহত হয়েছে। বর্তমানে সব কাজ চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, প্রকল্পের ২০ শতাংশ কাজ হয়েছে। বাকি কাজ শেষ করতে আরও এক বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। বিগত সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক মালামাল আমদানি করা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে ২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। বাকি কাজ সময়মতো শেষ করা এবং বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় মালামাল আমদানির চেষ্টা চলছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আশা, আরও এক বছর সময় পেলে প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।  তবে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও প্রকল্পের বড় অংশের কাজ বাকি থাকায় সিলেট—ছাতক রেলপথে আবার কবে ট্রেন চলাচল শুরু হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার