প্রকাশিত: ০৩ নভেম্বর, ২০২৬ ২৩:১৮
হাওরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার প্রভাব পড়ছে কৃষকের জীবনে। বছরের পর বছর লোকসানের কারণে বড় কৃষক হয়ে পড়ছেন মাঝারি, মাঝারি কৃষক হচ্ছেন ছোট কৃষক। আর ছোট কৃষকদের অনেকেই পরিণত হচ্ছেন ক্ষেতমজুরে। চলতি মৌসুমে বাজারে ধানের দাম কমে যাওয়ায় আরও বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। এ পরিস্থিতি, লোকসান ও কৃষকের সংকট নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের প্রতিদিনের আয়োজন ‘খবরনামা’য় কথা বলেছেন বড় কৃষক ও জনপ্রতিনিধি মো. সাত্তার মিয়া। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার ও ডিজিটাল ইনচার্জ সাইদুর রহমান আসাদ।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শুরুতেই জানতে চাই, বর্তমানে বাজারে ধানের দাম কত?
মো. সাত্তার মিয়া: বর্তমানে নিচু মানের ধান ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। আর তুলনামূলক ভালো মানের ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মণ।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: গত বছর এ সময়ে ধানের দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা মণ ছিল। এবার দাম এত কমে যাওয়ার কারণ কী?
মো. সাত্তার মিয়া: বৃষ্টির কারণে অনেক ধান কালো হয়ে গেছে। এ ধরনের ধান ব্যবসায়ীরা কিনতে চান না, মিলেও নিতে চায় না। খাদ্যগুদামেও এসব ধান কেনা হচ্ছে না। ভালো ধানের দামও এখন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। এ ছাড়া বাজারে ধানের চাহিদা কমে যাওয়া এবং মিল মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণেও কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। বাজারের এই সিন্ডিকেট দ্রুত বন্ধ করতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আপনি একজন বড় কৃষক। প্রতিবছর প্রায় ১৫০ কেয়ার জমিতে ধানের আবাদ করেন। বাজারে ধানের দাম কম থাকায় আপনি কী ধরনের সমস্যায় পড়েছেন?
মো. সাত্তার মিয়া: আমি এবার ধান নিয়ে বড় সমস্যায় পড়েছি। ধান বাড়িতে ফেলে রাখতেও পারছি না, আবার বিক্রিও করতে পারছি না। কেউ ধান কিনতে চায় না। শেষ পর্যন্ত আমার ধান অন্যের কাছে দিয়ে দিতে হয়েছে। আগে যেখানে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হতো, এবার কৃষকেরা সেই ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আপনি ধান বিনামূল্যে দিয়ে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। কেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে হলো?
মো. সাত্তার মিয়া: কৃষিকাজে এত কষ্ট করার পরও যদি ধানের সঠিক দাম না পাই, বিক্রি করতে না পারি, তাহলে ধান রেখে কী করব? ধান নিয়ে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছি যে বাধ্য হয়ে অন্যের হাতে দিয়ে দিতে হয়েছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আপনার মতো বড় কৃষকের যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে জেলার অন্যান্য কৃষকের পরিস্থিতি কেমন হতে পারে? হাওর এলাকার অর্থনীতি কতটা কৃষির ওপর নির্ভরশীল?
মো. সাত্তার মিয়া: হাওর এলাকার মানুষের প্রধান ফসল ধান। কৃষির বাইরে আমাদের আয়ের তেমন কোনো পথ নেই। ছেলে—মেয়েদের বিয়ে—শাদি, পড়াশোনা, বাজার—সদাই সবকিছুই ধানের উপর নির্ভর করে। কৃষক ধানের ন্যায্য দাম না পেলে সংসার চালাবে কীভাবে? ধান আমাদের জরুরি সম্পদ। এভাবে প্রতিবছর লোকসান হলে কৃষকেরা কৃষিকাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। এতে কৃষি উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: চলতি মৌসুমে আপনার কী পরিমাণ লোকসান হয়েছে?
মো. সাত্তার মিয়া: এবার আমার প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকার ধান বিক্রি হয়েছে। অনেক ধান জমিতে পড়ে ছিল। সেগুলো কেটে বাড়িতে আনতে পারিনি। পরে অন্যের হাতে দিয়ে দিতে হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ধানের ক্ষতি হয়েছে, তার ওপর বাজারেও ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে কৃষকেরা বড় বিপদে পড়েছেন।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: ধানের দাম কমে যাওয়ার পেছনে বাজার সিন্ডিকেটের কথা বলছেন। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের কী করণীয় বলে মনে করেন?
মো. সাত্তার মিয়া: সরকারকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে যারা সিন্ডিকেট করে কম দামে ধান কেনার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষকের উৎপাদিত ধানের সঠিক দাম নিশ্চিত করা জরুরি।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: ধানের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকের গবাদিপশু পালনেও কি প্রভাব পড়ছে?
মো. সাত্তার মিয়া: অবশ্যই প্রভাব পড়ছে। ধান বিক্রি করে কৃষকেরা গরু পালন করেন। কিন্তু এবার ধান বিক্রি করে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। গোখাদ্য কেনার সামর্থ্য না থাকায় অনেকে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। গরু—বাছুরও কৃষকের আয়ের একটি উৎস। ধানের দাম না পেলে এই খাতেও সংকট তৈরি হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সামনে বড় মৌসুমের আবাদে এই পরিস্থিতির কী প্রভাব পড়তে পারে?
মো. সাত্তার মিয়া: এই লোকসানের প্রভাব পরবর্তী আবাদেও পড়বে। সরকার যদি এখনই কৃষকের পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে অনেক কৃষক জমি চাষ করতে পারবেন না। প্রতিবছর লোকসান হলে কৃষকেরা কৃষিকাজে আগ্রহ হারাবেন। তাই ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন