প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট, ২০২৩ ০৮:১১
শিশুদের প্রতিভা বিকাশের জন্য প্রতি বছর জাতীয় শিশু পুরষ্কার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। যেখানে সারাদেশের শিশুরা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া বিষয়ক ৬২টি বিষয়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। উপজেলা পর্যায়, জেলা পর্যায়, বিভাগীয় পর্যায় অতিক্রম করে প্রতিযোগীরা জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এবছরও রাজধানী ঢাকার জাতীয় শিশু একাডেমিতে গেল ২৬ থেকে ৩০ জুলাই ২০২২ ও ২০২৩ দুই বছরের প্রতিযোগিতা একসাথে আয়োজন করা হয়। দুই বছরের আয়োজনে জাতীয় পর্যায়ে সুনামগঞ্জের ১০ জন শিশু স্বর্ণ, রৌপ্য সহ ১১টি জাতীয় পুরষ্কার অর্জন করে সুনামগঞ্জকে গৌরবান্বিত করেছে।
শিশুদের এমন কৃতিত্বে খুশি সংস্কৃতি অঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। একইসঙ্গে এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষায় উপজেলা পর্যায়ের সংস্কৃতি অঙ্গনকে আরও সক্রিয় করার তাগিদও দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা ২০২২ ও ২০২৩ চূড়ান্ত পর্যায়ে সুনামগঞ্জ জেলা তিনটি স্বর্ণ, দুটি রৌপ্য ও ছয়টি ব্রোঞ্জ সহ মোট ১১টি পুরষ্কার অর্জন করেছে।
জাতীয় পর্যায়ে দেশসেরা হয়ে প্রথম পুরষ্কার স্বর্ণপদক পেয়েছে (উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ২০২৩ গ বিভাগে) দেবশ্রী রায় তালুকদার, লোক সঙ্গীতে (২০২৩ খ বিভাগে) প্রিয়ন্তী রানী দাশ এবং ধারাবাহিক গল্পবলায় (২০২৩ খ বিভাগে) শ্রেয়া রায়। তবলায় (২০২৩ খ বিভাগে) দ্বিতীয় পুরষ্কার রৌপ্য পদক পেয়েছে অনির্বান দাস তীর্থ ও ক্বেরাতে (২০২২ ক বিভাগে) নুজহাত রশীদ নাজা। তৃতীয় পুরষ্কার ব্রোঞ্জ পদক বিজয়ীরা হলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে (২০২২ ক বিভাগে) শুভমিতা তালুকদার, আবৃত্তিতে (২০২৩ গ বিভাগে) শ্রীপর্ণা দে, ভাব সঙ্গীতে (২০২২ ও ২০২৩ গ বিভাগের) দুইটি পুরষ্কার পেয়েছে অদিতি দাস তিথি, দেশাত্মবোধক গানে (২০২৩ ক বিভাগে) রুদ্রানী তালুকদার রিদ্ধি ও ক্বেরাতে (২০২২ খ বিভাগে) নুসরাত রশীদ নোভা ।
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে দেশসেরা স্বর্ণপদক জয়ী দেবশ্রী রায় সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির ছাত্রী। তারা বাবা স্বপন কুমার রায় এবং মা বনানী তালুকদার। দেবশ্রী জানায়, চার বছর বয়স থেকেই তার গানের প্রতি প্রেম। নিজের পাশাপাশি বাবা মায়ের অনুপ্রেরণায় গান শেখা তার। প্রথম ওস্তাদ সৌরভ দাসের কাছ থেকে গানের শুরু। এরপর বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী দেবদাশ চৌধুরী, সোমা সাহা, সন্তুষ কুমার চন্দ মন্তোষ সহ বিভিন্নজনের তত্বাবধানে গান শিখে সে। বড় হয়ে রুনা লায়লার মতো শিল্পী হতে চায় দেবশ্রী।
লোকসংগীতে স্বর্ণপদক জয়ী প্রিয়ন্তী রাণী দাশ জামালগঞ্জ উপজেলার মেয়ে। সে জামালগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। প্রিয়ন্তী জানায়, লোকসংগীতের প্রতি তার টান বেশি। সে লোকসংগীত শিল্পী আশিক, বন্যা এদের গান নিয়মিত শুনে এবং তাদের মতোই শিল্পী হতে চায়। স্কুল জীবনের শুরু থেকেই গানের জীবন শুরু। লেখাপড়ার পাশাপাশি ভালো শিল্পী হয়ে ওঠার চেষ্টা থাকবে তার।
গান, আবৃত্তি কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজানো ছাড়া শ্রেয়া সরকার প্রথম হয়েছে ভিন্ন এক প্রতিযোগিতায়। শ্রেয়া অংশগ্রহণ করেছে ধারাবাহিক গল্প বলা প্রতিযোগিতায়। যেখানে বিচারকরা যে কোন একটি গল্পের শুরুটা বলেন পরে সেখান থেকে গল্প বলতে হয়। শ্রেয়ার সময় বিচারকেরা একটি ফড়িং নিয়ে দু একটি লাইন বলেন, তারপর সেখান থেকে গল্প বলতে বলা হয়। শ্রেয়ার এই গল্প জাতীয় পর্যায়ের বিচারকদের মুগ্ধ করে প্রথম স্থান অধিকার করে।
শ্রেয়া বললো, আমি মূলত গান করি, বিতর্ক করি। ধারাবাহিক গল্প বলাটা উপস্থিত বুদ্ধি ও কলাকৌশল। আমার কল্পনার জগৎকে খুব ভালো লাগে। গল্পটাও কল্পনা করে বলতে হয়। তাই এই প্রতিযোগিতায় নাম দেই। জেলা থেকে বিভাগ তারপর জাতীয় পর্যায়ে প্রথম হতে পেরে খুব আনন্দিত আমি। আমার মূল লক্ষ পড়াশোনা। এস.সি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী আমি। আমি বড় হয়ে ডাক্তার হতে চাই।
তবলায় দ্বিতীয় পুরষ্কার রোপ্য পদক প্রাপ্ত অনির্বান দাস তীর্থ ও ভাব সঙ্গীতে তৃতীয় পুরষ্কার ব্রোঞ্জ পদক প্রাপ্ত অদিতি দাস তিথি আপন ভাই বোন। তিথি এ বছর একসাথে দুইটি ব্রোঞ্জ পদক (২২ ও ২৩ সালের) অর্জন করেছে। তাদের বাবা ড্যাফোডিল কিন্ডারগার্টেনের প্রিন্সিপাল অজিত কুমার দাস বললেন, আমাদের পরিবারে সবার রক্তে সংস্কৃতি আছে। আমার ভাই তবলা বাজাতেন। এটা দেখে আমার ছেলেও তবলার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। সে সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণীতে পড়ে। মেয়েরও ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি আকৃষ্ট। মেয়ে যখন গান চর্চা করে, ছেলে তবলা বাজিয়ে সহযোগিতা করে। মেয়ে এবার সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করেছে। পাশাপাশি তারা দুইজনেই জাতীয় শিশু পুরষ্কার প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকার করে পুরষ্কৃত হওয়ায় আমরা আনন্দিত। আমাদের স্বপ্ন মেয়ে বড় হয়ে সংগীত নিয়ে পড়াশোনা করবে।
একই রকম ক্বেরাত প্রতিযোগিতায় দুই বিভাগে দ্বিতীয় পুরষ্কার রোপ্য পদক ও তৃতীয় পুরষ্কার ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছে আপন দুই বোন নুজহাত রশীদ নাজা ও নুসরাত রশীদ নোভা। নাজা চাইল্ড কেয়ার একাডেমির ৪র্থ শ্রেণির ছাত্রী। ক্বেরাত প্রতিযোগিতায় নাজা জাতীয়ভাবে দ্বিতীয় পুরষ্কার রোপ্য পদক পেয়েছে। তার বড় বোন সরকারি এস.এস.সি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির ছাত্রী নুসরাত রশীদ নোভা জাতীয়ভাবে তৃতীয় পুরষ্কার ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছে। নোভা এর আগেও ক্বেরাত প্রতিযোগিতায় জাতীয়ভাবে দুইবার পদক পেয়েছে। তাদের বাবা হারুনুর রশীদ ছাতকের হাজী জামাল উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালযয়ের ধর্মীয় শিক্ষক। হারুনুর রশীদ জানান, আমি শিক্ষকতার পাশাপাশি আমার দুই মেয়েকে নিজেই ক্বেরাত চর্চা করাই। তাদেরকে নিয়মিত কুরআন শিক্ষা দেই। ক্বেরাতে আমার মেয়েরা জাতীয়ভাবে পুরষ্কার পাচ্ছে একজন ধর্মীয় শিক্ষকের কাছে এর চেয়ে গর্বিত আর কি হতে পারে। আমি আমার মেয়েদের নিয়ে গর্ব অনুভব করি।
উচ্চাঙ্গ সংগীতে তৃতীয় পুরষ্কার ব্রোঞ্জ পদক প্রাপ্ত শুভমিতা তালুকদারের বাবা দ্বীপন কুমার তালুকদার বলেন, আমার মেয়ে ফারিয়া একাডেমিতে ৫ম শ্রেণিতে পড়ে। সে এবার জাতীয় শিশু পুরষ্কার প্রতিযোগিতায় উচ্চাঙ্গ সংগীতের ক বিভাগে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছে। আমরা পারিবারিকভাবেই সংস্কৃতির মানুষ। প্রথমবার প্রতিযোগিতায় গিয়েই জাতীয় পুরষ্কার ঘরে আনায় আমার মেয়ে সহ আমাদের পরিবারের সবাই খুশী।
এদের অধিকাংশের গানের শিক্ষক সদর উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ কুমার চন্দ মন্তোষ বললেন, সুনামগঞ্জ সংস্কৃতির রাজধানী। এই জেলার শিশুরা জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণ, রৌপ্য, ব্রোঞ্জের ১১ টি পুরষ্কার এনেছে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত খুশির খবর। এই সাফল্যের পেছনে এসব শিশুদের বাবা মায়ের কঠোর শ্রম ও শিশুদের অধ্যবসায় জড়িত। পাশাপাশি তাদের শিক্ষকরা তাদেও ভালো গাইড করেছে। প্রতিভাবান শিশুদের যতœ নিতে হবে। ভবিষ্যতে আরও বেশি পুরষ্কার পেতে তৃণমূল থেকে সঠিক প্রতিভা বাছাই করতে হবে।
জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা আহমেদ মঞ্জুরল হক চৌধুরী পাভেল বলেন, এতগুলো জাতীয় পুরষ্কার অর্জন অবশ্যই ইতিবাচক দিক। সুনামগঞ্জের একটা ইতিহাস ঐতিহ্য আছে, সংস্কৃতির রাজধানী বলা হয়ে থাকে। সে অনুসারে পুরষ্কার আরও বেশি হওয়া উচিত। আমরা এখনো আমাদের পূর্ব পুরুষের নাম নিয়েই চলতে হয়। নতুন করে কেউ তৈরি হচ্ছে না। এজন্য প্রয়োজন, উপজেলা পর্যায়ের শিল্পকলা একাডেমি বা অন্যান্য যেসব সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে, তাদের সক্রিয়তা বাড়ানো। উপজেলা পর্যায়ে যদি শিশুদের প্রশিক্ষণ বিভাগের কার্যক্রম শুরু করা যায়, তাহলে সুনামগঞ্জের সংস্কৃতির মান আরও বাড়বে।
জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. শামছুল আবেদীন বললেন, সুনামগঞ্জকে ‘সংস্কৃতির রাজধানী’ বলা হয়। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাই আমরা। এজন্য শিল্পকলার সকল বিভাগের সক্রিয়তা বাড়াতে কাজ করছি আমরা। বছরব্যাপী নির্ধারিত আয়োজন ছাড়াও আরও নানা আয়োজনের মাধ্যমে চর্চা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমার প্রত্যাশা ভবিষ্যতে আরও বেশি জাতীয় পুরস্কার অর্জন করবে সুনামগঞ্জের শিশুরা।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন