প্রকাশিত: ০৩ নভেম্বর, ২০২৬ ২৩:৩০
হাওরাঞ্চলে ধানের বাজারে বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। যে ধান প্রতি মণ ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হতো, সেই ধানের দাম এখন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন হাওরাঞ্চলের লাখো কৃষক। কষ্ট করে ফলানো ও জমিয়ে রাখা ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে বাধ্য হয়েই কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের। এতে উৎপাদন খরচ তুলতেই দুশ্চিন্তা কৃষকের।
হাওরের কৃষকদের কাছে ধানই সারা বছরের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। বোরো ধান উৎপাদনে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরিসহ বিভিন্ন খাতে তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফসল ঘরে তোলার পর ভালো দামে ধান বিক্রির আশায় থাকলেও বাজারে দরপতনে এখন হতাশ কৃষকেরা। ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় পরিবারের খরচ মেটানো এবং আসছে মৌসুমে চাষাবাদের প্রস্তুতি নেওয়া নিয়েও উৎকণ্ঠায় অনেকে। কৃষকদের ভাষ্য, বৈশাখ মাসে পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যতটুকু ধান দরকার, তা রেখে বাকি ধান বিক্রির পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু বাজারে দাম কমে যাওয়ায় এত দিন জমিয়ে রাখা ধান এখন কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন তাঁরা।
মধ্যনগর উপজেলার বংশিকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, গত বছর এ সময়ে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। অথচ এবার একই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকায়। আর জলাবদ্ধতায় কিছুটা কালো হয়ে যাওয়া ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা মণ দরে। তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে আমার গ্রামের এক কৃষক ১৫০ মণ ধান মাত্র ৯০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছে। এতে উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের ইসলামপৃর গ্রামের বাসিন্দা মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১ হাজার ১০০ টাকা। অথচ সেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ১ হাজার ২০ টাকায়। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরিসহ সব খরচ হিসাব করলে ধান বিক্রি করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এভাবে ধানের দাম কম থাকলে কৃষিকাজ করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।
কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ ধানের দাম ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা। কিন্তু এই দামেও ধান বিক্রি করতে পারছি না। ক্রেতারাও ধান কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এ কারণে বোরো ধান চাষ করে লোকসানে পড়েছি। তিনি বলেন, গত বছরের মতো প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলে, অন্তত উৎপাদন খরচ মিটিয়ে কিছুটা লাভের মুখ দেখা যেত।
কৃষক আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, চাতাল ও মিল মালিকেরা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনলেও বাজারে চাল বিক্রি করছেন বেশি দামে। ধানের রং কিছুটা কালো হওয়ার অজুহাতে কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কেনা হচ্ছে। অথচ ধানের রঙের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজারে চালের দাম কমেনি। তাদের দাবি, সরকারের যথাযথ নজরদারি ও তদারকির অভাবে চাতাল ও মিল মালিকেরা নিজেদের ইচ্ছেমতো ধানের দাম নির্ধারণ করছেন। এতে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাওরের কৃষকেরা। লোকসানের বোঝা কাঁধে নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়ছেন লাখো কৃষক।
বাংলাদেশ কৃষক সমিতি সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, এবার কৃষকের ধানের দাম অত্যন্ত হৃদয়বিদারক পর্যায়ে নেমে এসেছে। গত কয়েক বছরও এ সময়ে কৃষকেরা প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করতে পেরেছেন। কিন্তু এ বছর অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ধানের রং কিছুটা কালো হয়ে যাওয়ায় সেই সুযোগ নিচ্ছেন চাতালমালিক ও ফরিয়া ব্যবসায়ীরা। তারা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনলেও বাজারে চালের দাম কমান নি। এতে কৃষকেরা লোকসান গুনলেও লাভবান হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
তিনি আরও বলেন, এ বছর ধান বিক্রি করে কৃষকদের যে পরিমাণ লোকসান হচ্ছে, তা আগামী তিন বছরেও পুষিয়ে উঠা কঠিন হবে। অথচ এ বিষয়ে সরকারের কার্যকর তদারকি চোখে পড়ছে না। হাওরের কৃষকদের বাঁচাতে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাই।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, জলাবদ্ধতার কারণে হাওরের কিছু ধান কালো হয়ে যাওয়ায় বাজারে এর দাম কমেছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) ফেরদৌস জাহান বলেন, ধানের দাম কমেছে, বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত রয়েছি। এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ধানের মান কিছুটা কমে গেছে। এজন্যই ধানের দাম কম।
সুনামগঞ্জের কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আহমদ আসিফুর রব বলেন, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এবার ধানের দাম তুলনামূলক কম। তবে ধানের দাম কমলেও সেই অনুপাতে চালের দাম কমেনি। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন