কৃষকের ললাটে গোপাটের কষ্ট

প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল, ২০২৪ ০০:৫৩

-সু.খবর ছবি

তাহিরপুরের কাউকান্দি গ্রামের বাসিন্দা কৃষক মো. আবুল হোসেন ভুট্টো। তিনি মাটিয়ান হাওরে প্রায় ১২ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন। তার সব জমির অবস্থান হাওরের পশ্চিম উত্তর দিকে। বাড়ির খলা (ধান মাড়াই, শুকানোর স্থান) থেকে জমির অবস্থান প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে। বৈশাখের এই সময়ে তার কিছু কিছু জমির ধান কাটা শুরু করেছেন।  এবার ধানের ফলন ভালো হওয়ার খুশী তিনি। তবে জমি থেকে ধান কিভাবে বাড়িতে আনবেন সে নিয়ে চিন্তিত। সোমবার দুপুরে মাটিয়ান হাওরের একটি গোপাটে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা তার। তিনি এসময় গোপাটের পাশে পানির নালা দিয়ে ছোট  নৌকায় ধানের মোটা (আঁটি) তুলছিলেন। তার সঙ্গে আরও ৪ জন।

 

 

 


তিনি বলেন, হাওরে ডুবন্ত সড়ক হলে ধান পরিবহন করতে খুব সুবিধা হতো। নির্বাচনের সময় মেম্বার- চেয়ারম্যানরা নানা প্রতিশ্রুতি দেন। নির্বাচনের পর তাদের আর পাওয়া যায় না। আমাদের মতো কৃষকের অবস্থা শেষ। গোপাট থেকেও নাই। এই গোপাট দিয়ে গাড়ি চলা দূরে থাক, হেঁটে যাওয়াই দায়। তাই গোপাটের পাশের নালা দিয়ে ছোট লম্বা নৌকায় ধানের মোঠা তুলে বাড়ির সামনে খলায় নিয়ে যাচ্ছি। ছোট নৌকাটি ৪ জনে টেনেও নিয়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে। যে পরিশ্রম করছি, তা বলে শেষ করা যাবে না।  অথচ প্রতিদিন হাজার হাজার মণ ধান এই পথ দিয়ে বাড়ি যায়। যুগের পর যুগ এই কষ্ট হলেও দেখার কেউ নেই।

 

 

 


হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে আবাদ করা বোরো ধান কাটা শুরু হয়ে গেছে। প্রতিটি উপজেলার হাওরজুড়ে এখন পাকা ধানের খেলা। সব ঠিক থাকলে কয়েক দিনের মধ্যে পুরোদমে শুরু হবে ধান কাটার উৎসব। তবে এখন হাওরের জাঙ্গাল (গোপাট) নিয়ে চিন্তিত রয়েছে তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গোপাটের ভোগান্তির কারণে প্রতিবছর দুর্ভোগ পোহাতে হয় কৃষকদের।

 

 


কৃষকরা বলছেন, প্রতিটি হাওরে কমবেশি গোপাট রয়েছে। এসব গোপাটে একাধিক জায়গায় ভাঙা থাকার কারণে ভোগান্তি বেশি হয়। কিছু কিছু জায়গায় গোপাট সরু, হেঁটে যাওয়া যায় না। এছাড়াও সামান্য বৃষ্টি হলে চলাচলের অনুপযোগি হয়ে যায় গোপাট। তখন ধান পরিবহনে বিকল্প ব্যবস্থার চিন্তা করতে হয়। হাওরের এই গোপাটগুলো আরসিসি পাকা সড়ক করে মূল সড়কে যুক্ত করে দেয়া প্রয়োজন। সরু গোপাট প্রশস্ত করাও দরকার, এতে গোপাটের পাশে নালা তৈরি হবে। এই নালা ব্যবহার করেও কৃষক ধান পরিবহন করতে পারবেন।

 

 

 


বাদাঘাট ইউনিয়নের বোরোখারা গ্রামের বাসিন্দা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গোপাট ভালো হলে কতো সুন্দরভাবে হাওর থেকে ধান নিয়ে যেতাম। এখন যে গোপাট রয়েছে তা কোনো কাজে আসে না।  সরু, ভাঙা, হেঁটে চলাচল করাই কষ্ট হয়। গোপাটের পাশের পানির নালাতেও পানি কম। ক্ষেত করি ঠিকই, তবে খুবই কষ্ট হয় আমাদের।
তাহিরপুর উপজেলার ভাটি তাহিরপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. সবুজ মিয়া। এবার শনির হাওরে ১৮ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। এই কৃষির উপরই নির্ভরশীল তিনি। তার চাষকৃত অনেক জমির ধান পেকে গেছে। এখন কেটে মাড়াই দিয়ে বাড়ি আনবেন ধান। তবে হাওরের গোপাটের বেহাল অবস্থা দেখে চিন্তিত তিনি।

 

 


সবুজ মিয়া বললেন, প্রতিবছরই শনির হাওরে ধান চাষ করি। ধান পাকার পর কেটে আনতে প্রতি বছরেই ভোগান্তির শিকার হই। এবারও তাই হচ্ছে। শনির হাওরের জাঙ্গাল অনেক অংশই ভাঙা। এই ভাঙার কারণে গাড়ি চলে না। আবার বৃষ্টির পর এসব জাঙ্গালে হেঁটে আসাই যায় না। তখন ক্ষেত থেকে ধান কেটে ঠেলাগাড়ি দিয়ে বাড়ির কাছে খলায় নিয়ে আসি। এতে কষ্ট যেমন হয়, তেমনি অতিরিক্ত টাকাও খরচ করতে হয়।

 

 


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরা জানান, এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৪০৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। যা গত বারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৬২ হেক্টর বেশি। ইতিমধ্যে উৎসবের মধ্য দিয়ে হাওরে শুরু হয়েছে ধান কাটা। এবার ১৩ লক্ষ ৭ হাজার ২০০ মে.টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এপর্যন্ত (১৫ এপ্রিল) পুরো জেলায় ১০ ভাগ ধান কাটা হয়ে গেছে। এবার ৯ লক্ষ ১৩ হাজার ৪০০ মে.টন চাল উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে, যার বাজার মূল্য ৪ হাজার একশ দশ কোটি টাকা।
জামালগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মো. এরশাদ মিয়া বলেন, আমি হালির হাওরে ১৩ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। ফলনও ভালো হয়েছে। তবে গোপাট ভালো হলে হাওর থেকে ধান পরিবহন করতে আরও সুবিধা হবে। এখন ঠেলাগাড়ি দিয়ে ভেঙে ভেঙে ধান পরিবহন করতে হয়। 
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার দরগাপাশা ইউনিয়নের বাসিন্দা অরুণ বৈদ্য অপু বললেন, আমাদের ধান এখনও পুরো পাকেনি। তবে আগামী এক সপ্তাহের ভেতর পেকে যাবে। প্রতি বছরই ক্ষেত থেকে ধান পরিবহন করতে ঝামেলায় পড়তে হয়। এবারও হবে। কারণ হাওরে ধান পরিবহনের জন্য কোনো সড়ক নেই। আলাদা শ্রমিক দিয়ে ধান পরিবহন করতে হয়। অনেকে মাথায়, কাঁধে করে ধান পরিবহন করে। এতে অতিরিক্ত শ্রম ও অর্থ নষ্ট হয়। 
এদিকে হাওরের কৃষক সংগঠনের নেতারা বলছেন, সরকার গ্রামের রাস্তাঘাট নিয়ে যেরকম উদ্যোগ নেয়, হাওরের গোপাটগুলো নিয়ে তেমন ভাবে না। সব সময় হাওরের গোপাটগুলো থাকে অবহেলিত। একারণে প্রতিবছরই ধান কাটা, পরিবহন, মাড়াই, শুকানো থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়াটিতে কৃষকদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

 

 


হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু বলেন, আমরা সারা জীবন ধরেই দেখে আসছি কৃষকদের নিয়ে অবহেলা। সরকার একটিতে নজর দিলে আরেকটিতে দেয় না। তবু আগের থেকে অনেকটা সচেতন হয়েছে। হাওর রক্ষা বাঁধগুলোতে একটু নজরদারি রাখা হয় এখন। তবে কৃষকের ফসল রক্ষা করে দেয়ার পাশাপাশি ফসল যাতে ঘরে তুলতে পারে সে ব্যবস্থাও তো করে দেয়া প্রয়োজন। তাই আমরা দাবি জানাই হাওর রক্ষা বাঁধের মতো হাওরের গোপাটগুলো পাকা করে দেয়া হোক। যাতে কৃষক তার আবাদকৃত ধান সহজে বাড়িতে পরিবহন করে নিয়ে আসতে পারে।

 

 

 


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, হাওরের গোপাটগুলো ভালো হলে কৃষকদের ধান পরিবহনে সুবিধা হতো। গোপাটগুলোকে ডুবন্ত সাবমারসিবল পাকা সড়ক করা গেলে চাষকাজ আরও সহজ হবে। এখন যে দুর্ভোগ পোহাতে হয় তা আর থাকবে না। তাই এটি নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হচ্ছে। আশা করি খুব শিগগিরই গোপাট সংস্কার ও পাকা করা হবে। তবে এবার সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৫ মে'র ভেতরে শতভাগ ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার