প্রতিমা ও মণ্ডপ সাজাতে ব্যস্ত শিল্পীরা

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:০৪

শরৎ মানেই নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা আর কাশফুলের দোলা। প্রকৃতির এই স্নিগ্ধ সৌন্দর্যে্যর মধ্যেই শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। প্রকৃতির কোমল রূপ আর দেবীশক্তির আরাধনার মেলবন্ধনে শরৎ হয়ে উঠেছে অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসবের ঋতু।

 


সুনামগঞ্জ জেলায় শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। মহালয়া শেষে দেবী দুর্গার আগমনের অপেক্ষায় রয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। শহরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রতিমায় রং করা, মণ্ডপ সাজানো ও আলোকসজ্জার কাজ শেষ মুহূর্তে চলছে জোরেশোরে। প্রতিমাশিল্পীরা দিন—রাত পরিশ্রম করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব উদযাপনে তিন ধাপে নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েছে পুলিশ। আয়োজক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হবে দুর্গোৎসব। 

 

 

 

 


রবিবার বিকালে সরেজমিনে শহরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, প্রতিমার শেষ মুহূর্তের কাজ, মণ্ডপ সাজানো ও আলোকসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পী, ডেকোরেশন কমী ও আয়োজকেরা। কোথাও প্রতিমায় রং ও সাজসজ্জার কাজ চলছে, আবার কোথাও মণ্ডপের সৌন্দর্য বাড়াতে চলছে আলোকসজ্জা ও অন্যান্য প্রস্তুতি। এরই মধ্যে প্রতিমা দেখতে মণ্ডপে আসছেন নানা বয়সী মানুষ। স্কুল ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দেখছেন শিক্ষার্থীরা। পূজার দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে উৎসাহ—উদ্দীপনা। সব মিলিয়ে প্রতিমা ও মণ্ডপের প্রস্তুতিকে ঘিরে শহরের পূজামণ্ডপগুলোতে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ।

 


পূর্ব নতুনপাড়ার প্রতিমা দেখতে মণ্ডপে আসা শতাব্দী দাস বলেন, দুর্গাপূজার প্রস্তুতি এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিছু কাজ এখনো বাকি থাকলেও প্রতিমাশিল্পীরা পুরোদমে কাজ করছেন। পূজার আগেই সব প্রস্তুতি শেষ হবে বলে আশা করছেন তারা। দেবী দুর্গার আগমনে সবার জীবন শান্তি, সমৃদ্ধি ও সুখে ভরে উঠুক—এমন প্রত্যাশা তার।
প্রতিমা তৈরির কাজে যুক্ত জয় দাস বলেন, আমরা প্রায় এক মাস ধরে মণ্ডপে কাজ করছি। এখন কাজ শেষ পর্যায়ে। দিন—রাত পরিশ্রম করে মহাষষ্ঠী পূজার আগেই সব কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি। সবার মধ্যে দেবী দুর্গাকে বরণ করার আনন্দ ও উৎসাহ কাজ করছে। নির্ধারিত সময়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে সবাই হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছেন।
সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অর্ণব তালুকদার জানায়, স্কুল শেষে বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিমা দেখতে এসেছে সে। পূজা শুরু হলে সবাইকে মণ্ডপে এসে প্রতিমা দর্শন ও উৎসবে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণও জানালো সে।

 


ঋষিকেশ বণিক বলেন, মহালয়া শেষ হয়েছে। এখন দেবী দুর্গাকে বরণ করার প্রস্তুতি চলছে। পূজাকে ঘিরে সবার মধ্যে আনন্দ ও উৎসাহ বিরাজ করছে।
পূর্ব নতুনপাড়া সর্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটির সভাপতি স্বপন চন্দ্র সরকার বলেন, আমাদের পূজা মণ্ডপ সজ্জার কাজ প্রায় শেষ। প্রতিমায় রং করার কাজও শেষ হয়েছে। এখন চলছে আলোকসজ্জার কাজ। আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে এই কাজও শেষ হবে। তিনি বলেন, প্রায় ৪০ বছর ধরে পূর্ব নতুনপাড়ায় শান্তিপূর্ণ ও উৎসাহ—উদ্দীপনায় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। 
নবীনগরের প্রতিমাশিল্পী যোগেশ্বর দাস জানান, দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরির কাজ তাঁদের কাছে শুধু পেশা নয়, আবেগ ও ভালোবাসার বিষয়। সারা বছর তারা দুর্গোৎসবের অপেক্ষায় থাকেন। তবে অনেক সময় পূজার অল্প কিছুদিন আগে প্রতিমা তৈরির অর্ডার পাওয়ায় কাজ শেষ করতে বাড়তি চাপ নিতে হয়। আগে থেকে অর্ডার পেলে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা এবং পর্যাপ্ত সময় নিয়ে প্রতিমা তৈরির সুযোগ পাওয়া যেত। 

 

 

 

 

 


তিনি আরও জানান, দেবী দুর্গার আগমন তাঁদের কাছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। দুর্গাপূজায় পরিবার—পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ আরও দৃঢ় হয়। এসব কারণেই সারা বছর তাঁরা দুর্গোৎসবের অপেক্ষায় থাকেন।


দুর্গোৎসব আনন্দ ও জাগরণের প্রতীক উল্লেখ করে শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে বলেন, রামকৃষ্ণ মিশন প্রাঙ্গণে প্রতিবছরের মতো এবারও সাত্ত্বিকভাবে মায়ের পূজার আয়োজন হচ্ছে। শারদোৎসব উপলক্ষে আনন্দের আবহ যেন সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে— সেই প্রত্যাশা জানালেন তিনি।

 


জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিপ্রেশ রায় বাপ্পী বলেন, এ বছর জেলার ১২টি উপজেলায় ৪৪৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। সুনামগঞ্জ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সুন্দরভাবে শারদীয় দুর্গোৎসব সম্পন্ন করতে চাই আমরা। 
তিনি আরও বলেন, পূজার প্রস্তুতি ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও পৌর প্রশাসনের কর্মকর্তারা খোঁজখবর নিচ্ছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যরাও খোঁজখবর রাখছেন। সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গোৎসব সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

 


এদিকে দুর্গোৎসব ঘিরে নিরাপত্তা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন। তিনি বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যেন নির্বিঘ্নে ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন করতে পারেন, এজন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পূজার আগে ও পূজার দিনগুলোতে এবং প্রতিমা বিসর্জনের সময়— এই তিন ধাপে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

 


পুলিশ সুপার বলেন, প্রতিটি পূজামণ্ডপের পরিস্থিতি ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা সাজানো হবে। কোথাও স্থায়ীভাবে পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবেন, আবার কোথাও ভ্রাম্যমাণ পুলিশ দল দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি সাদাপোশাকে পুলিশ সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন। নিরাপত্তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও যোগাযোগব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পূজামণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানানো হয়েছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে আজান ও নামাজের সময় উচ্চ শব্দে মাইক বা বাদ্যযন্ত্র বাজানো থেকে বিরত থাকার বিষয়েও অনুরোধ করা হয়েছে। পূজা উদযাপন—সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ এসব বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। অতীতের মতো এবারও শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গোৎসব সম্পন্ন হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার