প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট, ২০২৬ ১৫:২৭
ভূমিকা: বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হাওর এলাকা তার অনন্য ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, জলাভূমি বাস্তুতন্ত্র (Wetland Ecosystem) এবং চরম বন্যাপ্রবণতার জন্য এক পৃথক পরিচয়ে চিহ্নিত। প্রায় ৪৭টি প্রধান হাওর এবং হাজার হাজার ছোট-বড় বিল নিয়ে গঠিত এই নিম্নাঞ্চল বছরের প্রায় ৬ মাসাধিককাল পানির নিচে থাকে। প্রাক-বর্ষার পাহাড়ি ঢল (Flash Flood) এবং বর্ষাকালের দীর্ঘস্থায়ী জলজট হাওরাঞ্চলের কৃষি, অবকাঠামো ও আর্থ-সামাজিক জীবনযাত্রাকে প্রকারান্তরে প্রতিনিয়ত বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রাখে আর বছর জুড়ে এর সামগ্রিক প্রতিক্রিয়াজাত ধকল সইতে হয় হাওরবাসীকে।
তবে হাওরাঞ্চলের এই করুণ পরিণতি কেবল প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়ার ফল নয়; এর পেছনে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদের পরিকল্পনায় দীর্ঘদিনের ভুল উন্নয়ননীতি ও ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধাস্তের প্রভাব। এই অঞ্চলের ভূ-গঠন প্রক্রিয়া ও প্লাবন ব্যবস্থাকে অনুধাবন না করে "উন্নয়ন" ও "বন্যা নিয়ন্ত্রণ"-এর নামে একের পর এক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা ও লগ্নি পুঁজির স্বার্থে গৃহীত এসব প্রকল্প শুরু থেকেই গণবিরোধী রূপ ধারণ করেছে। বিশেষ করে ১৯৫০-এর দশকে জাতিসংঘ গঠিত ‘ক্রুগ মিশন’-এর সুপারিশে পানি ব্যবস্থাপনার যে কাঠামো তৈরি হয় এবং যার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প গড়ে ওঠে তা প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিপথকে রুদ্ধ করেছে। এছাড়াও বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমলে রেলপথ নির্মাণ, সীমান্তে আবাধে গাছপালা নিধন ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভারত কর্তৃক ৫৪টি নদীতে বাঁধ, গ্রোয়েন, ড্যাম নির্মাণ করে শুস্ক মৌসুমে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহে ব্যঘাত ও নাব্যসংকট সৃষ্টি হাওরাঞ্চেলের জলাবদ্ধতা ও বন্যা সমস্যার অন্যতম কারণ বলে অভিজ্ঞ মহলের মতামত থাকলেও বিগত কোন সরকারই এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে বিজ্ঞজনেরা মনে করেন ।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের সাথে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় পরিবেশ ও পানি প্রবাহকে উপেক্ষা করে নির্মিত অল-ওয়েদার রোড, অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ এবং অপ্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো। স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও হাওরের সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রকে বাদ দিয়ে যে তথাকথিত উন্নয়ন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা আজ পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরি করেছে।
সংক্ষিপ্ত পরিসরে এই প্রবন্ধ হাওরাঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতা, ক্রুগ মিশন পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত উন্নয়নের নামে গৃহীত হাওরবাসীর স¦ার্থ রিরোধী পরিকল্পনাগুলোর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা, এবং অবৈজ্ঞানিক অবকাঠামোর ফলে সৃষ্ট সংকটের অনুসন্ধান করার ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র । পাশাপাশি হাওর রক্ষা, পানি প্রবাহকে স্বাভাবিক রাখা এবং এই অঞ্চলকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব সমাধান ও সুনির্দিষ্ট কিছু গণদাবি তুলে ধরাই এই প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য।
কেমন ছিল প্রাচীন কালে হাওরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক জীবন প্রণালী ?
(ক) হাওরাঞ্চলের বিপর্যয়কর অবস্থা জানতে হলে তার আগে কেমন ছিল প্রাচীনকালে হাওরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক জীবন প্রণালী ? এই জানার আবশ্যকতা থেকেই শুরু করতে হবে । প্রাচীনকালে হাওরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক জীবন প্রণালী ছিল প্রকৃতির ঋতুচক্রের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও জলবায়ুর কারণে হাওরের মানুষের জীবন ছিল সাধারণ সমতলভূমির কৃষকদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বছরের অর্ধেক সময় পানির নিচে এবং বাকি অর্ধেক সময় শুকনো জমি; এই দুই ভিন্ন রূপের সাথেই গড়ে উঠেছিল তাদের কৃষি ও জীবন সংগ্রাম।
হাওরে ঐতিহ্যবাহী ধান কাটার উৎসব : প্রাচীন হাওরাঞ্চলে মূলত দুই ধরনের ঋতুভিত্তিক জীবন দেখা যেত- শীত ও বসন্তকাল (কৃষির প্রধান সময়) । কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে যখন হাওরের পানি শুকাতে শুরু করত, তখন জমি চাষযোগ্য হতো। কৃষকেরা মূলত বোরা (বোরো) ধান এবং স্থানীয় জাতের গভীর পানির ধান চাষ করতেন। এ ছাড়া সরিষা, খেসারি, কলাই ও নানা পলিভিত্তিক রবিশস্য উৎপাদন করা হতো।
বর্ষাকাল (মৎস্য ও নৌ-নির্ভর জীবন): জ্যৈষ্ঠ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত বিশাল হাওর এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়ে সমুদ্রে রূপ নিত। তখন কৃষি কাজ বন্ধ থাকত এবং কৃষকেরা বিকল্প হিসেবে মাছ ধরা ও নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
১. প্রাচীন কৃষি পদ্ধতি ও প্রযুক্তি
প্রাচীন হাওরে আধুনিক প্রযুক্তির কোনো ছোঁয়া ছিল না। প্রকৃতির উপর নির্ভর করেই সম্পূর্ণ চাষাবাদ চলত। জমি প্রস্তুতি পলিময় নরম মাটিতে কাঠের লাঙল ও বলদ দিয়ে চাষ দেওয়া হতো। নদী ও বিলের পলি জমে জমি অত্যন্ত উর্বর থাকত, তাই সার ব্যবহারের প্রয়োজন হতো না। সেচের জন্য প্রাকৃতিকভাবে জমে থাকা কাদা-পানি বা 'দোন' ও 'সেঁউতি' (বাঁশ ও কাঠের তৈরি প্রাচীন সেচযন্ত্র) ব্যবহার করা হতো। ধানের জাত ছিলো- রাতা, টেপি, হাসিকলমি, এবং গভীর পানিতে বেড়ে উঠতে পারে এমন দীর্ঘকালের দেশি ধানের প্রচলন ছিল। হাওরের দ্বীপসদৃস গ্রাম ও নৌ-জীবন. হাটি বা কান্দাভিত্তিক বসতি বিদ্যমান ছিলো। বন্যা ও ঢল থেকে বাঁচতে উঁচু ঢিবি বা 'কান্দা'র ওপর ভিটি তৈরি করে গ্রাম গড়ে উঠত, যাকে স্থানীয় ভাষায় 'হাটি' বলা হতো।
আফাল ও হিজল-করচের প্রতিরক্ষা: বর্ষায় প্রবল ঢেউ (যাকে 'আফাল' বলা হয়) থেকে মাটির ঘরবাড়ি রক্ষা করতে গ্রামের চারপাশে হিজল, করচ ও ছন গাছের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করা হতো। ধান কাটার মৌসুমে আকস্মিক অকালবন্যা (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) থেকে ফসল বাঁচাতে সমস্ত গ্রামের মানুষ একজোট হয়ে কাজ করত। ধান কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে আসা দাওয়ালদের (শ্রমিক) আশ্রয় দেওয়া হতো।
সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্য: হাওরের কৃষি জীবনের সাথে জড়িয়ে ছিল সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি। ধামাইল ও জারি-সারি গান: ধান রোপা, ধান কাটা এবং নৌকা বাইচের সময় কৃষকেরা সারিসারি হয়ে গান গাইতেন।
খাদ্যাভ্যাস: শুকনা মৌসুমে নতুন বোরো ধানের ভাত, হাওরের তাজা মাছ ও শুঁটকি ছিল মূল খাদ্য। বর্ষাকালে হাঁস পালন এবং সংরক্ষিত খাদ্য (যেমন- শুঁটকি, আলু, সিদল) দিয়ে দিন পার করা হতো।
প্রাচীন হাওরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক সমাজ ছিল প্রকৃতি-নির্ভর, অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সহমর্মিতায় গড়ে ওঠা এক অনন্য জীবনধারা। এই ছিল হাওরবাসীর জীবন প্রণালী ।
প্রাচীনকালে হাওরাঞ্চলে আধুনিক প্রকৌশল বা সরকারি মেগা-প্রকল্প ছিল না। ফলে ভারতের পাহাড়ি ঢল থেকে ফসল বাঁচাতে হাওরের কৃষকেরা প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে দেশজ জ্ঞান, যৌথ শ্রম ও প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতেন।
প্রাচীন হাওরবাসী অকালবন্যা রোধে যেসব প্রাকৃতিক ও দেশজ কৌশল ব্যবহার করতেন, তা তুলে ধরা হলো:
১.'জঙ্গল' ও মাটির অস্থায়ী ডুবন্ত বাঁধ : জঙ্গল বন্ধন (Jangal): চৈত্র বা বৈশাখ মাসে পাহাড়ি ঢল আসার আগে কৃষকেরা খাল ও নদীর ছোট ছোট শাখা মুখে মাটি, বাঁশ এবং গাছের ডালপালা দিয়ে অস্থায়ী বাঁধ বা "জঙ্গল" নির্মাণ করতেন। এই বাঁধের মূল উদ্দেশ্য ছিল বন্যাকে স্থায়ীভাবে আটকানো নয়; বরং বৈশাখ মাসে বোরো ধান কাটার জন্য মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিন সময় বাড়িয়ে নেওয়া। ধান কাটা শেষ হয়ে গেলে বর্ষার শুরুতে এই ডুবন্ত বাঁধগুলো পানির নিচে তলিয়ে যেত। হিজল, করচ ও বাঘনা গাছের তরঙ্গ প্রতিরোধক বলয় হাওরে অকালবন্যার সাথে আরেকটি বড় বিপদ ছিল 'আফাল' বা বাতাসের প্রভাবে ওঠা প্রচণ্ড ঢেউ। এই ঢেউ মাটি ও বাঁধ ধসিয়ে দিত। সোয়াম্প ফরেস্ট (Swamp Forest): হাওরের খাল ও নদী তীর ঘেঁষে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা হিজল, করচ, বরুন ও বাঘনা গাছের জঙ্গল তরঙ্গের তীব্রতা কমিয়ে দিত। এই গাছগুলোর শিকড় নদীর পাড়ের মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখত, ফলে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে পার ভেঙে সহজে জমিতে পানি ঢুকতে পারত না।
দেশি ধানের জাত নির্বাচন ও জিনগত অভিযোজন: বাঁধ ছাড়াও কৌশলগতভাবে ঢলের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে কৃষকেরা বিশেষ জাতের ধান বেছে নিতেন। গভীর পানির ধান (Deep Water Rice): কৃষকেরা 'গোদা জালি', 'লাখাই' বা 'টিপিগুল'-এর মতো প্রাচীন দেশি জাতের ধান রোপণ করতেন। বৈশিষ্ট্য: এই ধানের গাছগুলোর কান্ড পানির বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতিদিন কয়েক ইঞ্চি করে বাড়তে পারত। ফলে হঠাৎ পানি জমে গেলেও ধানের শীষ পানির ওপরেই ভেসে থাকত এবং ফসল নষ্ট হতো না। প্রাকৃতিক 'ক্যানাল' ও জলাভূমির পানি ধারণক্ষমতা ব্যবহার প্রাচীন হাওরের বাস্তুতন্ত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। পানির স্বাভাবিক গতিকে বাধা না দিয়ে তা নির্দিষ্ট দিকে চালিত করা হতো।
কান্দা (Kanda) ও বিলের ভারসাম্য: হাওরের উঁচু আইল বা 'কান্দা'গুলোকে প্রাকৃতিকভাবে বাঁধ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। পানি যখন প্রথম আসত, তখন তা সরাসরি ধানক্ষেতে না গিয়ে পাশাপাশি থাকা ছোট ছোট বিল ও নিচু ডোবায় জমা হতো। এটি একপ্রকার প্রাকৃতিক পানির রিজার্ভার বা বাফার হিসেবে কাজ করত।
প্রাকৃতিক উপকরণের চেয়েও বড় শক্তি ছিল মানুষের একতা: অকালবন্যার সংকেত দেখা দিলে (নদীর পানি ঘোলা হওয়া বা পাহাড়ি মেঘ দেখে) সমস্ত গ্রামের মানুষ 'গাংঘের' বা স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে একজোট হতো।
তারা রাতের মধ্যে বাঁশ, ছন, খড় ও বস্তাবন্দী মাটি দিয়ে নদী ও খালের ঝুঁকিপূর্ণ মুখগুলো বন্ধ করে দিত।
সংক্ষেপে প্রাচীন হাওরবাসী প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ না করে প্রকৃতির উপাদানেই সময়কে জয় করার কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন। বাঁশ-মাটির অস্থায়ী জঙ্গল বাঁধ, হিজল-করচের প্রতিরক্ষা দেয়াল এবং পানির সাথে বেড়ে ওঠা বিশেষ ধানের জাতই ছিল তাদের প্রধান ঢাল। ঐতিহাসিকদের বর্ণনায়ও এর প্রমাণ পাওয়া যায় ।
প্রাচীন নদী ও কৃষি ব্যবস্থার ঐতিহাসিক আলোকপাত:
১. ঐতিহাসিক নিহাররঞ্জন রায় তাঁর বাঙালীর ইতিহাস আদি পর্ব গ্রন্থে নদী ও বাংলার সম্পর্কের চিত্র তুলে ধরেছেন:
১. নদী ও বাঙলার ইতিহাস: বাঙলার ভৌগোলিক রূপ এবং ইতিহাস রচনায় নদনদীই প্রধান স্থপতি। অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে,
(..."বাঙলার ইতিহাস রচনা করিয়াছে বাঙলার ছোট-বড় অসংখ্য নদনদী। এই নদনদীগুলিই বাঙলার প্রাণ; ইহারাই বাঙলাকে গড়িয়াছে, বাঙলার আকৃতি-প্রকৃতি নির্ণয় করিয়াছে যুগে যুগে, এখনও করিতেছে।...") (বাঙ্গালীর ইতিহাস আদি পর্ব,নিহার রঞ্জন রায়,অষ্টম সংস্করণ ১৪২০বঙ্গাব্দ, প্রকাশক: সুধাংশু শেখর দে, ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট,কলকাতা, পৃষ্টা নং-৭৩ )
নদীগুলো পলি বহন করে আনায় বাঙলার ভূমি কোমল ও নবসৃষ্ট। নদীর এই পলি সঞ্চয়ের ফলেই শস্য-শ্যামল রূপ গঠিত হয়েছে:
("এইসব নদনদী উচ্চতর ভূমি হইতে প্রচুর পলি বহন করিয়া আনিয়া বঙ্গে ব-দ্বীপের নিম্নভূমিগুলি গড়িয়াছে, এখনও সমানে গড়িতেছে; সেই হেতু বদ্বীপ-বঙ্গের ভূমি কোমল, নরম ও কমনীয়...") (প্রাগুক্ত পৃষ্টা নং-৭৩)।
২. নদনদীর আশীর্বাদ ও অভিশাপের দ্বৈত রূপ
নদী যেমন জীবনদাত্রী ও পলি ছড়িয়ে মাটিকে উর্বর করে, তেমনই বন্যা ও খাত পরিবর্তনের মাধ্যমে ধ্বংসও ডেকে আনে:
(..."এইসব নদনদী আশীর্বাদ; এবং প্রকৃতির তাড়নায়, মানুষের অবহেলায় কখনও কখনও বোধহয় বাঙলার অতিশাপও।"...) (প্রাগুক্ত পৃষ্টা নং-৭৩)।
নদীর বিধ্বংসী ও সৃষ্টিশীল ভূমিকার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এভাবে:
(..."এই সহসা খাত পরিবর্তনে কত সুরম্য নগর, কত বাজার-বন্দর, কত বৃক্ষশ্যামল গ্রাম, শস্যশ্যামল প্রান্তর, কত মঠ ও মন্দির, মানুষের কত কীর্তি ধ্বংস করিয়াছে, আবার নূতন করিয়া সৃষ্টি করিয়াছে...)"প্রাগুক্ত পৃষ্টা নং-৭৩
মানুষ ভালোবেসে এবং ভয়ে নদীকে নানা নামে ডেকেছে:
(..."বাঙালী তাই এই নদীগুলিকে ভয়ভক্তি যেমন করিয়াছে, ভালোও তেমনই বাসিয়াছে; রাক্ষসী কীর্তিনাশা বলিয়া গাল যেমন দিয়াছে, তেমনই ভালোবাসিয়া নাম দিয়াছে ইছামতী, ময়ূরাক্ষী, কপোতাক্ষ (কপোতাক্ষী), চূর্ণী, রূপনারায়ণ...") (প্রাগুক্ত পৃষ্টা নং-৭৩)
৩. দূরদৃষ্টিহীন মানুষের যথেচ্ছাচার ও প্রতিশোধ
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রোধ এবং মানুষের অনবিবেচনাসূলভ আচরণের কারণে নদী মারাত্মক প্রতিশোধ নেয়:
(..."দূরদৃষ্টিহীন মানুষের দুর্বুদ্ধি সাময়িক লোভ ও লাভের হিসাব বড় করিয়া দেখিতে গিয়া জল-নিকাশের এবং প্রবাহের এইসব স্বাভাবিক পথগুলির সঙ্গে যথেচ্ছচারের ত্রুটি করে নাই... তাহার ফলে এইসব নদনদী বন্যায় মহামারীতে দেশকে ক্ষণে ক্ষণে উজাড় করিয়া দিয়া... মানুষের উপর প্রতিশোধ লইতে ত্রুটি করে নাই।"...) (প্রাগুক্ত পৃষ্টা নং-৭৩)
৪. নদীপথের পরিবর্তন ও ঐতিহাসিক প্রমাণ
বাঙলার নদীপথ স্থির নয়, শতাব্দী ধরে নদীর খাত পরিবর্তন, নতুন নদীর জন্ম ও পুরাতন নদীর মৃত্যু ঘটেছে:
(..."বাঙলার ভূ-প্রকৃতিতে নদীর খাত যুগে যুগে পরিবর্তিত হওয়া, পুরাতন নদী মজিয়া মরিয়া যাওয়া, নূতন নদীর সৃষ্টি কিছুই অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়।"...) (প্রাগুক্ত পৃষ্টা নং-৭৩)।
৪. এই পরিবর্তনের ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন দেশি-বিদেশি মানচিত্র এবং সাহিত্য-বিবরণীতে:
(..."ষোড়শ ও অষ্টাদশ শতকের মধ্যে Jao de Barros (১৫৫০), Gastaldi (১৫৬১)... প্রভৃতি পর্তুগীজ, ডাচ্ ও ইংরেজ বণিক, রাজকর্মচারী ও পণ্ডিতেরা বাঙলা ও ভারতবর্ষের অনেকগুলি নকশা রচনা করিয়াছিলেন। মধ্যযুগে বাঙলার নদনদী ও জনপদগুলির ক্রমপরিবর্তমান আকৃতি, পুরাতন নদীর মৃত্যু, নূতন নদীর জন্ম সমস্তই এই নকশাগুলিতে ধরিতে পারা যায়।"...) (প্রাগুক্ত পৃষ্টা নং-৭৪)
(...পাশাপাশি ইবনে বতুতা, রালফ ফিচের ভ্রমণকাহিনি এবং 'মনসামঙ্গল', 'চণ্ডীমঙ্গল'-এর মতো প্রাচীন সাহিত্য থেকেও নদীপথের এই পরিবর্তনের স্পষ্ট ধারণা মেলে।...) (প্রাগুক্ত পৃষ্টা নং-৭৪)।
ঐতিহাসিক এই গ্রন্থটিতে স্পষ্ট যে, "এইসব নদনদীর ইতিহাসই বাঙলার ইতিহাস।" নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে মানুষের কৃষি, বসতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাহিত্য-সংস্কৃতি। নদী বাঙলাকে একই সঙ্গে ধন-ধান্যে পূর্ণ করেছে, আবার অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপের কারণে মহামারী ও বন্যার ধ্বংসলীলাও উপহার দিয়েছে।
২. অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির 'শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত'(পূর্বাংশ)
ঐতিহাসিক অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে হাওরাঞ্চলের কৃষি ও মৎস্যসম্পদের বিবরণ দিয়েছেন:
(“শ্রীহট্ট বৃষ্টি-মাতৃক দেশ। বৃষ্টির জলই এখানে কৃষি কার্য্যরে প্রচুর হয় । শ্রীহট্ট জিলার ভূমিতে সার দেওয়ার প্রয়োজন হয় না । কোন কোন স্থলে চারা ভূমিতে ও রবিশস্যের জন্য সামান্যরূপে সার ব্যবহারের প্রচলন আছে । একমাত্র গোবরই সাররূপে ব্যবহৃত হইয়া থােেক” ।) (শ্রী হট্টের ইতিবৃত্ত পুর্বাংশ,অচ্যুত চরণ চৌধূরী তত্ত্বনিধি, প্রথম প্রকাশ: ১৯১০, শ্রী মৈত্রি কর্ত ৃক১৪৯,ক্যানাল ট্রাষ্ট, শ্রী ভূমি কলকাতা থেকে প্রকাশিত,পৃষ্ঠা নং-৪১)
শ্রী অচ্যুত চরণ চৌধূরী হাওরাঞ্চলের মৎস্যাদি বিবরণ দিতে গিয়া বলেন:
(“মৎস্যের মধ্যে রউ (রোহিত), বাউ (কাতলা), চিতল, বোয়াল, ঘাঘট, শৌল প্রভৃতি প্রধান ও সর্বত্রই প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।
পার্ব্বত্য নদীর জংলাংশে মহাশৌল ও পালান নামে দুই জাতীয় মৎস্য মিলে। মহাশৌলের আকার দীর্ঘাকৃতি রোহিতের ন্যায়, এবং খাইতে সুস্বাদু ও মৃদু (মোলায়েম); আসামের শিক্ষাবিভাগের ডিরেক্টর উইলসন সাহেব, লাউড়ের পণাতীর্থে এক সময় একটা মহাশৌল ধৃত করেন, উহা ওজনে একমণ পঁয়ত্রিশ সের হইয়াছিল।
শৌল জাতীয় পীপলা নামক মৎস্যও পাহাড়ের নদীতে পাওয়া যায়।
সুরমা, কুশিয়ারা, বিবিয়ানা, ধলেশ্বরী প্রভৃতি নদীতে প্রতি বৎসর অনেক ইলিশ মৎস্য ধৃত হয়। তদ্ব্যতীত ঘনিয়া, গজার, শৌল, কানলা, পাবিয়া, বাচ্চা, বাইন, মাগুর, কই, চেঙ্গ, চিংড়ি (ইছা), রাণী, টেংরা, পুঁটি প্রভৃতি বহু প্রকার মৎস্য পাওয়া যায়।
ঘাঘট জাতীয় "বাঘমাছ" আকারে অতি বৃহৎ হইয়া থাকে। আট জনের কম লোকে বহন করিয়া নিতে পারে না, এরূপ বৃহৎ আকারের বাঘমাছও ধৃত হয়। বাঘমাছ, গজার, নানিন্দ ও শিলং প্রভৃতি মৎস্য হিন্দুগণ আহার করেন না।
সুনামগঞ্জ সবডিভিশনেই প্রতি বৎসর সর্ব্বাপেক্ষা অধিক মৎস্য ধৃত হয়। মৎস্য ব্যতীত প্রতিবর্ষে অনেক কচ্ছপ ও কমট ধৃত হইয়া থাকে। "বাস্কা" নামীয় কচ্ছপের আদর অধিক। মোসলমানগণ কচ্ছপ স্পর্শও করে না।
সব সময় অনেক বৃহৎ মৎস্যের সংবাদ শুনা যায়। ১৯০৩ খৃষ্টাব্দের আগস্ট মাসে ইনায়েতগঞ্জের নিকট কাতিয়া গ্রামে ১৩/১৪ বৎসরের একটি বালক হাওরের জলে ডুব দিয়া ঘাস কাটিয়া ভাসাইয়া দিতেছিল; তদবস্থায় এক বৃহৎ বোয়ালমাছ বালকের মস্তক হইতে কটি পর্য্যন্ত গ্রাস করিয়াছিল; পরদিন উভয়েরই মৃতদেহ ভাসিয়া উঠিয়াছিল।...) ( প্রাগুক্ত পৃষ্ঠা নং-৭২ )।
উপরে বিধৃত ঐতিহ্যবাহী হাওরাঞ্চলের করুণ পরিণতি বুঝতে হলে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন শোষণের ইতিহাস থেকে শুরু করে তথাকাথিত উন্নয়নের নামে সাম্রাজ্যবাদের পরিকল্পনায় লগ্নী পুঁজির স্বার্থে গৃহিত গণরিরোধী উন্নয়ন পরিকল্পনার স্বরুপ সন্ধান করতে হবে
(খ) ঔপনিবেশিক রাজস্বনীতি ও কৃষক প্রতিরোধ
ঔপনিবেশিক শাসনামলে (১৭৫৭-১৯৪৭) বাংলার সমাজ, অর্থনীতি (উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্ক) এবং কৃষক চেতনার রূপটি পরিবর্তিত হতে থাকে , ঔপনিবেশিক শাসনামলে সমতল ও হাওরাঞ্চলে ভিন্ন হলেও, শোষণের তীব্রতা ছিল সর্বত্র সমান। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার যে ভূ-রাজস্ব নীতি চালু করে, তার ফলে সমগ্র বাংলায় তৈরি হয় এক নির্মম জমিদারি ও মহাজনি শোষণের শৃঙ্খল।
হাওরাঞ্চলের বৈচিত্র্যময় জীবন ও সংগ্রাম
বৃহত্তর সিলেট, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার নিম্নভূমি বা হাওরাঞ্চলের জীবনযাত্রা ছিল প্রাকৃতিক দুর্গমতায় ঘেরা। বর্ষায় মাইলের পর মাইল থৈ থৈ পানি এবং শীতকালের শুষ্ক পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল এখানকার ঋতুভিত্তিক অর্থনীতি।
কৃষি ও মৎস্য: শীতে বোনা আমন ও বোরো ধান ছিল প্রধান ফসল। তাছাড়া 'জলমহাল' ব্যবস্থার কারণে ইজারাদার ও মহাজনদের আধিপত্যে সাধারণ মৎস্যজীবীরা নিজ জলাশয়ে অধিকার হারিয়ে দাসে পরিণত হন।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ: বর্ষার বেকার মৌসুমে 'দাদন' (চড়া সুদের ঋণ) এবং বংশানুক্রমিক 'কমিয়া' (দাসত্ব রূপ) প্রথা হাওরবাসীকে চিরতরে ঋণে পিষ্ট করে রাখত।
বসতি ও সংস্কৃতি: ঢেউ বা 'আফাল' থেকে বাঁচতে 'হাটি' বা 'কান্দায়' প্রতিরক্ষা গড়ে মানুষ বসবাস করত।
চরম সংগ্রামের মাঝেই জন্ম নেয় ভাটিয়ালি, মারফতি গান এবং হাসন রাজা, রাধারমণ দত্তের মতো মরমী সাধকদের কালজয়ী সৃষ্টি।
কৃষক বিদ্রোহ: শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ :
হাওরাঞ্চলের মতো সমতলেও কৃষকরা যখন জমিদারি শোষণ, অতিরিক্ত খাজনা এবং নীলকরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, তখন শুরু হয় ঐতিহাসিক একাধিক আন্দোলন ও বিদ্রোহ।
১. ফকির-সন্ন্যাসী ও রংপুর বিদ্রোহ (১৭৬০-১৭৮৩): কোম্পানি শাসনের রাজস্ব শোষণের বিরুদ্ধে মজনু শাহ, ভবানী পাঠক এবং নূরুলউদ্দীনের নেতৃত্বে প্রাথমিক গেরিলা প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
২. তিতুমীরের আন্দোলন ও ফরায়েজী আন্দোলন (১৮৩১-১৮৪৭): ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের পাশাপাশি জমিদারদের বেআইনি কর এবং নীলকরদের বিরুদ্ধে সৈয়দ মীর নিসার আলী (তিতুমীর) ও দুদু মিঞা কৃষকদের সংঘবদ্ধ করেন।
৩. সাঁওতাল ও নীল বিদ্রোহ (১৮৫৫-১৮৬০): সাঁওতালদের আদিবাসী কৃষক অসন্তোষ এবং খাদ্যশস্যের বদলে জোরপূর্বক নীল চাষ করানোর বিরুদ্ধে কৃষকদের প্রতিরোধ ব্রিটিশ প্রশাসনকে কাঁপিয়ে দেয়।
৪. পাবনা ও তেভাগা আন্দোলন (১৮৭২-১৯৪৭): অন্যায্য খাজনা ও বর্গাচাষীদের অধিকার রক্ষার তাগিদে ঈশানচন্দ্র রায় ও পরবর্তীতে ইলা মিত্রের মতো নেতাদের নেতৃত্বে কৃষক আন্দোলন চূড়ান্তে পৌঁছায়, যার ফলে 'বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন (১৮৮৫)' এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে।
উপসংহার : প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা হাওরের মানুষ কিংবা সমতলের কৃষকরা কৃষিভিত্তিক এই জনপদের প্রতিটি মানুষই ছিল ব্রিটিশ রাজস্বনীতির প্রত্যক্ষ শিকার। তবে অন্যায়ের মুখে তারা কেবল নিরব প্রজা হয়ে থাকেনি; দফায় দফায় বিদ্রোহ করে জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গেছে।
কাঠামোগত সহিংসতা; ক্রুগ মিশন পরিকল্পনা এবং সবুজ বিপ্লব ও ডেল্টা প্ল্যান ২১০০; যা জানা জরুরী :-
হাওরাঞ্চলের বন্যা সমস্যার কারণ ও এর বিপর্যয় বুঝতে হলে কাঠামোগত সহিংসতার সম্পর্কে কিঞ্চিত ধারণা থাকা আবশ্যক, লেখক আলতাফ পারভেজ , ধান চাষের প্রতিবেদন গ্রন্থে বলেছেন ঃ (...“কাঠামোগত সহিংসতার ধরন হয়ে থাকে পদ্ধতিগত। এটা একটা 'ব্যবস্থা' হিসেবে জনগণের নির্দিষ্ট অংশের ক্ষতি করে চলে। সেকারণেই তা 'সহিংসতা'। এই সহিংসতার সমর্থন আসতে থাকে বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সংস্থা থেকে পদ্ধতিগতভাবে। যে কারণে একে একটা 'কাঠামোগত' ক্ষতি বলা হচ্ছে। অনেক সময়ই এরূপ সহিংসতা স্বতন্ত্র ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত হয় না। যে কারণে এর কোন শারীরীক ছবি উপস্থিত নাও থাকতে পারে। বরং এর উৎস ও প্রক্রিয়া চলতে থাকে অদৃশ্য। সেভাবেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বা সমাজকে ক্ষত-বিক্ষত করে তা। এই ক্ষত-বিক্ষত করার ঘটনাটি ঘটে চলে একটা প্রক্রিয়া আকারে; সামাজিক পরিস্থিতি আকারে; ঐতিহাসিক পরম্পরা আকারে। কাঠামোগত সহিংসতার ঘটনাবলি তাই অনেক সময়ই অনালোকিত, অনালোচিত ও অনির্দিষ্ট থেকে যায়। অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্তরা একে 'স্বাভাবিক' কিংবা ঐতিহাসিক 'নিয়তি' হিসেবে মেনে নেয়। কারণ, সেভাবেই তাদের মেনে নিতে শেখানো হয়। তারা ওভাবে 'অভ্যস্ত হয়ে যায়। অথচ এর ফলে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে 'অসম নাগরিক অভিজ্ঞতা' (unequal experience of citizenship)-এর শিকার হতে হয়। নাগরিকদের মাঝে অসমতা এক ধরনের কাঠামোগত বঞ্চনা।
কাঠামোগত সহিংসতায় রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতিনিধি হিসেবে ব্যক্তিরা সক্রিয় থাকলেও তাদের ব্যক্তিগতভাবে সহিংসতার জন্য দায়ী করা যায় না। শারীরী ও আচরণগত সহিংসতা যেখানে প্রকাশ্যে সরাসরি নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মৃত্যুর কারণ হয় কাঠামোগত সহিংসতা সেখানে অদৃশ্যভাবে বিরাট জনগোষ্ঠীর অপরিণত বয়সে মৃত্যু বা শারীরিক ক্ষতির কারণ হয়। আগেই বলা হয়েছে, এটা ঘটে 'সামাজিক ব্যবস্থাপনা'র অংশ হিসেবে। কাঠামোগত সহিংসতার জন্য ঐ 'ব্যবস্থাপনা'কে সাজিয়ে নেয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রশাসন। ঐ ব্যবস্থাপনার ফলই হচ্ছে সহিংসতা।”... (ধান চাষের প্রতিবেদন,আলতাফ পারভেজ, প্রকাশক-ঐতিহ, প্রকাশকাল ফাল্গুন ১৪২৭, মার্চ২০২১, পৃষ্ঠা নং ১৪)।
(ক) ক্রুগ মিশন (Krug Mission): প্রেক্ষাপট, প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও সীমাবদ্ধতা :-
বন্যা সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে গঠিত বড় ধরণের পরিকল্পনা থেকে প্রথমেই গঠিত হয় ক্রুগ মিশন পরিকল্পনা । যেহেতেু এই মিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী পোল্ডাল পদ্ধতি অনুসরণ করে বাঁধ, স্লুইসগেট নির্মাণের ফলেও রোধ করা যায়নি বন্যার প্রকোপ, উল্টো কৃষক জনগণ জমি ভিটা হারিয়ে ভূমিহীনে পরিণত হয়ে শহরে পাড়ি জমিয়ে অনিশ্চিৎ জীবন যাপন করছে; তা জানতে হলে ক্রুগ মিশন পরিকল্পনার ময়নাতদন্ত থেকে শুরু করে উন্নয়নের নামে গৃহিত প্রতিটি বড় পকিল্পনার পর্যালোচনা আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে । শুরু করা যাক ক্রুগ মিশন পরিকল্পনা থেকে ।
১৯৫৪, ১৯৫৫ এবং ১৯৫৬ সালে পরপর তিনটি ভয়াবহ বন্যায় তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) চরম ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এই সংকট মোকাবেলায় এবং পানিসম্পদের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে ১৯৫৬ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে একটি বিশেষ কারিগরি মিশন গঠিত হয়। আমেরিকার 'টেনিসি ভ্যালি অথরিটি' -এর প্রাক্তন প্রধান জুলিয়াস অ্যালবার্ট ক্রুগ
-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই দলটি 'ক্রুগ মিশন' নামে পরিচিতি লাভ করে। মিশনটি ১৯৫৭ সালে তাদের বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
মূল সুপারিশ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব
ক্রুগ মিশনের সুপারিশসমূহ বাংলাদেশের পানিসম্পদ ও নদী ব্যবস্থাপনায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনে। স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা গঠন: প্রাদেশিক সরকারের সেচ বিভাগ বিলুপ্ত করে পানি ও বিদ্যুৎ খাতের সমন্বিত উন্নয়নের জন্য একটি স্বাধীন সংস্থা গঠনের প্রস্তাব করা হয়। এর প্রত্যক্ষ ফলে ১৯৫৯ সালে 'ইস্ট পাকিস্তান ওয়াটার অ্যান্ড পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট অথরিটি' (EPWAPDA) গঠিত হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB) ও বিপিডিবি (BPDB)-তে রূপান্তরিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ।
অবকাঠামো ও হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভে: নদী তীরবর্তী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, স্লুইসগেট এবং ড্রেনেজ রেগুলেটর নির্মাণের পাশাপাশি নদীর প্রবৃত্তি ও পলি সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহের তাগিদ দেওয়া হয়।
১৯৬৪ সালের মাস্টার প্ল্যান: এই মিশনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৫-এর দশকের শুরুতে দীর্ঘমেয়াদী মাস্টার প্ল্যান তৈরি হয়, যার অধীনে উপকূলীয় ও হাওরাঞ্চলে বেড়িবাঁধসহ হাজার হাজার কিলোমিটার বাঁধ নির্মিত হয়।
ব্যর্থতা ও পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা
প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করলেও, ক্রুগ মিশনের নীতি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি। এর প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ভৌগোলিক বাস্তবতার তোয়াক্কা না করা: আমেরিকার পাহাড়ি নদী ব্যবস্থাপনার (TVA) মেগা-ইনফ্রাস্ট্রাকচার মডেল বাংলাদেশের মতো সক্রিয় বদ্বীপে প্রয়োগ করা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। ফলে নদীতে পলি জমা বেড়ে নদীতলদেশ ভরাট হয়ে যায় এবং বাঁধের ভেতরে স্থায়ী জলাবদ্ধতা (Waterlogging) দেখা দেয়।
২. উজানের ভূমিকা ও আঞ্চলিক রাজনীতি উপেক্ষা: গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার মাত্র ৭-৮% অংশ বাংলাদেশে হলেও, উজানের দেশ ভারতের সঙ্গে ন্যায্যতার ভিত্তিতে কোনো আঞ্চলিক বা সমন্বিত অববাহিকাভিত্তিক (Basin-wide) পরিকল্পনা ছাড়া কেবল দেশের সীমানার ভেতরে বাঁধ তৈরির সুপারিশ করা হয়েছিল।
৩. কঠিন অবকাঠামোর ওপর অতি-নির্ভরতা: নদী খনন বা স্বাভাবিক বন্যাপ্রবাহ রক্ষার প্রাক-প্রাকৃতিক উপায়ের বদলে কেবল বাঁধ, পোল্ডার ও রেগুলেটর ইত্যাদি ‘হার্ড স্ট্রাকচার’-এর ওপর বেশি নজর দেওয়া হয়েছিল।
৪. হাইড্রোলজিক্যাল তথ্যের ঘাটতি ও রাজনৈতিক আমলাতন্ত্র: পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য ছাড়া অনুমানের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা গ্রহণ ।
হাওরাঞ্চলের ইতিহাস দেখায়, এই অঞ্চলের প্রধান সংকট কখনোই কেবল "প্রাকৃতিক দুর্যোগ" ছিল না; বরং মানুষের পরিকল্পনাহীন হস্তক্ষেপ, আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক জলপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টাই বহু সংকটের জন্ম দিয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলে রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নদী ও জলাভূমির প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে, পাকিস্তান আমলে ক্রুগ (Krug) মিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে পোল্ডার নির্মাণ এবং বাংলাদেশ আমলে একই উন্নয়ন দর্শনের ধারাবাহিকতা সবই প্রমাণ করে যে প্রকৃতিকে শাসন করার ধারণা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই বোঝা হয়ে ফিরে এসেছে।
(খ) হাওরাঞ্চলে সবুজ বিপ্লবের প্রভাব ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি
১৯৬০-এর দশকে প্রবর্তিত 'সবুজ বিপ্লব' উচ্চফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আধুনিক সেচ ব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে এক অভাবনীয় পরিবর্তন আনে। তবে হাওরাঞ্চলের মতো সংবেদনশীল ও অনন্য বাস্তুতন্ত্রের (Ecosystem) ওপর এই বিপ্লবের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মূল্যায়ন করলে এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়।
সবুজ বিপ্লবের প্রারম্ভিক অর্জন : প্রাথমিক পর্যায়ে হাওরাঞ্চলে উফশী ও হাইব্রিড বোরো ধানের ব্যাপক প্রচলন কৃষিখাতে দৃশ্যমান গতি আনে। সেচ পাম্প ও আধুনিক যান্ত্রিকীকরণের ফলে বিস্তীর্ণ হাওরে একফসলী বোরো ধানের বাম্পার ফলন নিশ্চিত হয়। এটি সাময়িকভাবে কৃষকের আয় বৃদ্ধি করে এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ঢাল হিসেবে কাজ করে।
বাস্তুতন্ত্র ও অর্থনীতিতে বিপর্যয়
উৎপাদন বৃদ্ধির আড়ালে হাওরের হাজার বছরের কৃষি ও মৎস্যসংস্কৃতি চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে।
১. দেশি ধানের বিলুপ্তি: একক বোরো চাষের আগ্রাসনে প্রকৃতিকভাবে বন্যা-সহনশীল গভীর পানির ঐতিহ্যবাহী আমন ধান (যেমন হিজলদীঘা, বাওডড়িয়া) বিলুপ্তির পথে।
২. অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও ঋণগ্রস্ততা: বহুজাতিক কোম্পানির সার, বীজ ও বিষাক্ত কীটনাশকের ওপর কৃষকরা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। উপকরণের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধিতে প্রান্তিক কৃষকেরা ঋণের জালে আবদ্ধ হচ্ছেন।
৩. মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস: ফসলের মাঠের বিষাক্ত রাসায়নিক ও কীটনাশক বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে জলাশয়ে মিশছে। এতে দেশীয় মাছের (শিং, কৈ, পাবদা) প্রজননক্ষেত্র বিনষ্ট হচ্ছে এবং শাপলা-শালুকসহ জলজ উদ্ভিদ হারিয়ে যাচ্ছে।
৪. আগাম বন্যার ঝুঁকি: কেবল একফসলী বোরো ধানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে চৈত্র-বৈশাখ মাসের আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে কৃষকেরা এক নিমিষে নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
ইতিহাসের শিক্ষা ও ডেল্টা প্লান ২১০০: উন্নয়নের পুনরাবৃত্ত ভ্রান্তি
২০১৭ সালের ভয়াবহ ফসল ডুবির পর ২০১৮ সালে তৎকালীন সরকার নেদারল্যাণ্ডেন্স এর অনুকরণে একশত বৎসর মেয়াদী পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং বর্তমান সরকার তা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, ডেল্টা প্ল্যাান ২১০০ বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা। তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা দেখায়, নদী ও ব-দ্বীপ অঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা কেবল প্রকৌশলনির্ভর অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে সফল করা যায় না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করে নির্মিত বাঁধ, পোল্ডার ও জলনিয়ন্ত্রণ কাঠামো অনেক সময় স্বল্পমেয়াদে কিছু সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে, নদীর নাব্যতা কমায়, পলি জমার ধরন বদলে দেয় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা বিপন্ন করে।
বাংলাদেশের ডেল্টা পরিকল্পনা প্রণয়নে নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু নেদারল্যান্ডসের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের বাস্তবতার সঙ্গে এক নয়। সেখানে শতাব্দীব্যাপী নদী ব্যবস্থাপনা, উচ্চ প্রযুক্তি, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার এবং কঠোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বহু পানি উন্নয়ন প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, দুর্নীতি, দাপ্তরিক সমন্বয়হীনতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সর্বোপরি স্থানীয় জনগণের লোকজ জ্ঞানকে উপেক্ষা করার কারণে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে । ফলে একই ধরনের প্রকৌশলভিত্তিক উন্নয়ন মডেল হাওরাঞ্চলে প্রয়োগ করলে অতীতের ভুল পুনরাবৃত্তি হবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না ।
পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষকগণ দেখিয়েছেন যে পানি সমস্যা কেবল প্রকৗশলগত নয়; এটি অর্থনীতি, কৃষি, খাদ্যনীতি ও সামাজিক ন্যায় বিচারের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। হাওরাঞ্চলের বাস্তবতা এই বিশ্লেষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল এর মূল্যায়ন প্রতিবেদনগুলোও বারবার উল্লেখ করেছে যে জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে স্থানীয় জ্ঞান, প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ এবং অংশগগ্রহণমূলক পরিকল্পনা প্রকৌশলভিত্তিক অবকাঠামোর মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কেবল বাঁধ নির্মাণ বা পানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; বরং নদী, জলাভূমি ও বন্যা সমভূমির প্রাকৃতিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে হবে।
হাওরাঞ্চলের প্রেক্ষাপটে ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, কৃষকের বাস্তব জ্ঞান এবং জলাভূমির স্বাভাবিক গতিশীলতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পরিকল্পনার ভাষায় "সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা"র কথা থাকলেও বাস্তবায়নে এখনও প্রকল্প, ঠিকাদারি ও অবকাঠামোকেন্দ্রিক উন্নয়নই প্রধান ঝুঁকি হয়ে রয়েছে। অতীতের বহু প্রকল্পে যেমন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে, তেমনি নতুন প্রকল্পেও একই প্রবণতা দেখা দিলে হাওরের বন্যা, জলাবদ্ধতা ও জীববৈচিত্র্যের সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
ইতিহাসের শিক্ষা হলো, প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা নয়; বরং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই উন্নয়নের পথ। তাই ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর সফলতা নির্ভর করবে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নয়, বরং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, জলাভূমি সংরক্ষণ, ন্যায্যতার ভিত্তিতে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্থানীয় কৃষক জনগণের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর। অন্যথায় এই পরিকল্পনাও অতীতের ক্রুগ মিশন ও পোল্ডারভিত্তিক উন্নয়ন দর্শনের মতো ইতিহাসে আরেকটি ব্যয়বহুল কিন্তু জনবিচ্ছিন্ন পরিকল্পনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
সাম্প্রতিক গণমাধ্যম চিত্র ও উন্নয়নের গণবিরোধী স্বরুপ ঃ-
ফসল রক্ষা বাঁধ ও অধিক ফলনের শ্লোগান দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনায় লগ্নী পুঁজির স্বার্থে উন্নয়নের নামে হাওরাঞ্চলে অপরিকল্পিত বাঁধ, রাস্তাা ঘাট, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা সবুজ বিপ্লবের ডেল্টা প্ল্যানের নামে ও অতিরিক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশক ব্যবহারের ফলে হাওরাঞ্চলের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে,এ বিষয়ে সংবাদ মাধ্যম কী বলে একটু ক্ষতিয়ে দেখা যাক:
হাওরাঞ্চলের বর্তমান বিপর্যস্ত চিত্র নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্তসারে যা প্রতিয়মান হয় ঃ-
(ক) হাওরাঞ্চলের বিপর্যয়কর আবস্থা নিয়ে ৫-ই জুন ২০২৫ খ্রি. দৈনিক বণিক বার্তায় সংবাদ শিরোনাম করেছে “ টাঙ্গুার হাওরের পানিতে বিপজ্জনক ধাতু” প্রতিবেদনটি করেছেন, আল ফাতাহ মামুদ। প্রতিবেদনটিতে এলোমেলো উদ্বেগের বদলে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বিসিএসআইআর এবং বুয়েটের যৌথ গবেষণায় তথ্য উপস্থাপন করে বলা হয়েছে:
“...টাঙ্গুয়ার হাওরের পানির অবস্থা নিয়ে গত এপ্রিলে গবেষণা করে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলোজির একদল গবেষক... হাওরের ১২টি আলাদা জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করার পর এমন তথ্য বেরিয়ে আসে।”
১২টি আলাদা স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ প্রমাণ করে যে এই দূষণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি হাওরের একটি সামগ্রিক সংকট।
২. মাত্রাতিরিক্ত ভারী ধাতু ও তুলনামূলক চিত্র
প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে নিরাপদ মানের একটি উদ্বেগজনক ব্যবধান দেখা যায়:
“...প্রতি লিটার পানিতে গড়ে ক্রোমিয়াম পাওয়া গিয়েছে দশমিক ৩৬৪ মিলিগ্রাম... নিকেল পাওয়া গিয়েছে দশমিক ৩৭৩, যা অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী প্রতি লিটার পানিতে ক্রোমিয়ামের অনুমোদিত সর্বোচ্চ মাত্রা দশমিক শূন্য ৫ মিলিগ্রাম... নিকেলের অনুমোদিত সর্বোচ্চ মাত্রা... দশমিক শূন্য ২ মিলিগ্রাম।”
ক্রোমিয়াম: অনুমোদিত সীমার (০.০৫ সম/খ) চেয়ে প্রায় ৭ গুণেরও বেশি।
নিকেল: বাংলাদেশে নির্ধারিত সীমার (০.০২ সম/খ) চেয়ে প্রায় ১৮ গুণেরও বেশি।
অন্যান্য ধাতু: জিংক, তামা, ম্যাঙ্গানিজ ও সিসাও সহনশীল মাত্রার চেয়ে বেশি।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বারেক টিলা সংলগ্ন পানি সবচেয়ে বেশি দূষিত, যা সীমান্তঘেঁষা নদী ও অতিরিক্ত পর্যটন চলাচলের প্রভাব নির্দেশ করে।
৩. দূষণের ত্রিভুজ উৎস (Triangular Sources of Pollution)
গবেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী দূষণের তিনটি মূল উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে:
ক. অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও হাউজবোট:
“হাউজবোটগুলো থেকে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন থেকে শুরু করে রান্নার সব ধরনের বর্জ্য ফেলা হয় হাওরে।”
খ. আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা:
“...কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য জমিতে দেয়া হয় কীটনাশক। কীটনাশকও ভারী ধাতুর জন্য দায়ী।”
গ. শিল্পবর্জ্য ও উজান থেকে আসা প্রভাব: “সবচেয়ে বেশি দায়ী শিল্পবর্জ্য।”
৪. শৃঙ্খলিত খাদ্যচক্র ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর ঝুঁকি
অধ্যাপক এএসএম সাইফুল্লাহর বক্তব্যে জৈব-সঞ্চয়ন বা ioaccumulation-এর স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে:
“ভারী ধাতুর দূষণ মাছে জমা হয়। সে মাছ খেলে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকিও থাকে। তাছাড়া হাওর এলাকায় পর্যটকদের জন্য ওই পানি দিয়েই রান্না হয়। এটা আরো ঝুঁকিপূর্ণ...”
খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ: পানিতে দ্রবীভূত ধাতব পদার্থ প্লাঙ্কটন ও জলজ উদ্ভিদ শোষণ করে, যা পরবর্তীতে মাছে জমা হয়।
মানবদেহে প্রভাব: দীর্ঘমেয়াদে নিকেল, ক্রোমিয়াম ও সিসাযুক্ত মাছ ও পানি গ্রহণ করলে লিভার, কিডনি নষ্ট হওয়া সহ ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
৫. পরিবেশগত ও আর্থ-সামাজিক ক্ষতি
প্রতিবেদনে স্থানীয়দের উদ্বেগের মাধ্যমে হাওরের সামগ্রিক পরিবেশ ধ্বংসের চিত্র ফুটে উঠেছে:
“...ইনজিনচালিত নৌকার কারণে মাছের বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, কমছে পাখি। হাওর শুকিয়ে গেলে হাজার হাজার প্লাস্টিক বর্জ্য কৃষিজমিতে আটকে থাকে। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।”
শব্দ ও জলজ দূষণ: উচ্চশব্দ এবং ইঞ্জিনের তেল মাছের প্রজনন ও অতিথি পাখির আগমন ব্যাহত করছে।
কৃষির ক্ষতি: বর্ষার প্লাস্টিক প্লাবন শুকনো মৌসুমে ধানখেতে জমা হয়ে মাটির উর্বরতা ধ্বংস করছে।
সারসংক্ষেপ
প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে যে রামসার স্থান (Ramsar site) হিসেবে স্বীকৃত টাঙ্গুয়ার হাওর বর্তমানে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশগত চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি। অবিলম্বে হাউজবোটের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, প্লাস্টিক ও বর্জ্য ফেলার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং পানির গুণমান নিয়ন্ত্রণে সরকারি পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট স্থায়ী রূপ নেবে।
(খ) টাঙ্গুয়ার হাওরের করুণ অবস্থা (দৈনিক প্রথম আলো, ১২ জুন ২০২৫): রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরে “আগে মাছের অভাব ছিল না, এখন চাষের পাঙ্গাশ কিনে খাই” শিরোনাম থেকে প্রতীয়মান হয় ইজারাপ্রথা বাতিলের পর প্রশাসনের নজরদারির অভাবে জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ চরম হুমকির মুখে।
০৯ জুন ২০২৬ খ্রি. দৈনিক সমকালে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে সংবাদের শিরোনাম করা হয়েছে “মরছে নদী, কাঁদছে হাওর”, প্রতিবেদনটি করেছেন সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি পঙ্কজ দে ।
দৈনিক সমকালে প্রকাশিত সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি পঙ্কজ দে-র “মরছে নদী, কাঁদছে হাওর” শীর্ষক প্রতিবেদনটি কেবল একটি স্থানীয় দুর্যোগের চিত্র নয়; বরং এটি হাওরাঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার এক বস্তুনিষ্ঠ দলিল।
নিচে সংবাদ প্রতিবেদনটির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও উক্তি (উদ্ধৃতি) সহ একটি বিস্তারিত পর্যলোচনা উপস্থাপন করা হলো:
১. নদী সংকট ও বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয়
২. প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, হাওরের সমস্যাটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং মানবসৃষ্ট অব্যবস্থাপনার ফল। নদী খনন না করে কেবল বাঁধকেন্দ্রিক পরিকল্পনা হাওরের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
উদ্ধৃতি: “সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতি ক্রমশ সংকটের দিকে যাচ্ছে। নদী-খাল খনন ও স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত না করে প্রতি বছর শত কোটি টাকা খরচ করে কেবল বাঁধ নির্মাণ করায় এমন নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।”
পর্যালোচনা: হাওরের মূল প্রাণশক্তি হলো এর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ। বর্ষায় পানি আসা এবং শুষ্ক মৌসুমে তা নদী দিয়ে সমুদ্রের দিকে নেমে যাওয়া এই প্রাকৃতিক চক্রটি বাঁধের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কেবল স্বল্পমেয়াদি ‘ফসল রক্ষা’র চিন্তা করতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদে হাওরের স্থায়ী পরিবেশগত ক্ষতি করা হচ্ছে।
৩. দখল, ভরাট ও নদীগুলোর ভৌগোলিক পরিবর্তন
প্রতিবেদনে একাধিক নির্দিষ্ট নদীর করুণ দশা ও দখলের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যা সরাসরি কৃষকের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে:
নলজুর নদী (জগন্নাথপুর): উদ্ধৃতি: “জগন্নাথপুরের নলজুর নদী ভরাট হয়ে খালে রূপান্তর ঘটেছে। এ নদী এক সময় ২৫০ ফুট প্রশস্ত ছিল। নদী দিয়ে লঞ্চ চলত। এ নদী স্থানে স্থানে দখল হয়েছে। এ কারণে নলুয়ার হাওরের পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছে।”
যাদুকাটা ও দামালিয়া নদী:
উদ্ধৃতি: “সীমান্তের পাহাড়ি নদী যাদুকাটার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা অংশ ভরাট হয়ে জনবসতি গড়ে উঠেছে... আরেকটি পাহাড়ি নদী দামালিয়া... এ নদীও ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা কমে গেছে। এ কারণে করচার হাওরে এবারও জলাবদ্ধতায় ডুবেছে হাজারো কৃষকের বোর ধান।”
পর্যালোচনা: যখন একটি প্রমত্তা নদী ভরাট হয়ে জনবসতিতে পরিণত হয়, তখন তার স্বাভাবিক পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ক্ষমতা শূন্যে নেমে আসে। এর ফলে সামান্য বৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলেই পানি হাওরে আটকে থাকে, তৈরি হয় স্থায়ী জলাবদ্ধতা। ফসল রক্ষা বাঁধের উদ্দেশ্য যেখানে ধান বাঁচানো, সেখানে নদী নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় সেই ধানি জমিই পানিতে ডুবে নষ্ট হচ্ছে।
৩. অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (NGO) ও প্রশাসনিক সিদ্ধাস্তের ঘাটতি কীভাবে নদীর প্রবাহ রুদ্ধ করেছে, কালাগাঙ নদীর উদাহরণে তা স্পষ্ট।
উদ্ধৃতি: “শ্রীপুর বাজারের কাছে কালাগাঙ নদীতে দেওয়া বাঁধ প্রসঙ্গে উন্নয়ন সংগঠন সিএনআরএসের কর্মকর্তা ইয়াহিয়া সাজ্জাদ গণমাধ্যমকর্মীদের বলেছেন, পাশের তরং গ্রামের লোকজনের চাপাচাপিতে এ বাঁধ নির্মাণ করেছিল সিএনআরএস।”
পর্যালোচনা: স্থানীয় সাময়িক চাপ বা সুদূরপ্রসারী পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা না করে বাঁধ নির্মাণ করা যে কতটা ক্ষতিকর, এই উক্তি তার প্রমাণ। একটি উন্নয়ন সংস্থা বৈজ্ঞানিক ও হাইড্রোলজিক্যাল সমীক্ষা ছাড়া কেবল লোকজনের চাপে নদীর প্রবাহ বন্ধ করে দেয়, যা সামগ্রিক নদী ব্যবস্থার প্রতি দায়িত্বহীনতার পরিচয়।
৪. বাঁধের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় ও দুর্নীতির অভিযোগ
প্রতিবেদনের অন্যতম প্রধান দিক হলো গত সাত বছরের বাঁধ নির্মাণের বিপুল আর্থিক পরিসংখ্যান।
উদ্ধৃতি: “নদী খনন না করে স্থানে স্থানে দেওয়া অপরিকল্পিত বাঁধের নামে সুনামগঞ্জে গেল সাত বছরে কমপক্ষে ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ টাকার বেশির ভাগ লুটপাট হয় এমন অভিযোগও আছে।”
গত ৭ বছরের আর্থিক বরাদ্দের তালিকা: ২০১৯-২০: ১০৪.৩৮ কোটি টাকা, ২০২০-২১: ১১০.৮০ কোটি টাকা, ২০২১-২২: ৯৫.৫২ কোটি টাকা, ২০২২-২৩: ১৫৫.২১ কোটি টাকা,২০২৩-২৪: ১০১.৮০ কোটি টাকা,২০২৪-২৫: ১০৩.৭৭ কোটি টাকা, ২০২৫-২৬ (চলতি বছর): ১৪৯.০০ কোটি টাকা।
পর্যালোচনা: ৮০০ কোটি টাকা একটি বিশাল অঙ্কের বাজেট। কিন্তু এটি খরচ করা হয়েছে অস্থায়ী মাটির বাঁধে, যা প্রতি বছর বর্ষায় ভেসে যায় এবং পুননির্মাণের নামে নতুন বাজেট তৈরি হয়। যদি এই বিপুল অঙ্কের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নদী ও খাল খননে স্থায়ীভাবে ব্যবহার করা হতো, তবে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা অপচয় হতো না এবং হাওরের নাব্য ফিরে পেত।
সামগ্রিক মূল্যায়ন ও সুপারিশ
প্রতিবেদনটি আমাদের সামনে এই সত্য তুলে ধরে যে, হাওর বাঁচানোর একমাত্র পথ নদী খনন, বাঁধ তৈরি নয়।
১. স্থায়ী ড্রেজিং (নদী খনন): পাহাড়ি ঢলের পলি অপসারণ করে নাব্য বাড়াতে হবে।
২. অবৈধ দখল উচ্ছেদ: যাদুকাটা ও নলজুরের মতো নদীতে গড়ে ওঠা অবৈধ জনবসতি ও দখলদারিত্ব দূর করতে হবে।
৩. পরিকল্পিত ক্যাচমেন্ট ম্যানেজমেন্ট: হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভে ছাড়া কোথাও বাঁধ দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
৪. জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: প্রতি বছরের বাঁধ নির্মাণের নামে বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার ও দুর্নীতির তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি গ্রয়োজন।
সংবাদটি সুনামগঞ্জের ১০৬টি নদীর সংকটের মধ্য দিয়ে পুরো হাওরাঞ্চলের এক আশঙ্কাজনক ভবিষ্যতের সংকেত দেয়।
২৬-১১-২০২৪ ইং দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে “হাওরাঞ্চলের উন্নয়নে কমিশন গঠন নয় কেন?” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে,লিখেছেন কবি, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক ইকবাল কাগজী, প্রবন্ধটিতে হাওরবাসীর অন্তরের আকুতি ও জনমতের সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় লেখক প্রবন্ধটির শুরুতেই একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি প্রদান করে সাধারণ হাওরবাসীর তীব্র অসন্তোষ ও দাবির কথা তুলে ধরেছেন:
“হাওরাঞ্চলকে নিজের মতো বাঁচতে দিন। উন্নয়নের নামে হাওরাঞ্চল মাফিয়াাচক্রের কবলে পড়ে ক্ষত-বিক্ষত। মাফিয়াচক্রের কবল থেকে হাওরাঞ্চলকে উদ্ধার করতে হবে। হাওরের চিরচেনা রূপে হাওরকে ফিরিয়ে আনতে হলে হাওরবাসীকে এগিয়ে আসতে হবে।”
লেখক স্পষ্ট করেছেন যে, এই মন্তব্যটি কেবল কোনো একক ব্যক্তির ব্যক্তিগত অভিমত নয়, বরং এটি সমগ্র হাওরাঞ্চলের নিপীড়িত ও বঞ্চিত জনগণের সমষ্টিগত অনুভূতি। হাওরে তথাকথিত উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস ও অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে জনমানসে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, এটি তারই প্রতিফলন।
২. ভুল উন্নয়ননীতি ও পরিবেশগত বিপর্যয়
প্রবন্ধের একটি প্রধান মূলসুর হলো প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা না করে উন্নয়ন মূলক কাজ পরিচালনা করলে তা প্রকৃতপক্ষে বিনাশ নিয়ে আসে। লেখক লিখেছেন: “কোনও স্থানের প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারালে সে-স্থানের উন্নয়ন প্রকারান্তরে অনুন্নয়নের নামান্তরে পর্যবসিত হয়। সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে প্রকৃত প্রস্তাবে তাই ঘটেছে।”
লেখক তত্ত্বভিত্তিক বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তব সংবাদ প্রতিবেদনের উদাহরণ দিয়ে তাঁর মতামত নিশ্চিত করেছেন:
‘সুরমা নদী এখন মরা গাঙ’ (বাংলানিউজ ২৪, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০)
‘কুশিয়ারা নদী এখন মরা খাল’ (দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর, ৬ এপ্রিল ২০২৪)
নদী ভরাট হওয়া, পানিপ্রবাহ রুদ্ধ হওয়াা এবং পরিবেশের মৌলিক রূপ বদলে যাওয়া নির্দেশ করে যে প্রচলিত উন্নয়ননীতি মূল প্রকৃতিকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
৩. দুর্নীতি ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ প্রক্রিয়া
হাওরে ফসলরক্ষাকল্পে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে যে বাঁধ নির্মাণ করা হয়, তাতে অনিয়ম ও নজরদারির অভাব লেখকের লেখায় প্রস্ফুটিত হয়েছে:
“নজরখালি বাঁধ নির্মাণে মতবিরোধ” (দৈনিক সমকাল, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩)
“দুর্নীতির চাদরে ঢাকা সুনামগঞ্জের ফসলরক্ষায় বাঁধ নির্মাণ” (যমুনা টেলিভিশন, ৪ এপ্রিল ২০২৪)
ফসলরক্ষা বাঁধের নাম করে বিপুল পরিমাণ সরকারি বাজেট বরাদ্দ হলেও, দুর্নীতির কায়েমি স্বার্থচক্রের কারণে তা টেকসই সমাধান এনে দিতে পারছে না। উল্টো অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
৪. গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন ও প্রস্তাবিত সমাধান
প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সংকট ও অনিয়মের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি গণমাধ্যম ও রাজনীতি-সামাজিক সংগঠনগুলো সুনির্দিষ্ট সমাধানের দাবি উত্থাপন করেছে। যেমন:
“সুরমা নদী অমলসীদ হতে ভৈরব পর্যন্ত খনন করতে হবে”
“কুশিয়ারা নদী কালনী পর্যন্ত খনন করতে হবে”
“বন্যাসমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে নদী, উপনদী, শাখানদী ও খালবিল দখলমুক্ত করে খনন করতে হবে”
এছাড়াও লেখক ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’-এর একটি মৌলিক দাবির কথা তুলে ধরেছেন:
“হাওরাঞ্চলের পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে নির্মাণকৃত সকল অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট ও স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে।”
হাওরের সংকট উত্তরণে প্রধান বাধা কোনো তথ্যের অভাব নয়, বরং সুপরিকল্পিত রূপরেখা বাস্তবানের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং নদী ড্রেজিং নিশ্চিত করাই প্রকৃত উন্নয়ন।
ইকবাল কাগজীর এই নিবন্ধটি হাওরাঞ্চলের আমলাতান্ত্রিক ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকেন্দ্রিক উন্নয়নীতির তীব্র সমালোচনা করে। হাওর রক্ষায় প্রয়োজন প্রকৃতির নিয়ম মেনে পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং একটি স্বতন্ত্র ‘হাওর কমিশন’ গঠনের মাধ্যমে স্থানীয়দের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নতুন ভাবে পরিকলানা তৈরির প্রস্তাব ।
ভূমিহীনতা ও ঋণের বোঝা
কৃষক ও হাওরবাসীর প্রান্তিকীকরণের বাস্তব চিত্র:
(ক) ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যা বৃদ্ধি (দৈনিক বণিক বার্তা, ১৮ ডিসেম্বর ২০২২): বিবিএস-এর কৃষিশুমারি ২০১৯ অনুযায়ী, দেশে কৃষক পরিবারের ৯১.৭% শতাংশই এখন ক্ষুদ্র কৃষক। বড় ও মাঝারি কৃষক পরিবার দিনে দিনে জমি হারিয়ে ক্ষুদ্র ও ভূমিহীনে পরিণত হচ্ছে। ভূমিহীন সমস্যার মূলে যেমন রয়েছে দেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও প্রাকৃতিক বিপৎসংকুলতা তেমনি রয়েছে আর্থসামাজিক শোষণ ও বিষমতা, যুগপরম্পরায় ভূস্বামীদের অনুকূলে পক্ষপাতদুষ্ট কালাকানুন, গরিব চাষিদের প্রতি সরকারি আনুকূল্যের অভাব, কৃষি উপকরণ ও কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা এবং সর্বোপরি ভূমিহীন ও স্বল্প ভূমিমালিক চাষিদের ঘিরে বিদ্যমান দারিদ্রের বিষচক্র এবং সরকারি আনুকূল্যের অভাবে কৃষক জমি হারিয়ে শহরে এসে রিকশাচালক বা দিনমজুরে পরিণত হচ্ছে।
(খ) মাথাপিছু ঋণের বোঝা ঃ
২৪ মে ২০২৪ইং বিবিসি নিউজ বাংলা একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সংবাদের শিরোনাম ‘‘সাত বছরে দ্বিগুণ হয়েছে বাংলাদেশের ঋণ, কার কাছে কত দেনা? বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ক্রমাগত বাড়ছে” সংবাদটি করেছেন আবুল কালাম আজাদ। সংবাদ বিবরণীতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, (‘‘ঋণ পরিশোধ এবং ভবিষ্যতের ভাবনা থেকেই একটা দুশ্চিন্তা।...)
(...“বাংলাদেশ কার কাছে কতটা ঋণ রয়েছে সেই বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের ওয়েবসাইটে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট ডাটা পাওয়া যায়। এ সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের বৈদেশিক ঋণ ছিল ৫৫.৬০ বিলিয়ন ডলার।
এই ঋণের অর্ধেকের বেশি ৫৭ ভাগ হলো বিশ্বব্যাংক ও এডিবির কাছে। আর দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে ঋণ করেছে তার মধ্যে জাপান, রাশিয়া, চীন ও ভারত এই চারটি দেশই প্রধান।
দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বেলায় বাংলাদেশ জাপানের কাছেই সবচে বেশি দেনায়। জাপানের কাছে বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ ৯.২১ বিলিয়ন ডলার। এরপরই রাশিয়ার কাছে ৫.০৯ বিলিয়ন, চীনের কাছে ৪.৭৬ বিলিয়ন এবং ভারতের কাছে ১.০২ বিলিয়ন ডলার ঋণী বাংলাদেশ।
বর্তমানে এ ঋণ আরো অনেক বেশি। কারণ ইআরডির তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৫শ ৬৩ কোটি ডলার ঋণ করেছে।
এর মধ্যে সবচে বেশি এডিবি থেকে ১৪০ কোটি এবং বিশ্বব্যাংক থেকে ৯৬ কোটি ডলার নিয়েছে বাংলাদেশ।
একই সময়ে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় জাপান থেকে ১৩৫ কোটি, রাশিয়া থেকে ৮০ কোটি, চীন থেকে ৩৬ কোটি, ভারত থেকে ১৯ কোটি এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ নেয়া হয়েছে।”...)
(...”বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতির প্রবণতায় দেখা যায় সরকারের বৈদেশিক ঋণ এবং এর পরিশোধ দুটোই ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকারের যে ঋণ ৫০ বিলিয়ন ছিল সেটি ২২-২৩ অর্থবছরে ৬২ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। এই ঋণ পরিশোধের ধারাও ঊর্ধ্বমুখী। ,,,)
সংবাদ বিবরণীতে আরও বলা হয় ঃ-(...‘‘অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের চাহিদা অনুযায়ী আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে না উল্টো বিদেশে অর্থ পাচার, উচ্চ শিক্ষা ও বিদেশে চিকিৎসার জন্য বিলিয়ন ডলারের বাড়তি ব্যয় হচ্ছে যেটা দুশ্চিন্তার বিষয়।”...)
সংবাদের আর একটি উপশিরোনাম করা হয়েছে ‘‘বোঝা জনগণের কাঁধে” বিবরণীতে বলা হয়েছেঃ-
(...”এদিকে বিদেশি ঋণের সমস্ত দায় শেষ পর্যন্ত জনগণের কাঁধেই পড়বে। জনগণের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর আদায় করেই সরকারের আয় বাড়াতে হবে।...”)
সংবাদের আরও একটি উপশিরোনাম করা হয়েছে ‘‘বাংলাদেশে মাথাপিছু ঋণ দেড় লাখ টাকার মতো” এতে বলা হয়েছেঃ-(...“বোঝা কিন্তু মানুষের ঘাড়েই। এই যে ঋণের বোঝাটা আমরা বলছি যে ঋণ কতো। অলরেডি বেড়েছে। এখন মাথাপিছু ঋণ দেড় লাখ টাকার মতো। কিছুদিন আগে এটা এক লাখ টাকার মতো ছিল। আমরা প্রত্যেকের মাথায় ঋণ নিয়ে ঘুরছি...”)।
উল্লিখিত সংবাদ পাঠ ও পর্যালোচনার পর যে কেউ বলতে পারেন , প্রতিটি সরকার উন্নয়নের গল্প বলেছে, বড় বড় প্রকল্প তৈরি হয়েছে, তার সাথে ঋণ বেড়েছে,পরিণামে হাওরাঞ্চলে বিপর্যয় ঘটেছে, কৃষক জনগণ সহায় সম্বল হারিয়ে দিনে দিনে ভূমিহীন হয়ে শহরে বস্তিবাসী হয়েছে । আর লাভবান হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী লগ্নীপুঁজি ও তার এদেশীয় আমলা দালাল মৎসুদ্দি পুঁজিপতি শ্রেণি। তথাকথিত উন্নয়নের নামে কৃষক জনগণের সম্পদ মুষ্টিমেয় লুটেরা গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, কাঠামোগত সহিংসতার স্বীকারে পরিণত হয়ে কৃষক জনগণ নিরবে ভুমিহীন হয়ে শহরে পারি জমিয়ে কেউ রিক্সাচালক, হকার, গার্মেন্টস শ্রমিক, কেউ কেউ দিনমজুর । বিশাল এই জনগোষ্ঠী অর্ধাহারে অনাহারে দিন যাপন করে রাষ্ট্র তার খবরও রাখে না ।
হাওরাঞ্চল রক্ষায় গণমুখী ও বিজ্ঞানভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনায় কিছু প্রস্তাবনা ঃ-
হাওরাঞ্চলের ইতিহাস প্রমাণ করে, নদীকে কেবল নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে দেখার উন্নয়ন দর্শন দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। তাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভিত্তি হতে পারে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, গণঅংশগ্রহণ এবং আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা। একটি কার্যকর ও হাওর ব্যবস্থাপনার জন্য নিম্নোক্ত নীতিসমূহ প্রস্তাব আকারে পেশ করা হল ঃ-
প্রথমত, হাওরকে একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে সাংবিধানিক ও আইনগত স্বীকৃতি দিতে হবে। নদী, বিল, খাল, জলাভূমি ও বন্যা সমভূমিকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমন্বিত জলজ-বাস্তুতন্ত্র হিসেবে পরিচালনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অপরিকল্পিত বাঁধ, ভরাট ও জলপপ্রাহে বাধা সৃষ্টি করে এমন অবকাঠামো বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করে প্রয়োজনে পুনর্বিন্যাস বা অপসারণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, ন্যায্যতার ভিত্তিতে উজান-ভাটির সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা ছাড়া হাওরের বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানি, পলি ও আকস্মিক ঢল নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে হবে।
চতুর্থত, হাওর উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষক, জেলে, নৌ-শ্রমিক, নারী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
পঞ্চমত, প্রতিটি বড় পানি উন্নয়ন প্রকল্পের আগে স্বাধীন পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন (Environmental and Social Impact Assessment) বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং সেই প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
ষষ্ঠত, নদী খননকে এককালীন প্রকল্প নয়, অববাহিকাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কোথায়, কতটুকু এবং কী পদ্ধতিতে খনন হবে, তা অবশ্যই বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
সপ্তমত, হাওরের প্রকৃতিক জলধারণ ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে বিল, খাল ও জলাভূমি দখলমুক্ত করতে হবে এবং অবৈধ ভরাট বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।
অষ্টমত, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আকস্মিক বন্যা ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকি মোকাবিলায় আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় পানি পরিমাপ কেন্দ্র এবং দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে হবে।
নবমত, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের ব্যয়, নকশা, অগ্রগতি ও মূল্যায়ন জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে এবং স্বাধীন নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
দশম, হাওরাঞ্চলের অর্থনীতিকে কেবল একফসলি বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল না রেখে মৎস্যসম্পদ, জলজ উদ্ভিদ, পর্যটন, পশুপালন এবং জলাভূমিভিত্তিক বহুমুখী জীবিকার উন্নয়ন করতে হবে।
একাদশ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনগণের অংশীদারিত্বে হাওর গবেষণা জোরদার করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি তথ্যভান্ডার, জলপ্রবাহ, পলি, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন ।
দ্বাদশ, হাওর উন্নয়নের মূল দর্শন হওয়া উচিত "প্রকৃতিকে পরাজিত করা নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান।" উন্নয়নের সফলতা কেবল নির্মিত অবকাঠামোর পরিমাণে নয়; বরং কৃষকের নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ, নদীর স্বাস্থ্য এবং মানুষের জীবনমানের উন্নতিতে পরিমাপ করতে হবে।
উপসংহার
হাওরাঞ্চলের বারবার সংঘটিত বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত সংকট কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়; এগুলো দীর্ঘদিনের নীতি, পরিকল্পনা, অব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন-দর্শনেরও প্রতিফলন। ইতিহাসের শিক্ষা হলো যে উন্নয়ন প্রকৃতি, ইতিহাস ও জনগণের অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে, তা শেষ পর্যন্ত কোন প্রকার সুফলের পরিবর্তে বিনাশ ডেকে আনে ।
অতএব, হাওরাঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন একটি উন্নয়ন নীতির ওপর, যা বিজ্ঞানসম্মত, পরিবেশসংবেদনশীল, সামাজিকভাবে ন্যায়সঙ্গত এবং জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণভিত্তিক। যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে তখনই, যখন তা হাওরের মানুষ, নদী ও বাস্তুতন্ত্রের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করে, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানকে ভিত্তি করে এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই হাওরাঞ্চলের জন্য একটি নিরাপদ, উৎপাদনশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা সম্ভব।
হাওরাঞ্চলের সমস্যা সমাধান হাওরবাসীকেই করতে হবে । ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়ে হাওরাঞ্চলের কৃষক, জেলে ও সাধারণ মেহনতি মানুষকেই সোচ্চার হয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আজ হাওরবাসীর সার্বিক সুরক্ষার তাগিদে জোরালো দাবি উঠেছে ‘‘হাওরাঞ্চলের জন্য পৃথক হাওর মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে"। তাই হাওরবাসীকে ঐক্যবদ্ধ লড়াই
সংগ্রামের মাধ্যমে দাবি আদায়ের বিকল্প নেই ।
তারিখঃ-১১/০৮/২০২৬ইং
লেখক : শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের রাজনৈতিক কর্মী।
উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন