প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:৪৭
যাদুকাটা নদীতে বালু—পাথর উত্তোলন ও নদীর তীর কেটে ফেলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এবার তাহিরপুরের মোদেরগাঁওয়ে নদীর তীর কেটে বিপন্ন করা হচ্ছে খেলার মাঠ, বাধাগগ্রÍ হচ্ছে খেয়া পারাপার। প্রশাসনের অভিযানেও বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ উত্তোলন। অভিযানের আগেই খবর পৌঁছে যাচ্ছে লুটপাটকারীদের কাছে— এমন অভিযোগও রয়েছে। নদী, পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি, সেই বিষয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’য় কথা বলেছেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের (এনডিএফ) জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম সদরুল এবং সঞ্চালনা করেন সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার ও ডিজিটাল ইনচার্জ সাইদুর রহমান আসাদ।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: যাদুকাটা নদীতে বালু—পাথর লুটের অভিযোগ নতুন নয়। প্রশাসনের অভিযান সত্ত্বেও নদীর তীর কাটা ও অবৈধ উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না কেন?
সাইফুল আলম সদরুল: এই লুটপাটের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কিছু নীতি ও ব্যবস্থাপনার বিষয় জড়িত। যাদুকাটা নদীর বালু—পাথর জাতীয় সম্পদ ও খনিজ সম্পদ। এই সম্পদকে ঘিরে একটি বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। আমরা একে মাফিয়া চক্র হিসেবে চিহ্নিত করেছি। এই চক্রে কারা রয়েছে, সে বিষয়ে আমার অভিযোগ হলো, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য এবং মাঠপর্যায়ের লোকজন এর সঙ্গে জড়িত। এভাবে একটি চক্র গড়ে উঠলে প্রশাসনের লোকদেখানো অভিযান দিয়ে লুটপাট বন্ধ করা সম্ভব নয়।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: অবৈধভাবে নদী থেকে বালু—পাথর উত্তোলনের সঙ্গে কারা জড়িত বলে মনে করেন?
সাইফুল আলম সদরুল: সম্প্রতি সাংবাদিক উজ্জ্বল মেহেদীর একটি প্রতিবেদনেও বিষয়টি এসেছে। সেখানে সরকারের খনিজ সম্পদ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা তুলে ধরা হয়েছে। মূলত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই এই চক্র কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে আমি মনে করি।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: বারকি শ্রমিকদের সঙ্গে এই বালু—পাথর মহাল নিয়ে অতীতে কী ধরনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল?
সাইফুল আলম সদরুল: ২০১০ সালে বারকি শ্রমিকেরা বুঝতে পেরেছিলেন, বালু—পাথর মহাল ধীরে ধীরে একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। তখন বারকি শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, বারকি শ্রমিক ছাড়া অন্য কাউকে যেন বালু—পাথর মহালে কাজ করতে দেওয়া না হয়। পরে জেলা প্রশাসনের একটি সভায় ব্যবসায়ী, ইজারাদার ও বারকি শ্রমিকদের সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, মহালের ভেতরে কোনো ধরনের যান্ত্রিক কার্যক্রম চলবে না এবং বারকি শ্রমিক ছাড়া অন্য কেউ সেখানে কাজ করতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। সিদ্ধান্তের প্রায় ১০ দিন পরই বারকি শ্রমিকদের আবার রাস্তায় নামতে হয়েছিল। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ব্যর্থতার কারণেই আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: প্রশাসনের অভিযানের খবর আগেই লুটপাটকারীদের কাছে ফাঁস হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
সাইফুল আলম সদরুল: এই চক্রের সঙ্গে যদি প্রশাসনের কোনো কোনো ব্যক্তির স্বার্থ জড়িত থাকে, তাহলে অভিযানের তথ্য ফাঁস হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। এখন মোবাইল ফোনের যুগ। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে অভিযানের খবর আগেই পৌঁছে যেতে পারে। তাই শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, অভিযানের তথ্য কীভাবে ফাঁস হচ্ছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সম্প্রতি মোদেরগাঁওয়ে নদীর তীর কেটে খেলার মাঠ ও খেয়া পারাপারের জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের ঘটনা কি বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ আছে?
সাইফুল আলম সদরুল: মোদেরগাঁওয়ে এবার বালু—পাথর লুটের ঘটনা সামনে এসেছে। এর আগে যাদুকাটা নদীর গাগড়াসহ বিভিন্ন জায়গায় এমন ঘটনা ঘটেছে। একেক সময় একেক জায়গায় এ ধরনের কার্যক্রম চলছে। শুধু একটি জায়গায় অভিযান চালিয়ে বা একটি ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের দেখতে হবে, রাষ্ট্র কীভাবে এই মহাল পরিচালনা করতে চায়। নদীতে কী পরিমাণ বালু—পাথর মজুত রয়েছে, কতটুকু উত্তোলন করা যাবে এবং কীভাবে উত্তোলন করা হবে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ নীতিমালা থাকতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: যাদুকাটা নদীর ইজারা ও বালু—পাথর উত্তোলন ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের দুর্বলতা রয়েছে বলে মনে করেন?
সাইফুল আলম সদরুল: এ বছরের যাদুকাটা নদীর ইজারা কার্যক্রমের বিষয়টি গভীরভাবে দেখা প্রয়োজন। জেলা প্রশাসন প্রথমে নদীতে কী পরিমাণ বালু—পাথর মজুত রয়েছে, তার পরিসংখ্যান তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বলে আমরা জেনেছি। কিন্তু সেই পরিসংখ্যান তৈরি হয়েছে কি না, সেখানে কী পরিমাণ বালু—পাথর রয়েছে, তা সাধারণ মানুষ এখনো স্পষ্টভাবে জানে না। রাষ্ট্রীয়ভাবে যদি এক বছর অন্তর অন্তর মজুত নিরূপণ করা হয়, তাহলে সেই হিসাব অনুযায়ী উত্তোলনের পরিমাণও নির্ধারণ করতে হবে। এক বছরের জন্য যদি কোনো মহাল ইজারা দেওয়া হয়, তাহলে সেখানে কী পরিমাণ বালু—পাথর রয়েছে এবং কতটুকু উত্তোলন করা যাবে, তা নীতিমালায় স্পষ্ট থাকতে হবে। দৈনিক কতটুকু উত্তোলন করা যাবে, সেটিও নির্ধারণ করা জরুরি। বারকি শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি হচ্ছে, এই সম্পদ আহরণ ও ব্যবস্থাপনা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসতে হবে। তাহলে লুটপাটের সুযোগ কমবে এবং শ্রমিকদের জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: বালু—পাথর লুট বন্ধে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের কী ধরনের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন?
সাইফুল আলম সদরুল: প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হলেই কতটা কাজ হবে, সেটিও প্রশ্নের বিষয়। রাজনৈতিক নেতাদের কেউ যদি কোনোভাবে এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে তাঁদের দিয়ে সমস্যার সমাধান আশা করা কঠিন। কারণ, এই সম্পদ এ অঞ্চলের মানুষের সম্পদ, এটি সর্বসাধারণের সম্পদ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ। তাই এই সম্পদ রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু প্রশাসন কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে না দিয়ে প্রকৃত মালিক হিসেবে সাধারণ মানুষকেও সম্পদ রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: নদী, পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষায় আপনার প্রত্যাশা কী?
সাইফুল আলম সদরুল: যাদুকাটা নদীর বালু—পাথর লুট বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। নদীতে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, কীভাবে তা উত্তোলন হবে এবং কারা এর সঙ্গে যুক্ত থাকবেন—সবকিছু স্বচ্ছভাবে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে বারকি শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা ও অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। নদী ও জনসম্পদ রক্ষায় প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এ সম্পদ যেন কোনো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে না যায়, সেটি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন