প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:২১
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: মিছাখালী রাবারড্যামের ওপর দিয়ে বালু—পাথরবোঝাই নৌকা চলাচল করছে। এতে ড্যামের কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে এবং এটি কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে?
কাজী সালেহ আহমদ: হাওরের বোরো ফসল পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার পানি থেকে রক্ষার জন্য প্রায় ১১ থেকে ১২ বছর আগে ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে রাবারড্যামটি নির্মাণ করা হয়। এটি বালু—পাথর পরিবহনের নৌকা চলাচলের পথ নয়। কিন্তু কিছু বালু—পাথর ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় এবং ইজারার ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে ড্যামের ওপর দিয়ে নৌকা চালাচ্ছেন বলে আমাদের অভিযোগ। স্থানীয় প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে নৌকা চলাচল বন্ধের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু দিন—রাত নৌকা চলাচল করায় তা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে রাবার ব্যাগের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ বছর রাবার ব্যাগের ওপর দিয়ে অনেক নৌকা চলাচল করেছে। কোথাও নৌকার পাখা আটকে যাওয়া ও নৌকার সঙ্গে রাবারের ঘর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি জানান। পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: নৌকা চলাচল বন্ধে বিএডিসি এখন পর্যন্ত কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে?
কাজী হোসনে আর রাফি : মিছাখালী রাবারড্যামটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাবারড্যাম। পাহাড়ি ঢলের পানি নিয়ন্ত্রণ করে হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ড্যামের ওপর দিয়ে নৌকা চলাচলের বিষয়টি সুনামগঞ্জে যোগদানের পর থেকেই আমাদের নজরে আসে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন ও পরিচালনা কমিটির সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। একপর্যায়ে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এতে কিছুদিন নৌকা চলাচল বন্ধ থাকলেও পরে আবার শুরু হয়। নৌকা চলাচল বন্ধে মাইকিং, ব্যানার স্থাপন ও জনসচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ড্যামের ওপরের সেতুর সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে লোহার অ্যাঙ্গেল বসিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছিল, যাতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল করতে না পারে। তবে একটি অংশ খোলা রাখা হয়েছিল, যেদিক দিয়ে নৌকা চলাচলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু নৌকাগুলো নির্ধারিত খোলা অংশ ব্যবহার না করে অন্য দিক দিয়ে চলাচল করে। একারণে ব্যারিকেড দিয়েও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় নি।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: ব্যারিকেড ভেঙে নৌকা চলাচল অব্যাহত থাকছে। এ ক্ষেত্রে তদারকির ঘাটতি রয়েছে কি?
কাজী হোসনে আরা রাফী: একটি রাবারড্যাম ২৪ ঘণ্টা পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করা কঠিন। ২০২৩—২৪ অর্থবছরে ড্যাম পাহারার জন্য একজন পাহারাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তারপরও কিছু ঘটনা ঘটেছে। পাহারাদার সব সময় ড্যামের প্রতিটি অংশে উপস্থিত থাকতে পারেন না। একারণে নৌকা চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। ড্যাম রক্ষায় আগে যে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছিল, সেটি আরও মজবুত করার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আগের তুলনায় শক্তিশালী লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি এবং উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় গ্রাম পুলিশকে দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে কার্যকর ফল পাওয়া যেতে পারে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে নৌকা চলাচল বন্ধ করা যাচ্ছে না কেন?
কাজী সালেহ আহমদ: কিছু বালু—পাথর ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি নৌকা চলাচলের সঙ্গে জড়িত বলে আমাদের অভিযোগ। পাহারাদার বাধা দিতে গেলে তারা বাধা অতিক্রম করে নৌকা নিয়ে চলে যান। স্থানীয় পর্যায়ে তাদের মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে বারবার চেষ্টা করেও নৌকা চলাচল বন্ধ করা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: বিএডিসির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাবারড্যামের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বহনে পরিচালনা কমিটির আগ্রহের ঘাটতি রয়েছে। এ অভিযোগের বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
কাজী সালেহ আহমদ: আমি ২০২৩ সালে পরিচালনা কমিটির দায়িত্বে আসি। এর আগে যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের সময়েও ড্যাম পরিচালনায় প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়েছে। রাবারড্যাম পরিচালনার জন্য স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে বিঘাপ্রতি ৫০ টাকা করে আদায়ের একটি ব্যবস্থা ছিল। এ জন্য রসিদ তৈরি করে লোকও নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু কৃষকেরা টাকা দিতে রাজি হননি। কৃষকদের যুক্তি, সরকার এত টাকা ব্যয় করে ড্যাম নির্মাণ করেছে, তাই এর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও সরকারি পর্যায় থেকে বহন করা উচিত। কমিটির সদস্যরা স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। ড্যামের জন্য তারা কারও কাছ থেকে কোনো টাকা আদায় করেননি। নির্ধারিত অর্থ আদায়ের নীতি কাগজে থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। তাই বিএডিসি, উপজেলা প্রশাসন কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বহনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: হাওরের কৃষকদের কাছ থেকে রক্ষণাবেক্ষণের টাকা আদায় ও ব্যয়ের হিসাব কীভাবে পরিচালিত হয়?
কাজী সালেহ আহমদ: পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে ড্যামের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়নি। কমিটির সদস্যরা স্বেচ্ছা শ্রম দিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। বিএডিসি ও উপজেলা সেচ কমিটির নীতিমালা অনুযায়ী উপকারভোগী কৃষকদের কাছ থেকে বিঘাপ্রতি ৫০ টাকা আদায়ের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। ফলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বহনের জন্য কমিটির হাতে নিজস্ব তহবিল নেই।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে কত টাকা প্রয়োজন হয় এবং ব্যয় বহনে কী ধরনের সমস্যা রয়েছে?
কাজী হোসনে আর রাফি:;একটি রাবারড্যাম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বছরে আনুমানিক দেড় থেকে দুই লাখ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। ড্যামের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও অবকাঠামোর ছোটখাটো মেরামতের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিলও দিতে হয়। বর্তমানে বছরে বিদ্যুৎ বিল প্রায় এক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তাই রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়মিত অর্থের সংস্থান থাকা জরুরি। রাবারড্যাম নির্মাণের প্রকল্প শেষ হয়ে যাওয়ায় এর নিয়মিত পরিচালন ব্যয় বহনের জন্য আলাদা ব্যবস্থা প্রয়োজন। পরিচালনা কমিটির দায়িত্ব হচ্ছে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসারে তহবিল গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় নির্বাহ করা। তবে এ ক্ষেত্রে বিএডিসি ও উপজেলা প্রশাসনও সহযোগিতা করতে পারে। কৃষকেরা ড্যামের সুফল ভোগ করছেন—এ বিষয়টি তাঁদের বোঝাতে সভা ও আলোচনার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা কার্যকর করা যেতে পারে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: ড্যাম সংস্কার ও সুরক্ষার জন্য প্রাক্কলন পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। কবে নাগাদ কাজ শুরু হতে পারে?
কাজী হোসনে আর রাফি: ড্যাম সংস্কারের জন্য প্রাক্কলন পাঠানো হয়েছে। এটি এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পানি নেমে গেলে রাবার ব্যাগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি বোঝা যাবে। তবে এর আগেই বরাদ্দ পাওয়া গেলে কাজ শুরু করা সম্ভব হতে পারে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আগামী বোরো মৌসুমের আগে ড্যাম সুরক্ষায় পরিচালনা কমিটি কী ধরনের জরুরি পদক্ষেপ চায়?
কাজী সালেহ আহমদ: ড্যামের বর্তমান পরিস্থিতিতে রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলীকে জানানো হয়েছে। তিনি বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। পানি নেমে যাওয়ার পর রাবার ব্যাগের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বোঝা যাবে। এরপর দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা করতে হবে। রাবার ব্যাগের ক্ষতি হলে তা মেরামতের জন্য বিএডিসির সহযোগিতা প্রয়োজন। ড্যামটি সুরক্ষিত না থাকলে হাওরের বোরো ফসল পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই আগামী বোরো মৌসুমের আগেই ড্যাম পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নৌকা চলাচল বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আগামী বোরো মৌসুমের আগে ড্যাম রক্ষায় বিএডিসির সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ কী?
কাজী হোসনে আর রাফি: পানি নেমে গেলে রাবার ব্যাগের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হবে। গত কয়েক বছর বড় ধরনের ক্ষতি ছাড়াই ড্যামটি টিকে থাকলেও এবার নৌকা চলাচলের কারণে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা পরীক্ষা ছাড়া বলা সম্ভব নয়। ক্ষতি পাওয়া গেলে পরিচালনা কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নৌকা চলাচল বন্ধে আগের ব্যারিকেডের পরিবর্তে আরও শক্তিশালী লোহার অ্যাঙ্গেল ব্যবহারের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় গ্রাম পুলিশকে দায়িত্ব দেওয়া গেলে ড্যাম পাহারা ও নৌকা চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন