নদী ও শ্রমিকের জীবিকা রক্ষায় পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার দাবি

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:২১

অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনে বিপন্ন জাদুকাটা

জাদুকাটা নদীতে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, পাড়কাটা ও খননযন্ত্র ব্যবহারের কারণে ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবেশকর্মী ও নাগরিক সংগঠনের নেতারা। নদীভাঙনে শত বছরের বসতি, হাটবাজার ও সরকারি স্থাপনাও ঝুঁকিতে পড়েছে বলে তারা জানিয়েছেন। নদীর পরিবেশ—প্রতিবেশ রক্ষা, বালু ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সংবাদ সংযোগ ‘খবরনামা’য় কথা বলেছেন সুনামগঞ্জ পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সভাপতি নুরুল হক আফিন্দি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার সাইদুর রহমান আসাদ

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: জাদুকাটা নদীর বর্তমান অবস্থা কেমন?
ফজলুল করিম সাঈদ: জাদুকাটা নদীকে আইনের ভাষায় জীবন্ত সত্তা বলা হলেও নদীটি এখন মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। ২০—৩০ বছর আগে যে অপরূপ সৌন্দর্য দেখা যেত, তা এখন আর নেই। অপরিকল্পিত ইজারা ও দুর্বল আইনের কারণে নদীর সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, মেঘালয়ের পাদদেশের নদী, শিমুল বাগান, শাহ আরপিনসহ ঐতিহ্যবাহী নানা স্থানের কারণে জাদুকাটা এখনো পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তবে অপরিকল্পিত বালু ইজারা ও খননযন্ত্র ব্যবহারের কারণে নদীটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

 


তিনি আরও বলেন, গতবার ১১২ কোটি টাকায় বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এটি রাজস্ব হিসেবে অবদান রাখলেও নদীতে বাস্তবে এত টাকার বালু ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের মাধ্যমে বালুর পরিমাণ নির্ধারণ না করে বেশি মূল্যে ইজারা দিলে ইজারাদাররা অতিরিক্ত বালু উত্তোলনে উৎসাহিত হন। অবৈধভাবে খননযন্ত্র ব্যবহার করে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্তকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও বিদ্যমান আইন যথেষ্ট কার্যকর নয় বলে তিনি মনে করেন।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: প্রশাসন ও পরিবেশকর্মীদের তৎপরতার পরও পাড়কাটা বন্ধ হচ্ছে না কেন?
ফজলুল করিম সাঈদ: পাড়কাটা বন্ধ করতে প্রশাসন, পুলিশ, রাজনৈতিক কর্মী ও এলাকাবাসী—সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। জাদুকাটা নদীকে স্বর্ণের ডিম পাড়া হাঁসের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, মানুষ এখন প্রতিদিনের আয় পাওয়ার পাশাপাশি নদীটিকেই ধ্বংস করে ফেলছে। তিনি বলেন, নদীরও নিজস্ব সত্তা রয়েছে। নদীকে সেই সত্তা অনুযায়ী বাঁচতে দিতে হবে। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে নদীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তাতে নদী ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: জেলা প্রশাসনের হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের উদ্যোগকে কীভাবে দেখছেন?
নুরুল হক আফিন্দি: জাদুকাটা নদী ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছেন তিনি। পাহাড়ের পাদদেশ ও ভারত থেকে নেমে আসা বালু জমে এই নদীতে বালুর উৎস তৈরি হয়েছে। এই বালু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। জেলা প্রশাসনের হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের উদ্যোগ বাস্তবসম্মতভাবে হলে তা গুরুত্বপূর্ণ। নদীতে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু বালু রয়েছে, আগে সেটি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: জাদুকাটায় ধ্বংস ঠেকাতে বালুমহাল বিলুপ্তির দাবি কতটা যৌক্তিক?
নুরুল হক আফিন্দি: বর্তমান পরিস্থিতি যদি চলতে থাকে, তাহলে বালুমহাল বিলুপ্তির বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। তবে পরিকল্পিত ও আইনানুগভাবে বালু উত্তোলন করা সম্ভব হলে নদীর সম্পদকে নষ্ট না করে তা ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা যেতে পারে। তিনি বলেন, জাদুকাটার বালুর গুণগত মান ভালো হওয়ায় এর চাহিদা বেশি। তাই জেলা প্রশাসনের জরিপের উদ্যোগ বাস্তব ও কার্যকর হতে হবে। শুধু লোক দেখানো জরিপ হলে সমস্যার সমাধান হবে না। ১১০ বা ১১২ কোটি টাকার বালু আদৌ নদীতে ছিল কি না, আগে তা যাচাই করা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: বালুমহাল বিলুপ্ত হলে নদীকে ঘিরে কর্মসংস্থানের কী হবে?
নুরুল হক আফিন্দি: বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে জাদুকাটা ও সুরমা নদীর তীরে বহু শ্রমিকের কর্মসংস্থান রয়েছে। ১৯৯৫ সালে তিনি রক্তি নদী ও সুরমা নদীর নৌযান চলাচল নিয়ে আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, পরিকল্পিত নৌ—ব্যবস্থাপনা হলে স্থানীয় শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। নদীর সম্পদ ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিকল্প পদ্ধতি কী হতে পারে?
নুরুল হক আফিন্দি: নদী থেকে বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ না করে আগের মতো পরিকল্পিত ও সীমিত পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের কথা বলেন তিনি। অতীতে বেলচা ও ছোট নৌকার মাধ্যমে যেভাবে বালু উত্তোলন করা হতো, সেই পদ্ধতি অনুসরণের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: বালুমহাল বিলুপ্ত হলে হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাবে—এ বিষয়ে কী বলবেন?
ফজলুল করিম সাঈদ: নদী রক্ষা, শ্রমিকের জীবিকা এবং নদীতীরের বসতি—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। নদী না বাঁচলে শ্রমিক ও এলাকাবাসী— কেউই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারবেন না। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে নদীর প্রশস্ততা নিয়ে একটি জরিপ হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। ওই জরিপের তথ্য বের করে নদীর সীমানা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নদীভাঙনে কত সরকারি সম্পত্তি, গ্রাম ও বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে, তারও হিসাব করা দরকার।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন নতুন করে বালু ইজারা দেওয়ার আগে সরেজমিনে জরিপ করলে পরিবেশকর্মীদেরও সেখানে রাখা উচিত। কোথায় প্রকৃত বালুর অস্তিত্ব রয়েছে, তা মাঠপর্যায়ে যাচাই করা প্রয়োজন। জাদুকাটা নদী বর্তমানে যে অবস্থায় রয়েছে, তাতে অন্তত দুই বছর নদীকে বিশ্রামে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এ সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় রাখার প্রস্তাব দেন তিনি।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সুশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে জাদুকাটা নদী রক্ষায় প্রশাসনের কাছে আপনার কী বার্তা?
নুরুল হক আফিন্দি: প্রশাসনকে নির্দিষ্ট আইন অনুযায়ী কাজ করতে হবে। প্রশাসনের নিজস্ব দায়িত্ব ও আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে প্রশাসন যদি আইনানুগ অবস্থান থেকে সরে যায়, তাহলে কার্যকর ফল পাওয়া যাবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: জাদুকাটা নদী রক্ষায় প্রশাসনের কাছে আপনাদের দাবি কী?
ফজলুল করিম সাঈদ: পরিবেশকর্মী, সামাজিক সংগঠন ও এলাকাবাসী আইন হাতে তুলে নিতে পারে না। নদী রক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বের অংশ। প্রশাসনের পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে জাদুকাটা নদী নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। নদী রক্ষা, এলাকাবাসীর বসতি এবং শ্রমিকদের অধিকার—তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জাদুকাটা নদী ও এর ওপর নির্ভরশীল মানুষ—দুই দিকই রক্ষা করতে হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার