প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:০০
সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন ও অকার্যকর সংসদের অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও জনগণকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকারি দল। আর এতে বিরোধী দলের আন্তরিকতাও লক্ষ্যণীয়।
আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, বাজেট পর্যালোচনা, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সক্রিয়তা, জনগণের সমস্যা সরাসরি সংসদে তুলে ধরা এবং গঠনমূলক বিতর্কের মাধ্যমে জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন ধরনের সংসদীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রার শুরুতেই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সহযোগিতামূলক সংসদীয় চর্চার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি সংসদে বিরোধী দলকে অর্থবহ ও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন। তার মতে, সংসদকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হলে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এ বিষয়ে বাসসকে বলেন, বর্তমান সংসদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সংসদের প্রতিটি কার্যক্রম গ্রামের কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দেখেন। অর্থাৎ, এই সংসদ ১৮ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সংসদ সদস্যদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা ও যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকার ও বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বর্তমান সরকারি দল ও বিরোধী দল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে-এটাই জাতির প্রত্যাশা।
তিনি আরো বলেন, দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত জাতীয় সংসদ। এখানে সরকারি দল তাদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। একইভাবে বিরোধী দলও গঠনমূলক সমালোচনা করার সুযোগ পাচ্ছে।
সংসদকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বাসসকে বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকারি দলের পাশাপাশি সংসদে বিরোধী দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইতোমধ্যে সংসদে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিংবা পেট্রোল পাম্পে তেল সরবরাহের সমস্যা দেখা দিলে সংসদ সদস্যরা ঐক্যবদ্ধভাবে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন। একইভাবে সংসদ সদস্যদের সরকারি গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়ার বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছে।
সংসদ কার্যকর করার বিষয়টি মূলত মানসিকতার ওপর নির্ভর করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে চমৎকার মানসিকতা ও সম্পর্ক বিরাজ করছে। দেশকে এগিয়ে নেওয়া, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে উভয় দলের মধ্যেই ইতিবাচক মানসিকতা রয়েছে।
সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখা কোনো এককালীন বিষয় নয়, এটি চলমান প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, বিরোধীদল সংসদের বাইরে রাজপথে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে তাদের কর্মসূচি পালন করছে। পাশাপাশি সংসদেও তাদের সরব উপস্থিতি সংসদকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দেশ ও জনগণের স্বার্থে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রাখার কথা বলেছেন। জাতীয় সংসদে দেয়া বক্তব্যে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে অভিন্ন অবস্থানে আসার সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. মো. শফিকুর রহমান সংসদে ‘যৌক্তিক ও গঠনমূলক বিরোধী দলের’ ভূমিকা পালনের ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর দলের অবস্থান হচ্ছে, সরকারকে অন্ধ সমর্থন যেমন করা হবে না, তেমনি অযৌক্তিক বিরোধিতাও করা হবে না। জনকল্যাণ, জবাবদিহিতা ও জাতীয় সংস্কারের প্রশ্নে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের কথা জানিয়েছে বিরোধী দল।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে কার্যকর করার ক্ষেত্রেও এবার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদে বর্তমানে ৫০টি স্থায়ী কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এবং ১১টি সংসদীয় বিষয়-সম্পর্কিত কমিটি। এসব কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে সভাপতি করা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংসদীয় কমিটিতে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি এবং সরকারি অর্থের ব্যবহার পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সংসদীয় কার্যক্রমকে আরও তথ্যনির্ভর করার উদ্যোগ হিসেবে বাজেট অধিবেশনের আগে সংসদ সদস্যদের জন্য বাজেট হেল্পডেস্ক চালু করা হয়। গবেষণামূলক তথ্য ও উপাত্ত সরবরাহের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের বাজেট আলোচনায় সহায়তা করাই এর লক্ষ্য। এর ফলে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বাজেট বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এ পর্যন্ত তিনটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় সংসদের তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় অধিবেশন ১০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়।
প্রথম অধিবেশন ১২ মার্চ শুরু হয়ে ৩০ এপ্রিল শেষ হয়। ২৫ কার্যদিবসের ওই অধিবেশনে ৯৪টি বিল পাস হয়। পাঁচটি স্থায়ী কমিটি ও দুটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কার্যপ্রণালি বিধির ৬২ বিধিতে ১৬টি নোটিশ পাওয়া যায়, যার মধ্যে দুটির ওপর আলোচনা হয়। ৬৮ বিধিতে পাওয়া নয়টি নোটিশের মধ্যে একটির ওপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়। ৭১ বিধিতে গৃহীত ৩৮টি নোটিশের ওপর আলোচনা হয়েছে এবং ৭১ক বিধিতে দুই মিনিট করে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে ২০৭ বার।
ওই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীকে উত্তরদানের জন্য ৯৩টি প্রশ্নের নোটিশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে তিনি ৩৫টি প্রশ্নের উত্তর দেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য ২ হাজার ৫০৯টি প্রশ্নের নোটিশ পাওয়া যায় এবং মন্ত্রীরা ১ হাজার ৭৭৮টি প্রশ্নের উত্তর দেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৪০ ঘণ্টা ১৪ মিনিট আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
দ্বিতীয় অধিবেশন ৭ জুন শুরু হয়ে ১৫ জুলাই শেষ হয় এবং ২৬ কার্যদিবস চলে। বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা ১৪ কার্যদিবসে মোট ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট স্থায়ী হয়। এতে ৩১৬ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন। এ অধিবেশনে ১০টি সরকারি বিল পাস হয়। কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে ৭১৫টি নোটিশের মধ্যে ২৪টি গৃহীত হয় এবং ২২টির ওপর আলোচনা হয়। ৭১ক বিধিতে ১২৫টি দুই মিনিটের নোটিশ আলোচিত হয়। ১৩১ বিধিতে চারটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব আলোচনা ও নিষ্পত্তি হয়।
দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য ২৭৮টি প্রশ্ন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩৫টি প্রশ্নের উত্তর টেবিলে উপস্থাপন করা হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য জমা পড়া ৫ হাজার ৩১টি প্রশ্নের মধ্যে ৩ হাজার ৪৭৪টির উত্তর দেওয়া হয়।
তৃতীয় অধিবেশন ২৭ আগস্ট শুরু হয়ে ১০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়। নয় কার্যদিবসের এ অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬, সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬, ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬ এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬সহ ছয়টি বিল পাস হয়।
এ অধিবেশনে ৩৫টি সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন করা হয় এবং একটি বিশেষ কমিটিও পুনর্গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীকে উত্তরদানের জন্য সংসদ সদস্যরা ১৪৪টি প্রশ্ন জমা দেন, যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ১৫টির উত্তর দেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের উত্তরদানের জন্য ২ হাজার ৬৭৬টি প্রশ্ন জমা পড়লে মন্ত্রীরা ১ হাজার ৬৭৮টির উত্তর দেন।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম তিন অধিবেশনে আইন প্রণয়ন, প্রশ্নোত্তর, বাজেট আলোচনা, সংসদীয় কমিটি গঠন এবং বিভিন্ন জনস্বার্থের বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সংসদীয় কার্যক্রমের একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে।
সূত্র: বাসস .কম
এমডি
জাতীয় থেকে আরো পড়ুন