প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট, ২০২৩ ০৮:০০
পাগলায় সড়ক অবরোধ
পল্লী বিদ্যুতের ভেল্কিবাজিতে চরমভাবে অসন্তুষ্ট শান্তিগঞ্জ উপজেলার সাধারণ মানুষ। প্রতিদিন অসহনীয় ‘লোডশেডিং’ বিষিয়ে তুলেছে উপজেলার সব শ্রেণিপেশার মানুষকে। একদিকে বিদ্যুতের চরম ভোগান্তি, অন্য দিকে প্রচ- তাপদাহে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে জনজীবন। নিয়মিত বিদ্যুত থাকলে কিছুটা হলেও স্বস্তি মিলে জনসাধারণের। বিদ্যুতের ভোগান্তিতে ক্রমশ ফুঁসে উঠছেন শান্তিগঞ্জ উপজেলাবাসী।
মঙ্গলবার রাতে উপজেলার সবচেয়ে বড় বাজার পাগলা বাজার বাসস্ট্যান্ডে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে এফডিআর নামের একটি সামাজিক সংগঠন। আধা ঘন্টারও বেশি সময় ধরে সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে তারা। এসময় শান্তিগঞ্জ উপজেলা সদরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুত সরবরাহ করে অন্যান্য ইউনিয়নে মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং করার অভিযোগ করেন বিক্ষোভকারীরা। এছাড়াও প্রতি ইউনিয়নে বিদ্যুতের সমবণ্টন না করে বৈষম্যমূলক আচরণের কথা তুলে ধরেন তারা।
উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত দেড়মাস ধরে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় বিদ্যুতের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। পূর্ব পাগলা, পশ্চিম পাগলা, দরগাপাশা, পূর্ব বীরগাঁও, পশ্চিম বীরগাঁও, পাথারিয়া ও শিমুলবাক ইউনিয়নব্যাপী বিদ্যুতের ভোগান্তি চরমে। সকাল থেকে দুপুর, বিকাল থেকে সন্ধ্যা-রাত পর্যন্ত এসব এলাকায় বিদ্যুত থাকে না বললেই চলে। দিন কিংবা রাতের বেশিরভাগ সময়েই বিদ্যুতহীন থাকতে হয় মানুষকে। বিদ্যুতের এমন পরিস্থিতিতে একটি স্মার্টফোনকে শতভাগ চার্জ করা যায় না উপজেলার বেশিরভাগ এলাকায়। এমনও রাত যায়, যে রাতে এক বারের জন্যও দেখা মিলে না বিদ্যুতের। দিনের বেলা মাঝে মাঝে বিদ্যুতের দেখা মিললেও শরীরের ঘাম শুকানোর আগেই আবার চলে যায়। বিদ্যুতের এমন অবস্থায় সবচেয়ে বেশি বেগ পোহাতে হচ্ছে বয়স্ক মানুষ ও রোগীদের। লাগাতার বিদ্যুতহীনতায় স্কুল কিংবা বাসায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও। ব্যবসায়ীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে বিদ্যুত সম্পর্কিত ব্যবসায় প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
২৯ জুলাই শনিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে ১ আগস্ট মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত সময়ে বিদ্যুতের যাওয়া-আসার অস্বস্তিকর খেলাকে পরখ করেন এ প্রতিবেদক। শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় বিদ্যুত যাওয়ার পর ৭টা ৪৩ মিনিটে আসে। ৭টা ৪৩ মিনিটে আসা বিদ্যুত ৮টা ৩মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী ছিলো। ৮টা ৩ মিনিটে বিদ্যুত চলে যাওয়ার পর পাগলাবাজার এলাকা আরও ১৯মিনিটের জন্য অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়, বিদ্যুত আসে রাত ৮টা ২২ মিনিটে। এরপর মধ্যরাত অর্থাৎ ১২টা ২২ মিনিট পর্যন্ত স্বস্তি দেয় পল্লী বিদ্যুত। কিন্তু এই স্বস্তি পাগলা বাজার এলাকাবাসীর জন্য কালরাত্রির মতো হয়ে হাজির হয়। সেরাতে বিদ্যুতের দেখা পায় নি এই এলাকার মানুষ। বিদ্যুতের দেখা মিলে ৯ঘন্টা ১৮ মিনিট পর রবিবার সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে। প্রচ- গরমে মানুষ হা-হুতাশ করেছেন। এরপর কিছু সময় বিদ্যুত থাকার পর দুপুর ১২টা ৪৪ মিনিটে আবার চলে যায়। যা ১২টা ৫৮ মিনিটের সংক্ষিপ্ত সময়ে আবারও আসে বিদ্যুৎ, কিন্তু ১টা ৫০ মিনিটে চলেও যায়। এর ১ঘন্টা ১৮মিনিট পর অর্থাৎ ৩টা ৮ মিনিটে বিদ্যুত আসে। দীর্ঘ ৪ঘন্টা ৮মিনিট বিদ্যুত থাকার পর সন্ধ্যা ৭টা ১৮ মিনিটে আবার বিদ্যুত চলে যায় এবং ৮টা ১৫ মিনিটে আসে। এর পরে রাত ঠিক ১২টায় আবারও বিদ্যুত চলে যায়। যা আসে রাত দেড়টায়। শেষ রাতের দিকে আবারো বিদ্যুত বিভ্রাট হলে যার দেখা মিলে সোমবার সকাল সাড়ে ৭টায়। সোমবার ১০টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যুত থাকে। এসময় লোডশেডিং হলে দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে বিদ্যুত আসে। এবারের বিদ্যুত আর বেশিক্ষণ টিকেনি। ১২টা ২৭মিনিটে চলে যায় এবং আসে ১টা ৩৮ মিনিটে। পরে আবার আড়াইটায় চলে যায়। বিকাল ৪টা ৩৭ মিনিটে আসলেও পরে আবার ৫টা ৩৮ মিনিটে চলে যায়। বিদ্যুতের যাওয়া আসার খেলা চলে সারা রাত। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত যা চলমান ছিলো।
তিন দিনের পাগলাবাজার এলাকার এ সময়সূচি হিসেব করলে ২৪ ঘন্টায় গড়ে ১২ ঘন্টারও কম সময় বিদ্যুত পেয়েছে পাগলা এলাকার লোকজন। গত এক সপ্তাহের গড় হিসাবে পল্লী বিদ্যুত পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নে ১০/১২ ঘন্টাও বিদ্যুত দেয়নি। এ চিত্র শুধু পশ্চিম পাগলা এলাকার। এরচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য পূর্ব বীরগাওয়ের সলফ, নোয়াগাঁও, উমেদনগর, বীরগাঁও, খালপাড়, দরগাপাশার আক্তাপাড়া, সিচনী, বাংলাবাজার, আমরিয়া, ইসলামপুর, হরিনগর, ছয়হারা, পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের চিকারকান্দি, পিঠাপশি, আলমপুর, পঞ্চগ্রাম, ঘোড়াডুম্বুর, ডিগারকান্দি, পশ্চিম পাগলার ব্রাহ্মণগাঁও, হোসেনপুর, নিদনপুর, ছোনানপুর, কাদিপুর, ইনাতনগর, পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের প্রায় সব গ্রাম, শিমুলবাকের রঘুনাথপুর, উকারগাঁও, থলেরবন্দ, কুতুবপুরসহ পুরো ইউনিয়ন, পাথারিয়ার বেশ কিছু গ্রামের পল্লী বিদ্যুতে বিদ্যুতহীনতার দৃশ্য এর চেয়েও ভয়াবহ।
ভুক্তভুগী মানুষরা বলছেন, উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের বিশেষ বিশেষ কয়েকটি গ্রাম বা এলাকাকে তুলনামূলক বেশি বিদ্যুত সরবরাহ করছে উপজেলা পল্লী বিদ্যুত সমিতি। যা অন্যান্য গ্রাহকদের বিমাতা সূলভ আচরণের সমান। কিন্তু এমন অভিযোগ ঠিক নয় বলে জানিয়েছেন শান্তিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতে সহকারি ব্যবস্থাপক (এজিএম)।
বিদ্যুতের এমন ভেল্কিবাজিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছোটন মিয়া, ৮ম শ্রেণি পড়ুয়া উমামা আক্তার ও সৃজন দাশ বলেন, সারাদিন খুবই খারাপ অবস্থা যায় । বিদ্যুত থাকে না। স্কুলে গেলেও পাইনা, সন্ধ্যায়-রাতেও বিদ্যুত পাই না। পড়াশোনার অবস্থা খুবই খারাপ।
পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের গাঙপাড় গ্রামের বাসিন্দা গীতিকবি এস.এম. রাবেদ বলেন, বীরগাঁওয়ে বিদ্যুতের অবস্থা খুবই খারাপ। সারা দিন তো ডিসটার্ব করেই, রাতে একেবারেই থাকে না। বেশিরভাগ রাত ১১টার দিকে বিদ্যুত নিলে সারা রাতে আর আসেই না। সকালেও দেরি করে আসে। বিদ্যুত বিলতো ঠিকই আসে। বিদ্যুতের এমন বাজে অবস্থা থেকে কবে মুক্তি পাবো? একই ইউনিয়নের কারি আয়ুব আলী বলেন, ‘আমাদের সলফ গ্রামে বিদ্যুতে প্রচুর জ্বালাতন করে। খুবই কষ্ট হয় আমাদের।’
চা বিক্রেতা মঈন উদ্দিন বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জ থেকে পাগলায় ফিরছিলাম, তখন দেখেছি জয়কলস, শান্তিগঞ্জ বাজার, উপজেলা পরিষদ ভবন, হাসপাতাল, কামরুপদলং, সদরপুর এমনকি আস্তমা গ্রামেও বিদ্যুত ছিলো। পাগলায় বিদ্যুত ছিলো না। তার কথার সাথে সুর মিলান পাগলার হোসেনপুর গ্রামের রিকশা চালক আতাউর রহমান।
পাগলা বাজার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সদস্য নাসির মিয়া বলেন, আমাদের এলাকার প্রতি বিমাতা সূলভ আচরণ করছে শান্তিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুত। উপজেলা সদরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে তারা নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত দেয়, আর আমাদের বঞ্চিত রাখে। আমরা এমন আচরণের প্রতি তীব্র নিন্দা জানাই। আমাদেরকে নিরবিচ্ছিন্ন না হোক অন্তত ১৫/১৬ ঘন্টা বিদ্যুত দেওয়ার দাবি করছি।
পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, জয়সিদ্ধি, বসিয়াখাউরি, বড়মোহায় একেবারেই বিদ্যুত থাকে না। কোনো রাতে বিদ্যুত নিলে সারা রাতই বিদ্যুত থাকে না। কোন কোন সময় টানা ৩-৪ দিন বিদ্যুত থাকে না।
স্থানীয় ওয়ার্কশপ ব্যবসায়ী মো. কামাল হোসেন ও মুজিবুর রহমান রিপন বলেন, আমাদের ব্যবসাই হচ্ছে বিদ্যুতের উপর। সারাদিন, রাত বিদ্যুত থাকে না। কখন কাজ করবো? বিদ্যুত না থাকলে ব্যবসা ঠিকবে কীভাবে, খেয়ে-বাঁচার উপায় কী ?
নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়ে একজন জনপ্রতিনিধি অবশ্য বললেন, বিদ্যুৎ বণ্টনে ঠিক বৈষম্য নয়, শান্তিগঞ্জে হাসপাতালসহ কিছু জরুরি সেবা সার্ভিস আছে, আবার কিছু উন্নয়ন কাজও চলমান। রাতেও কাজ হচ্ছে। এজন্য এখানে হয়তো কিছু অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এছাড়া সারা উপজেলারই এক অবস্থা।
শান্তিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের সহকারি ব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. নাদির হোসেন বললেন, বিদ্যুত বণ্টন নিয়ে কোনো বৈষম্য করা হচ্ছে না। আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। আমরা বিদ্যুতের সংকটময় মুহূর্তের সময় অতিবাহিত করছি। চাহিদা যদি থাকে ৫ মেগাওয়াট, বিদ্যুত পাচ্ছি দুই কিংবা আড়াই মেগাওয়াট। তাছাড়া সমস্যাটা এখন জাতীয়ভাবেই হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (জিএম) মো. জাকির হোসেন বলেন, দিনের বেলা বিদ্যুতের তেমন কোনো সমস্যা হয় না। চাহিদায় ঘাটতি থাকলে মাঝে মাঝে বাই রোটেশনে যেতে হয় বা পিক আওয়ারে এমনটা হতে পারে। তখন বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করতে হয়। এটাকে আমরা বলি ‘ক্রাইসিস মোমেন্ট’। আবার সব সময় এটা হয় না। দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুত নিয়ে রাখার ব্যাপারে তিনি বলেন, দিনে এমনটা হয় না। রাতের বেলা কোথাও লাইন ফল্ট করলে, এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তখন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের কিছুই করার থাকে না। তাছাড়া হাওর এলাকায় ভৌগলিক অবস্থানগত কারণেও আমাদের কাজে একটু-আধটু বেগ পোহাতে হয়। বিশেষ করে রাতের বেলা কাজ করা যায় না।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন