ভাঙা ঘরের দেয়ালে জমে আছে আলীনগরের কান্না

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৪১

দিরাইয়ে সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে পর্যায়ক্রমে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এতে সর্বস্ব হারিয়ে অনেক পরিবার বসতভিটা ছেড়ে আত্মীয়—স্বজনের বাড়ি ও বিভিন্ন স্থানে মানবেতর জীবনযাপন করছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

 


ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের আলীনগর গ্রামে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খাসজমি, জলমহাল ও গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালী দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি সদস্য শাহাদ্বীব আলী এবং অপর পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন রফিকুল ইসলাম।
গত ১২ মে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। গুরুতর আহত শাহাদ্বীব আলীর পক্ষের রতন মিয়া সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ মে সকালে মারা যান। এ ঘটনায় রতন মিয়ার বাবা মো. সোনা মিয়া বাদী হয়ে ১৬৯ জনের বিরুদ্ধে দিরাই থানায় হত্যা মামলা করেন।

 


ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মামলা হওয়ার পর গ্রেপ্তার এড়াতে রফিকুল ইসলামের পক্ষের পুরুষ সদস্যরা আত্মগোপনে চলে গেলে গ্রামে একতরফা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এরপর শাহাদ্বীব আলীর লোকজন পর্যায়ক্রমে প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। তাদের দাবি, অর্ধশতাধিক ঘর ভাঙচুর করা হয়েছে এবং গবাদিপশু, ধান, আসবাবপত্র, নৌকা, মাড়াই মেশিনসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

 


শনিবার সরেজমিন আলীনগর গ্রামে গিয়ে ভাঙচুরের চিহ্ন দেখা যায়। সাবেক মহিলা ইউপি সদস্য রেনুকা বেগমের পাকা বাড়ির ছাদে ড্রিল দিয়ে বড় বড় ছিদ্র করা হয়েছে। হাতুড়ি দিয়ে দেয়াল ভেঙে দরজা—জানালা খুলে নেওয়া হয়েছে। ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে—ছিটিয়ে রয়েছে লেপ—তোষকসহ বিভিন্ন সামগ্রীর ধ্বংসাবশেষ। তার দেবর জামাল মিয়ার আধাপাকা ঘরটি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
রেনুকা বেগম বলেন, সারা জীবনের সঞ্চয় লুটে নেওয়া হয়েছে। মাথা গোঁজার ঘরটিও ক্ষত—বিক্ষত করে দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার অভাবে বাড়িতে ফিরতে পারছি না। বর্তমানে বাবার বাড়িতে মানবেতর জীবনযাপন করছি। তার দেবর জামাল মিয়া পরিবার নিয়ে সিলেটে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানান তিনি।

 


গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, অনেক টিনসেড ঘরের চালে অসংখ্য ফুটো, কোনো কোনো ঘরের বেড়া নেই। ভাঙা ঘরের ভেতরে আসবাবপত্রও নেই। হামলা থেকে টিউবওয়েল ও শৌচাগারও রক্ষা পায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
গ্রামের সুবেনা বেগম, রাজনা বেগম, হেপী বেগম, রামনা বেগম, আমিনা, রুশনা, দুলিয়া, সিদ্দিকা ও রেহেনা বেগমসহ কয়েকজন অভিযোগ করেন, ‘ঘরের জিনিসপত্র, গরু—ছাগল, ধান, নৌকা ও মাড়াই মেশিন—যা পেয়েছে, নিয়ে গেছে। এরপর বসতঘর ভাঙচুর করা হয়েছে।

 


তাদের আরও অভিযোগ, বাড়িঘর ভাঙচুর না করার কথা বলে কোনো কোনো পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে। রামনা বেগমের কাছ থেকে ৬০ হাজার, জাহানারা বেগমের কাছ থেকে ৫০ হাজার, সলখ নূরের কাছ থেকে ৪০ হাজার, রাজনের কাছ থেকে ৩০ হাজার এবং রুসেদের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।


রামনা বেগম বলেন, বাড়িঘর ভাঙবে না বলে ইউপি সদস্য শাহাদ্বীব আলী আমার কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও তার পক্ষের লোকজন আমার বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে।
অভিযোগের বিষয়ে শাহাদ্বীব আলী বলেন, একটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। উত্তেজনার বশে কিছু ঘরবাড়ি ভাঙচুর হতে পারে। তবে লুটপাটের অভিযোগ সঠিক নয়। সংঘর্ষের পর প্রায় দুই সপ্তাহ গ্রামে পুলিশ মোতায়েন ছিল। পুলিশের উপস্থিতিতেই তারা নিজেদের মালপত্র সরিয়ে নিয়েছে।


রফিকুল ইসলামের পক্ষের কয়েকজন জানান, হত্যা মামলার তিন আসামি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং পাঁচজন পলাতক। অন্যরা উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাড়ি ফিরতে পারছেন না। তারা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছেন।

 


বৃদ্ধ মশকুর আলী বলেন, কয়েকদিন আগে বাড়িতে ফিরেছিলাম। আলীনগর বাজারে সদাই করতে গেলে শাহাদ্বীবের লোকজন আমাকে মারধর করে। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, আমি দিরাই থানায় যোগদানের পর ঘটনাটি জানতে পেরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ওই সময় হত্যা মামলার আসামিরা পলাতক ছিলেন। তাদের ঘর, দরজা ও বেড়া ভাঙা এবং ঘরবাড়ি তছনছ অবস্থায় দেখেছি। পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে এসে তারা ক্ষয়ক্ষতি এবং সংঘর্ষের সময় তাদের পক্ষের লোকজন আহত হওয়ার ঘটনায় আদালতে একটি মামলা করেছেন। মামলাটি এখনো থানায় আসেনি। থানায় এলে যথাযথ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার