বদল হয় ইতিহাস, থেকে যায় বিশ্বাস

প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ২০:৪৫

ভাটি অঞ্চলের বনেদি জমিদার পরিবারের গ্রামে প্রাসাদসম নিজস্ব বাড়ি থাকা সত্ত্বেও সুনামগঞ্জ শহরে বাসা বাড়ি ছিলো শহরের প্রাণকেন্দ্রে ও পুরাতন বাসস্টেন্ড সংলগ্ন জামাইপাড়ায় প্রবেশের মুখে। কৈশোরে আমাদের শহরচারনে, পশ্চিমের শেষ সীমানা ছিলো গৌরারঙ্গ জমিদার পরিবারের বাসা। লাল ইটের হাফ ওয়াল থেকে টিনের চালে আচ্ছাদিত ছাদ সীমানা ছিলো চৌকানা নিদৃষ্ট মাপের কাঠের ফ্রেমের ব্যাটনের দেয়াল। 


বাসায় প্রবেশ করতে প্রথমে অতিথিদের জন্য বসার ঘর। সামনে চৌকোনা বারান্দা। চারদিকে চারটি পিলারের উপর টিনের টানা চাল। বারান্দা প্রবেশ স্থলের চার পাশে বাহারি নকশা করা চুন সুরকির পাশ দেয়াল। বসার ঘর ধরে এগুলেই নরম সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত উঠোন। যার দক্ষিণ পাশে রান্না ঘর। সামনেই চারদিক পাকা করে তৈরী তুলসী তলা। পরিবারের খাবারের পুরো আয়োজন বাজার করা থেকে শুরু করে রান্নার যাবতীয় কাজের দায়িত্বে ছিলেন আমার চোখে দেখা নির্লোভ ও জমিদার পরিবারের প্রতি একনিষ্ট একজন সাদা মনের মানব স্বর্গীয় মইন্যা দা। যার আরো কথা ক্রমে আসবে। জমিদার বাড়ির পূর্বদিকে প্রিয় বিজন দার বাসস্থান। যার সামনে পশ্চিম দিক ঘেঁসা বেশ বড় সড়ো বাঁশের ঝাঁড়। পশ্চিমে লম্বাটে তিন অথবা চার রুমের একতলা বাড়ি। পশ্চিম পাশের লম্বাটি বাড়ির শেষ ঘর ছিলো জমিদার পরিবারের সর্বকনিষ্ট সন্তান রুপজ রঞ্জন চৌধুরী যার ডান নাম ছিলো টুকুনের। বন্ধুদের কেউ ডাকতো রুপজ বলে তবে আমাদের আরেক বন্ধু মুহিত প্রায়শঃ টুকুন বলে ডাকতো। 


স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দিনের সারা বেলা কখনো মধ্য রাত অবধি তুমুল আড্ডা সহ খাওয়া দাওয়ার ভরসাস্থল ছিলো রুপজদের বাসা। বাসায় কোন মহিলা সদস্য না থাকাতে বাসার বাহির কিম্বা অন্দরমহলে যাতায়াত ছিল অবাধ ও সংকোচহীন। দেশীয় মোরগের মাংসের সঙ্গে ঘন ডাল সহ সাদা ভাতের পাশাপাশি কখনো দেশীয় মাছের ঝোলের তরকারীর আয়োজনের মুল ব্যাক্তি ছিলেন বংশানুক্রমে জমিদার পরিবারের পাঁচক মুইন্যা দা। বাজার করতেন নিজ হাতে কাটাকুটি সবই নিজ দায়িত্বে সেরে নিতেন। সব শেষে আদুরে হাসিতে নরম ভাষায় ডেকে বসাতেন খাবার টেবিলে।
পুরোনো স্মৃতি গল্পের অতীত অংশ ছেডে এবার আসি নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া স্মৃতি গল্পে। যে গল্পে মিশে আছে আবেগীয় সংলাপ, নিরবে সকল অবিচার মেনে লুকায়িত ক্রোধে কষ্টের কিছু নিরব প্রকাশ। দিন বছর আর সময় গড়িয়েছে অনেক এবং অনেক। তারপরও আজো সাথীদের আলাপে উঠে আসে সেই অমানবিক ও বিভৎস চিত্র। 
তা আসুন আজ সেই গল্প আর হৃদয়ে রক্তক্ষরনে বার বার থেমে যাওয়া কষ্ট আর বেদনার উপাখ্যান শুনি বন্ধুর জবানবন্ধীতে। সেই সময়ে বন্ধু শহর ছেড়ে দেশরক্ষার দায়িত্ব পালনে দেশের প্রায় সব কয়টি সামরিক ছাউনির অস্থায়ী বাশিন্দা। ৯০ দশেকের মধ্য ভাগে কর্মস্থল থেকে ছুটিতে আসতো গ্রামের আদলে গড়ে উঠা নদী তীরের মফস্বল শহরে নিজ বাড়ির আঙ্গিনায়। পিতা মাতার সঙ্গে কুশলাদি সেরে দ্রুত এসে দাঁডালো কৈশোর আর যুবক সময়ের কাল কাটানো  আতুড় ঘর সাদৃশ্য  বাড়িতে। যেখানে আছে হাজারো স্মতির ক্যানভাসের অদৃশ্য গ্যালারির বিপুল সমাহার। 
শত বছরের কাছাকাছি সময় শহরে যে বাসাটি জেলার বিখ্যাত জমিদার পরিবারের বাসা বলে পরিচিত, সেই  বাসায় প্রবেশ মুখে মুখোমুখি হতে হলো দলিল বলে দাবীকৃত একজন হাওর পাড়ের মধ্য বয়সী সন্তানের। বাল্যবন্ধু থমকে দাঁডালেন সত্য ও বর্তমান সময়ের মুখোমুখি। এতো সবের পর ও ব্যাথিত চিত্তে দুরে দাঁডাতে হলো বাল্যবন্ধু ও সহপাঠির হাত ছাড়া হয়ে যাওয়া আদিকালের স্মৃতিময় সত্য চিত্র ও বিশ্বাসের সামনাসামনি। সামাজিক পরিচয়ে সুবাধে বাড়ির চৌহদ্দি সহ তুলসি তলা এমনকি পিছনের স্বচ্ছ জলের পুকুর পাড় অবধি  সব দেখে নিরবে দাঁড়িয়ে বন্ধু ভাবছে, ইতিহাস কি ঠিক এমনি করে বদলে যায় ? কি আশ্চর্য ? 
অনুমতি চাইলেন বাল্য স্মৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রুপজদের বাসার মুল অংশটি ঘুরে দেখার। বারান্দায় দাঁড়াতেই দীর্ঘ সময়ের স্মৃতি সেলুয়েড চালু হয়ে গেলো অজান্তে। চার পাঁশে শত শত গল্প, আড্ডা আর স্মৃতির বিচিত্র সমাহার যা চট করে শেষ হওয়ার নয়। মালিক বলে দাবীদারকে বন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি বাসার কাঠের ছাদে উঠতে পারি ? চেনা সূত্রের দাবীতে বন্ধু সিড়ি বেয়ে ছাদে উঠেই বিস্ময়ে হতবাক ও নির্বাক হয়ে গেলেন মুহুর্তে। পুরো ছাদ সবটাই শূন্য। কোথাও কিছুই নেই।এক সময় যে বাসার ছাদ ছিলো পিতল কাঁসা দিয়ে তৈরী নানা আকারের তৈজসপত্র সহ শত শত পিতল ও কাঁসার থালা বাটি আর জল রাখার কলস। পুরো ছাদ খাঁ খাঁ করছে বিকট ও নির্দয় রুপ নিয়ে। সব দেখে আর প্রচুর কষ্ট নিয়ে বন্ধুকে ফিরতে হলো নিজ বাসায়। ভাবছেন আর চেষ্টা করছেন এমন নির্দয় চিত্রের  খন্ডিত সুত্রগুলি মেলানোর।  বদল হয়ে গেলো মালিকানা।
বদল হয়ে গেলো আচার আর আয়োজনের রুটিন। এতো সহজে তা কিভাবে ঘটে গেলো। একটি পরিবারের শত বছরের ঐতিহ্য আর সামাজিক ইতিহাস বাতাসে মিশে গেলো কোন চিহ্ন না রেখেই। সিদ্ধান্ত নিলেন জানবেন সেই সময় আর কালের কাদের লোভ লালসা ও কূটচালের শিকার হয়ে বসত হারা হয়ে গেলো শতবর্ষী জমিদার পরিবার। আজ কিছুই নেই। জন নেই বান্ধব নেই দেয়ালো টাঙ্গানো শত বছরের পুরানো ছবি পর্যন্ত নেই। ফ্রেমে বাঁধানো যে ছবিতে পূর্বপুরষদের জয়ের ইতিহাস লিপিবদ্ধ ছিলো সেই সনদ পর্যন্ত আজ গায়েব। কতইনা নির্মম আর অবিশ্বাসের চিত্রনাট্য। 
বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার জবানবন্দীতে বলছি, দোস্ত কি বলবো তোমাদের, শতবর্ষী বয়সের একটি পরিবারের নিজস্ব সম্পতি একেবারে হাওয়া হয়ে যাওয়া কোন ভাবে মেনে নিতে পারিনি সেই সময়। প্রচুর কষ্ট অনুভব করবার পাশাপাশি মনে জিদ চেপে গেলো কি ভাবে পরিবারের সদস্যদের অজান্তে ঘটে গেলো এমন ঘটনা। তা বের করতেই হবে। 
সংশ্লিষ্ট পারিবারিক সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করে প্রাথমিক সূত্র বের করা গেলো দ্রুত। বাদবাকি ঘটনার পুরো বিবরন শুনে একেবারে নির্বাক হয় গেলাম। শত বছরের জমানো দামী তৈজসপত্র বেহাত হওয়ার ঘটনার মূল নায়ক তো দেখি আমারই (বন্ধু/ সহপাঠি) নিকটজন। চুপ করে বসে দীর্ঘ সময় নিয়ে ভাবতে বসলেন আমাদের বন্ধু তথন তিনি দেশের সামরিক বাহিনীতে কর্মরত। নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিলেন  ঘটনার মুল নায়ক কে পত্র দিয়ে পুরো বিষয়ের সঠিক ব্যাখ্যা চাইবেন। যেমন ভাবা তেমন এ্যাকশন। 


এখানে একটি বিষয় স্বাভাবিক ভাবে এসে যায়। যিনি চিঠি লেখার সিদ্ধান্ত নিলেন উনার হাতের লেখা ছিলো তৎকালীন সময়ের সেরা হস্তাক্ষর বা লেখার ধরন। অপেক্ষাকৃত সময়ের চেয়ে বেশ দ্রুত গুট গুট বাংলা লেখার অসাধারন ক্ষমতা ছিলো বন্ধুবরের। সেই বিখ্যাত গুট গুট ফর্মে জমিদার পরিবারের এক সদস্য যিনি আমাদের সবার বন্ধু ও সহপাঠি কে সম্বোধন করে লিখলেন দীর্ঘ একখানা পত্র বা চলতি ভাষায় চিঠি। উদ্দেশ্য ছিলো পুরো বিষয় কে তিনি নিজ চোখে কিভাবে দেখলেন আর এই  বিষয়ে আগামিতে কি করা যায় তা পরামর্শ কামনা। 


মনের কষ্ট আর নিজের আবেগ কে যথাযত নিয়ন্ত্রন করে সামরিক কর্মকর্তা বন্ধু লিখলেন দীর্ঘ একখানা পত্র। যার লাইনে লাইনে ছিলো শৈশব আর কিশোর কালের ধূলো মাখা এমনকি আদি অকৃথিম মায়া মমতায় জড়ানো পিছনে ফেলে আসা নানা রঙ আর দিনকালের চলমান চিত্র। লেখা শেষ করে বন্ধুবর স্থির হয়ে ভাবলেন সামান্য হলে বন্ধুত্বের ঋণ হয়তো শোধ করা হলো। 

 


অথচ কি আশ্চর্য  এতো আয়োজন করে লেখা পত্রের প্রাপকের ঠিকানা ছিলো ভাগ্যাহত জমিদার পরিবারের কনিষ্ট সন্তান রূপজ রঞ্জন চৌধুরী টুকুনের। আর গায়েবীয় মন্ত্রবলে দীর্ঘ চিঠি পৌছে গেলো কর্মকর্তার রক্ত সম্পর্কীয় স্বজনের হাতে। যিনি তড়িৎ এক ফোন কলে জানালেন, ভাইছাব, রুপজ দা কে  লেখা তোমার চিঠি কিন্তু কোন এক অদৃশ্য কারণে আমার হাতে এসে পৌছেছে। বাল্যবন্ধুর প্রতি তোমার ভালোবাসাকে সম্মান জানাই তবে চিঠির বাকি অংশ পাঠ করে কষ্ট পেলাম এই ভেবে তোমাকে আমি আপন ভাবলেও তুমি আমাকে ভুল বুঝলে। বাড়ি এলে তোমার সঙ্গে অবশ্যই দেখা করবো।

উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার