প্রকাশিত: ০৩ নভেম্বর, ২০২৬ ২৩:৩৪
রূপের নদী যাদুকাটার বালুমহাল ছাড়িয়ে লুটপাটকারীদের নজর এখন মূল নদীতে। যাদুকাটা ১ ও ২ বালুমহালে নির্বিঘ্নে সেইভ মেশিন দিয়ে তীরে তাণ্ডব চালানোর পাশাপাশি এখন লুট করা হচ্ছে বিভিন্ন গ্রামের পাড়। ঘাগড়াকে ক্ষতবিক্ষত করে দিনে দুপুরে আয়োজন করে বালু লুট হচ্ছে মোদেরগাঁওয়ে। কেউ কেউ নিজের ব্যাক্তি মালিকানাধীন জমি কেটে বালু উত্তোলন করে নিজেই বিক্রি করছেন। অন্যের জমি শক্তির প্রভাবে লুট করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও আছে। তবে এই সব কিছুর উপরই আছে জ্বীনের আছড়। যার ভয়ে মুখ খুলতে নারাজ এলাকাবাসী। নেয়া যায় না নদী ও গ্রামের তীর কাটার ছবি। সবাই যেন নীরবে সয়ে যাচ্ছেন লুটপাটকারীদের অত্যাচার।
.jpg)
বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে ঘাগড়ার অপর পাড় মোদেরগাঁওয়ে উপস্থিত প্রতিবেদক। সড়ক থেকে নামতেই চোখে পড়লো দুটি গোলপোস্ট দাঁড়িয়ে আছে বিশাল একটি মাঠে। দেখেই বোঝা যায় এখানেই খেলাধুলা করে এলাকার শিশু—কিশোররা। আর কিছুদিন পর হয়তো এই মাঠটি হবে নদী। কারণ মাঠের পশ্চিম পাশে চলছে অবৈধ সেইভ মেশিন দিয়ে পাড় কাটার বিশাল আয়োজন। টানানো হয়েছে ত্রিপাল দিয়ে অস্থায়ী কয়েকটি তাঁবু। যেখানে বসে খাতা কলমে লুটপাটের হিসেব রাখছেন ম্যানেজাররা। বসানো হয়েছে স্থায়ী তেলের দোকান। সরকারি ভূমি কেটে শতকোটি টাকায় বিক্রি করে সম্পদের পাহাড় গড়ার আয়োজনের কোন কমতি রাখা হয়নি। উৎসবের আয়োজন করেই চলছে লুটপাট। কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, শনিবার থেকে চলছে মোদেরগাঁওয়ের তীর কাটা। মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ। ক্যামেরায় এসব কথা নেয়ার চেষ্টা করলে জ্বীনের ভয়ে সবাই চুপ, কেউ কথা বলতে রাজি না। অনেকটা কৌশল করে গোপনে নিতে হলো ভিডিও—ছবি। কেউ কথা না বলায় বাধ্য হয়ে নদী পাড় হয়ে যাই ঘাগড়া পাড়ে।
সাংবাদিক পরিচয় শুনে এগিয়ে এলেন মাফিকুল ইসলাম নামের একজন এগিয়ে এলেন সাহস করে। জানালেন, সকাল হলেই পাড় না কাটার মাইকিং শুনেন, প্রশাসনের অভিযানও দেখেন। এরপরও থামে না পাড় কাটা। প্রতিনিয়ত শেইভ মেশিন দিয়ে চালানো হচ্ছে তাণ্ডব। কেউ নিজের জমি বিক্রি করতেছে কেউ আবার প্রভাব খাটিয়ে গরিব অসহায়ের জমি লুটে নিচ্ছে। অভিযোগ করলেন প্রশাসনও নাকি অর্থ পায় এই অবৈধ কাজের। জানালেন জড়িত স্থানীয় কয়েকজনের নাম। যাছাই—বাছাই করতে না পারায় নামগুলো উল্লেখ করা যাচ্ছে না।
ফেরার পথে ঘটে আরেক কাণ্ড। রেগে খেয়াঘাট বন্ধ করে চলে যাচ্ছেন মাঝি। কারণ জানতে চাইলে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘নদীর ঘাট তারাই দখল কইরা রাখছে। গোদারার নৌকাও পাড় ভিড়তে দের না। পাড়ও সব তারার মালের (বালু) নৌকা। গোদারার নৌকা ভিড়ার জায়গা নাই। ইলা অইলে গুদারা পাড়ানি বন্ধ করি দিতে অইব।’
একই অভিযোগ জানান স্থানীয় কয়েকজন খেয়াঘাটের যাত্রী। তারা বলেন, তারা মাল তুলের তুলক, আমাদের আসা যাওয়ার ঘাট কেনে বন্ধ কইরা রাখছে। গুদারা পাড়ে ভিড়ে না। গুদারা ঘাটে নৌকা লাগাইয়া মাল (বালু) তুলতেছে।
(1).jpg)
ঘাগড়া পাড়ে থেকে নিরাপদে গিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের তথ্য জানাই অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল ও তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপা মণি দেবীকে। ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলেন সাড়া দেন তারা দুইজন।
এরপর অনেক আকুতি মিনতি করে মাঝিকে নিয়ে ফেরার পথে বেলা ১২ টার দিকে হঠাৎ দেখি একযোগে সকল নৌকা পালাচ্ছে। কারণ জানতে চাইলে বলেন এসিল্যান্ড আসতেছে। জ্বীনের যাদুতে ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানের আগেই তাদের কাছে খবর চলে আসে।
শেষ মূহূর্তের এই চিত্র ধারণ করার সময় আর ফাঁকি দিতে পারিনি তাদের। হঠাৎ ৩—৪ জন এসে ঘিরে ধরে। ছবি কেন তুললাম পড়ি সেই প্রশ্নের মুখে। ভিডিও কাটার জন্য চলে একের পর এক অনুরোধ। পাড় কাটা নয় সেতুর ভিডিও করতে আসছি বলে কৌশলে চলে আসতে চাইলে একজন জানান, তাদের চোখ ফাঁকি দেয়া সম্ভব না। কেউ যেন ভিডিও করতে না পারে সেজন্য অন্তত ২৫ জন লোক নিয়োগ করে রাখা হয়েছে। তাদের পাড় কাটার কোন সংবাদ করবো না এই আশ্বাসে ফিরে আসি।
তাহিরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিএমএসআর আলিফ জানান, মোদেরগাঁওয়ে পাড় কাটা হচ্ছে এই খবরে আমরা অভিযান চালাই। কিন্তু ওইখানে গিয়ে আমরা কাউকে পাইনি। এর আগেই সবাই নৌকা নিয়ে চলে যায়। এরপর আরেকটু সামনে গিয়ে লাউড়েরগড় এলাকায় পাড় কাটার সময় দুইটি নৌকাকে এক লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযানের আগে খবর কিভাবে আসে লুটপাটকারীদের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমাদের এখান থেকে অনেক দূরত্ব যাদুকাটা নদী। যাওয়ার পথে হয়তো কেউ খবর দিয়ে দেয়। অথবা তারা বিভিন্ন জায়গায় মানুষ ঠিক করে রাখে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন