প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর, ২০২৬ ২৩:১৬
গাছের ডালে ডালে হাজারো পাখির বসতি। কখনো দল বেঁধে বসে থাকা, কখনো আবার ডানা মেলে আকাশে উড়ে বেড়ানো। তাদের কলকাকলি আর ডানার ঝাপটানিতে মুখর চারপাশ। মানুষের ব্যস্ততা, যানবাহনের চলাচল, দৈনন্দিন কোলাহল, কিন্তু তাতে যেন কোনো ভ্রম্নক্ষেপ নেই পাখিদের। আপন মনে গড়ে তুলেছে নিজেদের এক রাজ্য।
শাল্লা উপজেলা সদরের বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদ ও থানার সামনের গাছগুলোর দিকে তাকালেই চোখে পড়ে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। দীর্ঘ বছর ধরে এসব গাছে আবাস গড়ে তুলেছে কয়েক হাজারও পানকৌড়ি। মানুষের বসতির একেবারে কাছে থেকেও নিরাপদে বসবাস করছে পাখিগুলো। প্রকৃতি ও মানুষের এমন সহাবস্থান ছড়াচ্ছে ভিন্ন এক সৌন্দর্য। গাছের প্রতিটি ডাল যেন একেকটি পাখির ঠিকানা। কোথাও সারি সারি পানকৌড়ি বসে আছে, আবার কোথাও দল বেঁধে উড়ে যাচ্ছে আকাশে। কেউ ফিরছে আপন নীড়ে, কেউ হাওরে যাচ্ছে খাবারের সন্ধানে।
.jpg)
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বহু বছর ধরে পানকৌড়িরা এসব গাছে বসবাস করছে। নিরাপদ আশ্রয় ও প্রজননের অনুকূল পরিবেশ পেয়ে এখানে গড়ে উঠেছে তাদের স্থায়ী আবাস। সময়ের সঙ্গে পাখির সংখ্যাও বেড়েছে। শুধু পানকৌড়িই নয়, শীতের আগমনে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখিও এখানে আশ্রয় নেয়। সব মিলিয়ে পাখিদের কলকাকলিতে শীতের দিনগুলোতে আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠে এলাকা।
স্থানীয় বাসিন্দা সুকুমার চন্দ্র বলেন, এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে হাজারও পানকৌড়ি বসবাস করছে। সকাল হলেই পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সারাদিন গাছের ডালে ডালে তাদের ওড়াউড়ি আর আনাগোনা চলে। পাখিগুলো এখন এলাকার পরিবেশেরই একটি অংশ হয়ে উঠেছে। তাদের এই উপস্থিতি দেখতে ভালো লাগে। পাখিদের কারণে কিছুটা অসুবিধা হলেও আমরা তাদের তাড়িয়ে দিই না, বরং নিরাপদে থাকার সুযোগ করে দিই।
তবে পাখিদের এই রাজ্যের সৌন্দর্যে্যর পাশাপাশি রয়েছে কিছু বাস্তবতা। হাজারো পাখির বসতির কারণে গাছের নিচে জমে বিষ্ঠা। নোংরা হয় আশপাশের পরিবেশ, চলাচলেও কিছুটা অসুবিধা হয় স্থানীয়দের। বিশেষ করে গাছের নিচ দিয়ে যাতায়াতের সময় ভোগান্তিতে পড়তে হয় অনেককে। তবু পাখিদের প্রতি ভালোবাসার কাছে এসব ভোগান্তি যেন তুচ্ছ। নিজেদের অসুবিধা মেনেই পাখিগুলোকে আগলে রেখেছেন স্থানীয়রা।
ইউপি সদস্য মধুসুদন সরকার বলেন, এই গাছগুলোতে হাজার হাজার পানকৌড়ি বসবাস করে। পাখিদের বিষ্ঠার কারণে গাছের নিচের পরিবেশ নোংরা হয়, চলাচলেও কিছুটা অসুবিধা হয়। তারপরও আমরা কখনো পাখিগুলোকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা ভাবি না। বরং তাদের উপস্থিতি আমাদের ভালো লাগে। আমরা চাই, পাখিগুলো এভাবেই নিরাপদে থাকুক, তাদের এই আবাসস্থল টিকে থাকুক।
বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ রায় নান্টু বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের কেউ পাখিদের বিরক্ত করেন না। কেউ যাতে পাখিদের কোনো ধরনের ক্ষতি বা বিরক্ত করতে না পারে, সে জন্য গ্রাম পুলিশকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমি প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এখানে পানকৌড়ির বসতি দেখে আসছি। পাখিদের নিরাপদ আবাসের কথা বিবেচনা করে গাছের কোনো ডালও কাটা হয় না। এসব গাছেই পাখিরা বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে এবং বাচ্চা ফুটিয়ে বংশবিস্তার করে।
তিনি আরও বলেন, পাখির বিষ্ঠার দুর্গন্ধে কিছুটা অসুবিধা হলেও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এসব পাখির গুরুত্ব অনেক। একসময় হাওরে প্রচুর অতিথি পাখি দেখা যেত। এখন অনেক প্রজাতির পাখিই হারিয়ে গেছে। তবে পানকৌড়িরা এখনো এখানে টিকে আছে। এখানকার পরিবেশে তারা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে বলেই বছরের পর বছর ধরে এই স্থানকে নিজেদের আবাসস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছে। আমরা চাই, পাখিরা নির্বিঘ্নে এখানে বসবাস করুক এবং তাদের এই অভয়াশ্রম অক্ষত থাকুক।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন