প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর, ২০২৬ ২৩:১০
সকালে বাবার সঙ্গে রিকশায় চড়ে স্কুলে এসেছিল নবম শ্রেণির ছাত্রী। বাবা তাকে স্কুলের গেটে নামিয়ে দিয়ে চলে যান। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে মেয়েটি আর বাড়ি ফেরেনি। পরিবার থানায় জানানোর পরদিন পুলিশ তার সন্ধান পায়। জানা যায়, নিখোঁজের পরদিনই সে এক তরুণের সঙ্গে নেত্রকোনায় গিয়ে বিয়ে করেছে।
সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের এই ঘটনা একক নয়। সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানা সূত্রে জানা গেছে, গেল তিন মাসে নিখোঁজের ঘটনায় থানায় ৩৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। নিখোঁজদের ২০ জনই শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে ১১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, আরও তিনজনের অবস্থান শনাক্ত হয়েছে। অন্যরা উদ্ধার হয়েছে। এই তিনজনই পালিয়ে বিয়ে করে সংসার করছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রতন সেখ বলেন, অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে আসা—যাওয়ার পথে নিখোঁজ হচ্ছে। কেউ যাওয়ার পথে, কেউ ফেরার পথে, আবার কেউ স্কুলের কথা বলে বেরিয়ে আর ফিরছে না। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুই পক্ষকেই আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
ওসি বলেন, শিক্ষার্থীরা স্কুলে প্রবেশের পর তাদের পুরো দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে দৃশ্যমান স্থানে পোশাক পরিহিত নিরাপত্তাকর্মী রাখতে হবে এবং সিসিটিভি ক্যামেরায় সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকতে হবে। শিক্ষকের অনুমতি ছাড়া কোনো শিক্ষার্থী বাইরে যেতে পারবে না। বাইরে যেতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষককে কারণ জানাতে হবে এবং নিরাপত্তাকর্মীর মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রথম পিরিয়ডের শিক্ষক কেউ অনুপস্থিত থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন। এক—দুই দিন অনুপস্থিতির পরও সন্দেহ হলে, কিংবা টানা কয়েক দিন না এলে দেরি না করে অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এজন্য অভিভাবকদের কাছে শিক্ষকদের মোবাইল নম্বর থাকা এবং নিয়মিত যোগাযোগ রাখা জরুরি।
অভিভাবকদের উদ্দেশে ওসি বলেন, সন্তান নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে কি না এবং ছুটির পর সময়মতো ফিরছে কি না, তার খোঁজ রাখতে হবে। নির্ধারিত সময়ে না ফিরলে অপেক্ষা না করে সন্ধান নিতে হবে। অনলাইনে পড়ার সময় সন্তানের পাশে থাকতে হবে এবং পড়া শেষ হলেই ফোন নিজের হেফাজতে নিতে হবে। ঘুমানোর আগে ও পরে সন্তানের কাছে বা বিছানায় অন্য কোনো মোবাইল আছে কি না, সেটিও দেখার পরামর্শ দেন তিনি।
নিখোঁজ হলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর উপর জোর দিয়ে ওসি বলেন, অনেক সময় স্বজনেরা আগে নিজেরা খোঁজাখুঁজি করেন, পরে থানায় আসেন। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ে। সম্প্রতি কুমিল্লার একটি ঘটনাতেও নিখোঁজের পরপর থানায় না জানিয়ে স্বজনেরা নিজেরাই খুঁজেছিলেন। তাই নিখোঁজের খবর পাওয়ামাত্র থানায় জিডি করার আহ্বান জানান তিনি।
সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন জানান, স্কুলের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গেটে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। আগে থেকে থাকা দারোয়ানকে সার্বক্ষণিক গেটে থাকতে এবং কাউকে বের হতে না দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ বের হতে চাইলে অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করেই ছুটি দেওয়া হয়।
অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মোবাইল থেকে দূরে রাখতে হবে, টাচ মোবাইল হাতে দিয়ে একা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তাঁর ভাষ্য, মা—বাবার কাছে প্রত্যেক ছেলেমেয়েই খুব ভালো, কিন্তু ঘটনা ঘটার পর অনেক সচেতন অভিভাবকও বলেন যে তাঁরা বুঝতে পারেননি। মেয়েরা মোবাইল কোথায় ও কেন আড়ালে ব্যবহার করে, কথা বলার নম্বরটি আদৌ বান্ধবীর কি না, তা যাচাই করা দরকার বলে মনে করেন তিনি। কারণ অনেক সময় ছেলের নম্বর মেয়ের নামে সেভ করা থাকে। তিনি আরও বলেন, স্কুলে যাতায়াতের সময়, ছুটি কখন হলো, ফিরতে দেরি হলে কেন হলো, সেসব খোঁজ রাখতে হবে এবং মাঝেমধ্যে স্কুলে এসে খবর নিতে হবে।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সৈকত দাস বলেন, পারিবারিক কলহ, বাবা—মায়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন বা বিচ্ছেদ থাকলে শিশুরা মানসিক চাপে পড়ে। মা মারা গিয়ে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলে নতুন পরিবারে মানিয়ে নিতে না পারা কিংবা নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে অভিমান করে অনেকে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। তাঁর মতে, আবেগপ্রবণ শিশুদের সময় দেওয়া ও আদর—যত্ন করা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদেরও সামাজিক খোঁজখবর রাখা উচিত।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি কনিজ সুলতানা বলেন, সন্তানেরা কোথায় যায়, কী করে ও কাদের সঙ্গে মেশে, অভিভাবকদের তা জানতে হবে। স্কুল কর্তৃপক্ষকে দেখতে হবে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত আসছে কি না, কয়েক দিন অনুপস্থিত থাকলে অভিভাবকদের জানাতে হবে। ফেসবুকের এই সময়ে সন্তানেরা অনলাইনে কার সঙ্গে কথা বলছে, অনলাইন ক্লাসে সত্যিই ক্লাস করছে কি না, সেদিকেও নজর রাখার পরামর্শ দেন তিনি। স্কুল চলাকালে অনেক শিশু বাইরে ঘোরাঘুরি করে, সেটিও দেখা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আবুল কাশেম আজাদ বলেন, নিখোঁজের নির্দিষ্ট কারণ এখনই বলা সম্ভব নয়। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া, প্রেমঘটিত বিষয় বা পারিবারিক কারণ থাকতে পারে, যা তদন্তেই বের হবে। তবে অভিভাবকদের, বিশেষ করে বাবা—মায়ের, সন্তান কোথায় যায়, কী করে তার খবর রাখতে হবে। তাঁর মতে, স্কুল—কলেজে মাঝেমধ্যে খোঁজ নিয়ে জানতে হবে সন্তান প্রতিষ্ঠানে গেছে কি না। মাঝে মাঝে খবর নেয়া হলে এই ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন