উৎপাদন খরচ তুলতে কৃষকের হিমশিম দশা

প্রকাশিত: ০৩ নভেম্বর, ২০২৬ ২৩:২৫

মধ্যনগরে ধানের বাজার

বৈরী আবহাওয়া, জলাবদ্ধতা আর নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে কয়েক মাসের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে ঘরে ধান তুলেছিলেন হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা। সেই ধান বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ, সংসারের খরচ মেটানো আর আগামী ফসলের প্রস্তুতি নেওয়ার স্বপ্ন ছিল তাদের। কিন্তু ধানের বাজারে ধস নামায় সেই স্বপ্নে এখন হতাশার ছায়া। বিশেষ করে গত বছর ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় যেসব ধানের রং কালচে হয়ে গেছে, সেগুলো বিক্রি করতে গিয়ে এক আড়ত থেকে অন্য আড়তে ঘুরতে হচ্ছে কৃষকদের। ভালো মানের ধান বিক্রি করেও মিলছে না প্রত্যাশিত দাম। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

 


হাওরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ধানের আড়ত হিসেবে পরিচিত মধ্যনগর বাজার। মঙ্গলবার বাজারের বিভিন্ন আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, ধান বিক্রি করতে এসে বিপাকে পড়ছেন কৃষকেরা। বিশেষ করে কালচে রঙের ধান কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না অনেক মিল মালিক। কেউ কেউ কিনতে চাইলেও দাম বলছেন মণপ্রতি ৬০০ থেকে ৬৭০ টাকা। অন্যদিকে ভালো মানের ধান বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি প্রায় ১ হাজার ২৮০ টাকায়। একই বাজারে ধানের মানভেদে দামের এমন বড় ব্যবধান কৃষকদের লোকসানের শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

 

 

 

 


মধ্যনগর বাজারে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক চিত্ত তালুকদার জানান, জলাবদ্ধতার কারণে তাঁর ধানের রং কিছুটা কালচে হয়ে গেছে। এ কারণে ধানের নমুনা নিয়ে বিভিন্ন আড়তে ঘুরছেন তিনি। কিন্তু কেউ ধান কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। একটি আড়তে মণপ্রতি ৬০০ টাকা দাম বলা হলেও এখনো ধান বিক্রি করেননি তিনি। কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে হতাশ এই কৃষক।
একই বাজারে কৃষক কফিল উদ্দিন মণপ্রতি ৬৭০ টাকা দরে ধান বিক্রি করেছেন। তিনি জানান, বেশ কিছু দিন ধরে ধান বিক্রির জন্য বিভিন্ন আড়তে ঘুরেছেন। অবশেষে বাধ্য হয়ে কম দামেই ধান বিক্রি করতে হয়েছে। কিন্তু এই দামে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

 


ভালো মানের ধান উৎপাদন করেও স্বস্তিতে নেই কৃষক পার্থ তালুকদার। তিনি জানান, তাঁর ধান মণপ্রতি ১ হাজার ২৮০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। কিন্তু সার, কীটনাশক, ডিজেল, সেচ ও শ্রমিকের মজুরিসহ উৎপাদনের প্রতিটি খাতেই খরচ বেড়েছে। ফলে এই দামে ধান বিক্রি করেও উৎপাদন খরচ তোলা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। 

 

 

 

 

 


কৃষকদের এমন পরিস্থিতির পেছনে ধানের রং ও মানের বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় আড়তদারেরা। মধ্যনগর বাজারের ধান ক্রয়কারী আড়তদার আলীনূর মড়ল জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকার মিল মালিকেরা মধ্যনগর থেকে ধান কিনে নিয়ে যান। তাদের হয়ে ধান সংগ্রহ করে দেওয়ার বিপরীতে আড়তদারেরা প্রতি মণে ২৮ টাকা কমিশন পান। তবে এ বছর ধানের রং নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মিল মালিকেরা ধান কিনতে আগ্রহ কম দেখাচ্ছেন। এ কারণে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বাজারে ধানের বেচাকেনা অনেক কম।
একই বাজারের আড়তদার জ্যোতির্ময় রায় জানান, গত বছরের তুলনায় এবার তিনি প্রায় অর্ধেক ধান কিনেছেন। ধানের রং কালচে হয়ে যাওয়ায় মিল মালিকেরা এসব ধান নিতে চাচ্ছেন না। ফলে বাজারে ধানের বেচাকেনা কমে গেছে।

 


ধান ক্রয় করতে আসা আশুগঞ্জের মিল মালিক উজ্জ্বলের প্রতিনিধি নুরুল হক জানান, ধানের রং কালচে হলেও যেসব ধানে চালের পরিমাণ ভালো পাওয়া যায়, সেগুলো তুলনামূলক ভালো দামেই কেনা হয়। মূলত ধানের গুণগত মান, চালের উৎপাদন হার ও বাজারে চালের চাহিদার ওপর নির্ভর করেই দাম নির্ধারণ করা হয়। তিনি বলেন, কিছু ধান থেকে চালের পরিমাণ কম পাওয়া যায়, ফলে সেগুলো কম দামে কিনতে হয়। আবার অনেক ধান থেকে চালের পরিমাণ ভালো পাওয়া গেলেও উৎপাদিত চালের বাজারমূল্য কম থাকায় সেসব ধানও তুলনামূলক কম দামে ক্রয় করতে হয়। এ কারণে ধানের বাহ্যিক রংয়ের পাশাপাশি চালের উৎপাদন ও বাজারমূল্য বিবেচনায় নিয়ে ধানের দাম নির্ধারণ করা হয়।

 


এদিকে মধ্যনগর ও ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আসয়াদ বিন খলিল রাহাত বলেন, সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের পরিমাণ আরও বাড়ানো হলে কৃষকেরা উপকৃত হবেন। হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে বিভিন্ন পর্যায়ের সভায় ধান শুকানো এবং সরাসরি মিলিংয়ের ব্যবস্থা করার জন্য আমরা সুপারিশ করেছি। এছাড়া কৃষকেরা যাতে দ্রুত ফসল ঘরে তুলতে পারেন, সে লক্ষ্যে আগাম জাতের ব্রি ধান—১১৮ চাষাবাদে তাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় উপজেলা কৃষি অফিস সবসময় তাদের পাশে রয়েছে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার