তাহিরপুরের বিষপান ট্র্যাজেডি এবং প্রতিকারের পথ

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৫৮

তাহিরপুরে পারিবারিক কলহের জেরে নিজের তিন শিশুসন্তানকে বিষপান করানোর পর নিজেও বিষপান করার ঘটনায় ১০ বছরের মাওয়া, ৭ বছরের শামিম ও ২ বছরের তামিমের মৃত্যু হয়েছে। মর্মান্তিক এ ঘটনা ঘিরে পারিবারিক অশান্তি, মাদক, অনলাইন জুয়া, আর্থিক সংকট, মানসিক চাপ এবং শিশুদের নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে একজন মানুষ কীভাবে চরম সিদ্ধান্তের দিকে যেতে পারেন, পরিবারের সদস্যরা কীভাবে আগেই ঝুঁকির সংকেত বুঝতে পারেন এবং এমন ঘটনা প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনের ভূমিকা কী হওয়া উচিত— এসব বিষয় নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সংবাদ সংযোগ ‘খবরনামা’য় কথা বলেছেন সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের মনোবিজ্ঞানের প্রভাষক সুমন খাঁন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: পারিবারিক কলহ, তীব্র ক্ষোভ ও মানসিক চাপ কীভাবে একজন মানুষকে এমন ভয়াবহ ও চরম আচরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে?
সুমন খাঁন: পারিবারিক কলহ বা ক্ষোভ মানুষের জীবনে স্বাভাবিক বিষয় হলেও তা যখন জীবনযাত্রায় বড় ধরনের আঘাত তৈরি করে, তখন সমস্যা বাড়তে থাকে। তাহিরপুরের ঘটনাটির সঙ্গে মাদকাসক্তির একটি যোগসূত্র রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। মানসিক শান্তি দ্রুত পাওয়ার আশায় কেউ কেউ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এর সঙ্গে অনলাইন জুয়ার মতো বিষয় যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। দ্রুত বড়লোক হওয়ার প্রবণতাও মানুষের মধ্যে এক ধরনের চাপ তৈরি করছে। সমাজে অর্থকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার কারণে কেউ কেউ সহজে অর্থ উপার্জনের আশায় অনলাইন জুয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাচ্ছেন। এতে আর্থিক সংকট ও মানসিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: মাদকাসক্তি ও অনলাইন জুয়ার মতো বিষয়গুলো একজন ব্যক্তির আচরণ ও পারিবারিক সম্পর্কে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে?
সুমন খাঁন: মাদক ও জুয়া—দুটি বিষয়ই মানুষের আচরণ ও পারিবারিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেকের ক্ষেত্রেই কোনো না কোনোভাবে মাদকাসক্তি বা জুয়া আসক্তির বিষয় দেখা যায়। সামাজিক অস্থিরতার মধ্যেও এসব প্রবণতা বাড়তে পারে। আর্থিক সংকট, বেকারত্ব কিংবা অভাব—অনটনের মধ্যে কেউ কেউ দ্রুত অর্থ পাওয়ার আশায় অনলাইন জুয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু এ ধরনের পথ টেকসই সমাধান নয় এবং এতে সংকট আরও বাড়তে পারে।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: একজন মানুষ চরম কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার আচরণ বা চলাফেরায় কী ধরনের সংকেত দেখা যেতে পারে?
সুমন খাঁন: একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হলো—মানুষ যখন নিজের কথা বলার বা অনুভূতি প্রকাশের জায়গা হারিয়ে ফেলে। মানসিক চাপে থাকা একজন ব্যক্তি যদি নিজের সমস্যা কারও সঙ্গে শেয়ার করতে না পারেন, তাহলে তার ভেতরের ক্ষোভ ও চাপ আরও বাড়তে পারে। আমাদের সমাজে এখনো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক সংকোচ রয়েছে। কেউ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্টের কাছে গেলে তাকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করার প্রবণতা রয়েছে। ফলে অনেকে নিজের সমস্যার কথা প্রকাশ করতে পারেন না। পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কও যদি ভালো না থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: এ ধরনের আচরণ দেখলে পরিবার বা সমাজের কী ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত?
সুমন খাঁন: প্রথমেই ওই ব্যক্তির মনের কথা শুনতে হবে। তার অভিপ্রায় ও সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করতে হবে। পরিবারে আবেগীয় যোগাযোগের পাশাপাশি পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী—স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব থাকলে একই ঘরে থেকেও অনেক সময় আবেগীয় যোগাযোগ থাকে না। পরস্পরের প্রতি আন্তরিকতা ও স্পর্শের মতো স্বাভাবিক মানবিক যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবারের সদস্যদের একে অপরের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: স্বামী—স্ত্রীর দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা বিচ্ছিন্নতার পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের মানসিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে?
সুমন খাঁন: মানসিক চাপ বা দীর্ঘস্থায়ী সংকটে থাকা ব্যক্তির প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কিংবা কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্টের সহায়তা নেওয়া উচিত। তবে আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনো সংকোচ রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে শুধু শারীরিক বা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়াই যথেষ্ট নয়। মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: তাহিরপুরের মতো মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের করণীয় কী?
সুমন খাঁন: সুস্থ পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করতে হবে। স্বামী—স্ত্রী, সন্তান কিংবা শাশুড়ি—বউ—প্রতিটি সম্পর্কেই একে অপরের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা এবং পারস্পরিক যত্ন প্রয়োজন। সুস্থ সামাজিক পরিবেশ তৈরি হলে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতাও কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে দ্রুত বড়লোক হওয়ার প্রবণতা নিয়েও সচেতনতা তৈরি করা দরকার। সহজে অর্থ উপার্জনের আশায় অনলাইন জুয়ার মতো পথে না যাওয়ার বিষয়ে তাদের সচেতন করতে হবে। প্রশাসনের ক্ষেত্রে গণসচেতনতা তৈরিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। পুরো জেলায় মাদক, মানসিক স্বাস্থ্য ও পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়ে সচেতনতামূলক সভা—সেমিনার আয়োজন করা যেতে পারে। পাশাপাশি মাদকের উৎস বন্ধ করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু মাদক আটক করলেই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না; মাদকের সরবরাহের উৎস বন্ধ করার উদ্যোগও প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে না দেখে তার মানসিক ও আবেগীয় অবস্থার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক সম্পর্ক, মাদক ও জুয়ার মতো বিষয়গুলোকে আলাদা করে না দেখে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করার ওপর গুরুত্ব দেন সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের মনোবিজ্ঞানের প্রভাষক সুমন খাঁন।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার