‘শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো গড়ে তুলতে হবে’

প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:৪৯

শিক্ষকতা শুধু পাঠদান বা ভালো ফল করানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, শিক্ষার্থীদের প্রতি স্নেহ, মমতা ও মানবিক দায়িত্ববোধও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধর্মপাশার বেরীকান্দী বড়খলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছাম্মৎ নাইলা বেগম এক শিক্ষার্থীর ছেঁড়া জামা সেলাই করে দিয়ে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর এ উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসিত হয়েছে। শিক্ষক—শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’য় এ নিয়ে কথা বলেছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক যোগেশ্বর দাশ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শিক্ষকতার মানবিক দিক নিয়ে শুরুতেই জানতে চাই। একজন শিক্ষার্থীর ছেঁড়া জামা নিজের হাতে সেলাই করে দেওয়ার এই ছোট্ট উদ্যোগের মধ্য দিয়ে কী বার্তা ফুটে উঠেছে?
যোগেশ্বর দাশ: সত্যিকার অর্থে শিক্ষকতা শুধু বই পড়ানো নয়। শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো স্নেহ—মমতা দিয়ে পাঠদান করতে হয়। সেই জায়গা থেকেই প্রধান শিক্ষিকা নাইলা বেগম তাঁর এক শিক্ষার্থীর ছেঁড়া জামা দেখে মাতৃস্নেহে নিজের হাতে তা সেলাই করে দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি একজন আদর্শ শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। আমি বিষয়টি জেনে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি। কারণ, একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু পাঠদান করা নয়; শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো, সহযোগিতা করা এবং মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটানোও তাঁর দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: বর্তমান সময়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক কতটা আন্তরিক ও মমতাপূর্ণ বলে মনে করেন? একসময় শিক্ষক—শিক্ষার্থীর মধ্যে যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল, এখন কি সেই জায়গায় পরিবর্তন এসেছে?
যোগেশ্বর দাশ: সত্য কথা বলতে গেলে, বিষয়টি বলতে গিয়ে একজন শিক্ষক হিসেবে আমার নিজেরই লজ্জা হয়। বর্তমানে শিক্ষক—শিক্ষার্থীর সম্পর্ক আগের মতো আন্তরিক ও শ্রদ্ধাপূর্ণ নেই বললেই চলে। আমাদের সময়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে দেখলে শ্রদ্ধা ও ভয়ে সরে যেত, যাতে কোনো ভুলত্রুটি চোখে না পড়ে। আর এখন অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দেখলে শিক্ষকদেরই এড়িয়ে চলতে হয়। পরিস্থিতির এমন পরিবর্তন দুঃখজনক।


বিশেষ করে মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে পাঠদানের মান এবং শিক্ষক—শিক্ষার্থীর সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। এখন অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনার চেয়ে প্রাইভেট ও কোচিংনির্ভর হয়ে পড়ছে। এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের গুরুত্ব ও শিক্ষক—শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্তরিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষকের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
যোগেশ্বর দাশ: একজন শিক্ষক শুধু বিদ্যালয়ে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু পড়িয়ে তাঁর দায়িত্ব শেষ করতে পারেন না। শিক্ষার্থীদের আচার—আচরণ, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক গুণাবলি শেখানোও তাঁর দায়িত্ব। একজন শিক্ষার্থী পরিবারের বড়দের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করবে, ছোটদের সঙ্গে কীভাবে মিশবে, সমাজের মানুষের প্রতি কী ধরনের দায়িত্ব পালন করবেÑএসব বিষয়ও তাকে শেখাতে হবে।


নৈতিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটলে তার ব্যক্তিজীবন ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষকদের নৈতিক চরিত্র গঠনের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তান মনে করে তাদের মধ্যে মমত্ববোধ, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: একজন আদর্শ শিক্ষককে কি শুধু পাঠদানের দক্ষতা দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত, নাকি তাঁর আচরণ, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ?
যোগেশ্বর দাশ: শুধু পাঠদানের দক্ষতা নয়, একজন শিক্ষকের আচরণ, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সমাজের সবার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করতে পারে এবং গ্রহণযোগ্য মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
শিক্ষার্থীরা অনেক সময় শিক্ষকের কথা মা—বাবার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে শোনে। তাই কোনো ভুল করলে শাস্তি না দিয়ে বুঝিয়ে সঠিক পথে ফেরানোর চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। মারধর নয়, স্নেহ, ভালোবাসা ও আদর্শ আচরণের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের সংশোধন করা উচিত।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: ধর্মপাশার প্রধান শিক্ষক নাইলা বেগমের এই উদ্যোগ অন্য শিক্ষকদের কতটা অনুপ্রাণিত করতে পারে?
যোগেশ্বর দাশ: তাঁর এ উদ্যোগ অবশ্যই অন্য শিক্ষকদের অনুপ্রাণিত করবে। সংবাদটি পড়ে ও ছবি দেখে আমি আবেগাপ্লম্নত হয়েছি। শিক্ষার্থীর ছেঁড়া জামা নিজের হাতে সেলাই করে দিয়ে তিনি মাতৃস্নেহ ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের প্রতি শিক্ষকদের এমন মমত্ববোধ থাকা প্রয়োজন। এটি অন্য শিক্ষকদের জন্যও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত।


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শিক্ষকদের মানবিক ও ইতিবাচক কাজগুলো সামনে আনা কেন জরুরি?
যোগেশ্বর দাশ: শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর। তাঁদের ভালো কাজগুলো তুলে ধরলে অন্য শিক্ষকরাও অনুপ্রাণিত ও দায়িত্বশীল হবেন। নাইলা বেগমের উদ্যোগ একজন শিক্ষকের মানবিক মূল্যবোধের বাস্তব উদাহরণ। এমন কাজ শিক্ষার্থীদের মনে শিক্ষকের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা তৈরি করে এবং সমাজে শিক্ষকতার মানবিক দিকটি তুলে ধরে।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আগামীর শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি স্নেহ, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ ফিরিয়ে আনতে শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষা বিভাগের কী করণীয় রয়েছে?


যোগেশ্বর দাশ: প্রথমত, বর্তমানে মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মোবাইল ফোন তৈরি করা হয়েছিল মানুষের উপকারের জন্য। শিশুদের মধ্যেও মোবাইলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি তৈরি হচ্ছে। এতে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই, সন্তানদের হাতে অতিরিক্ত সময়ের জন্য মোবাইল ফোন তুলে দেবেন না। প্রয়োজন ছাড়া মোবাইল ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। আমাদের সময়ে অভিভাবকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে এসে খেঁাজ নিতেন, ঠিকমতো ক্লাস করছে কি না, পড়াশোনা করছে কি না। কিন্তু বর্তমানে অনেক অভিভাবক সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ মনে করেন। সে ঠিকমতো পড়াশোনা করছে কি না, কোথায় যাচ্ছে, কী করছে—এসব বিষয়ে খেঁাজ রাখেন না। এই প্রবণতা পরিবর্তন করতে হবে।


তৃতীয়ত, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বিভাগের দায়িত্ব অনেক বেশি। শুধু পরিদর্শক নিয়োগ করলেই হবে না; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম, শিক্ষকদের দায়িত্ব পালন এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিও যোগ্য ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়ে গঠন করা প্রয়োজন।


একই সঙ্গে যারা শিক্ষকতা পেশায় আসবেন, তাঁদের এই পেশার দায়িত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। একজন আদর্শ শিক্ষক হতে হলে নিয়মিত পড়াশোনা করতে হবে, জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে শ্রেণিকক্ষে যেতে হবে। শুধু প্রাইভেট পড়িয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার